advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে

রেজাউল করিম খোকন
৯ মে ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ৮ মে ২০২১ ২৩:৫১
advertisement

কোভিড ১৯-এর ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতি দীর্ঘ মন্দার কবলে পড়েছে। দেশে দেশে চাহিদা পড়ে গেছে, সৃষ্টি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এই পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই কমে যাবে, সেটিই স্বাভাবিক। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) প্রাক্কলন অনুযায়ী বাংলাদেশে গত বছরের প্রথমার্ধে এফডিআই ১৯ শতাংশ কমে হয়েছে ১১৬ কোটি ১৪৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। গত বছরের প্রথমার্ধে দক্ষিণ এশিয়ায় এফডিআই কমেছিল ৩১ শতাংশ বা ২ হাজার কোটি ডলার। এর পর বিশ্বজুড়ে করোনার ধাক্কায় বিভিন্ন দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আরও কমেছে, তা বলাই বাহুল্য। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে লকডাউন আরোপ করা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সব দেশই এ পথে হাঁটছে এখনো। কিন্তু অর্থনীতিতে এর ভয়াবহ পরিণতি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদনÑ সবই স্থবির হয়ে পড়েছে। এর জেরে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ তো করেইনি, বরং বিদ্যমান বিনিয়োগও অনেক ক্ষেত্রে গুটিয়ে এনেছে বা সংকুচিত করেছে। আবার নতুন করে করোনার ঢেউ প্রকট হয়ে ওঠায় অনিশ্চয়তা ও গভীর মন্দার আশঙ্কায় অনেক নতুন বিনিয়োগ প্রকল্পের অগ্রগতি থমকে গেছে।

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান ও জরুরি অবস্থা জারি করায় সে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ কষছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। যাদের এরই মধ্যে বিনিয়োগ আছে ও বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছেন, তাদের একটি অংশ অন্য দেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশের এ ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। মিয়ানমারে চীন, সিঙ্গাপুর, জাপান, হংকং ও যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ বেশি। দেশটিতে কোরিয়ার কিছু উদ্যোক্তা বড় বিনিয়োগ করার পরিকল্পনার মধ্যে ছিলেন। কিন্তু বর্তমান অস্থিরতায় তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের চিন্তাভাবনা করছেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে বাংলাদেশে আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল করার আগ্রহ দেখিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। তবে এ নিয়ে আলোচনা তেমন গতি পায়নি। কিন্তু এবার মিয়ানমারের অস্থিরতা শুরুর পর ওই দেশের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অন্যদিকে চীন ও জাপানের জন্য আলাদা দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। ওই দুই দেশের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। সিঙ্গাপুর, হংকং ও যুক্তরাজ্যের উদ্যোক্তারা নতুন নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আসছেন।

চীন থেকে জাপানের বিনিয়োগ বাংলাদেশের আনার বিষয়ে এরই মধ্যে সরকারি পর্যায়ে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। একইভাবে মিয়ানমার থেকে বিদেশি বিনিয়োগ স্থানান্তর হলে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি হবে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে এ বিষয়ে আরও অগ্রগতি হবে। মিয়ানমারে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ আছে। বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানের বিনিয়োগ স্থানান্তর হওয়ার ধারণা করা হচ্ছে। এসব বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিমালার পরিবর্তন দরকার। বিশেষ করে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে করপোরেট করসহ অন্যান্য সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগের অফার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বড় মুশকিল হলো, দেশের করপোরেট করহার বেশি। করপোরেট কর কমালে তা বিনিয়োগবান্ধব হবে। অস্থিরতার কারণে শ্রীলংকা থেকে এক সময় পোশাক খাতের বিনিয়োগ বাংলাদেশে এসেছে। একইভাবে চীন ও মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্থানান্তর করতে পারেন। সামগ্রিকভাবে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সাফল্য কম বাংলাদেশের। পরিস্থিতির উন্নতি করতে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সামগ্রিকভাবে অবকাঠামো সমস্যা দীর্ঘদিনের। এটা ধারণা করা যায়, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং মিয়ানমারের অস্থিরতায় বিনিয়োগ স্থানান্তর হতে পারে। এসব বিদেশি বিনিয়োগ ধরতে বাংলাদেশকে হোমওয়ার্ক করতে হবে। দ্রুত ই-জেড প্রস্তুত করতে হবে। ব্যবসার খরচ কমাতে হবে, বিশেষ করে কর কাঠামো প্রতিযোগী দেশের চেয়ে কমানো উচিত। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ নীতিমালা করতে হবে। অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান হওয়া জরুরি। মিয়ানমারে করপোরেট কর ২০ শতাংশ। বাংলাদেশে ৩২ শতাংশের বেশি। এ কারণে মিয়ানমার থেকে এ দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আনা কঠিন হবে। মিয়ানমারের প্রতিযোগী অনেক দেশে কর কম আছে। বিদেশি বিনিয়োগ টানতে প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিলে তা বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিদেশিরা স্থানীয় পর্যায়ের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেই ওই দেশে বিনিয়োগে আসেন। দেশীয় উদ্যোক্তাদের কর সুবিধা বাড়ালে সব দিক দিয়ে লাভবান হবে দেশ। দীর্ঘমেয়াদে দেশের লাভ পরিকল্পনায় এখনই কর ও শুল্ক কাঠামো বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে। মিয়ানমারে থাকা বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ আনতে চাইলে ওই দেশের চেয়ে বেশি সুবিধা দিতে হবে। করোনার কারণে সারাবিশ্বে এফডিআইয়ের হার অর্ধেক হয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ আছে। মিয়ানমার থেকে অনেক দেশ অন্যত্র বিনিয়োগ নিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমার থেকে ব্যবসা ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ এখনই। আর এ জন্য কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

যে কোনো দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হলে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি উন্নত অবকাঠামো এবং যোগাযোগব্যবস্থা থাকা জরুরি। বাংলাদেশে এক ধরনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও অন্যান্য দিক থেকে পিছিয়ে আছে। শিল্প-কারখানার জন্য যে জমি দরকার, তা সহজে পাওয়ার উপায় নেই। অন্যদিকে সরকারি অনুমোদন নিতে উদ্যোক্তাদের ঘাটে ঘাটে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এসব কারণেই বিশ্বব্যাংকের সহজ ব্যবসার সূচকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। এক সময় বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ছিল প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ। বর্তমানে চীন ওই স্থানটি দখল করেছে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন। এসব অঞ্চল ঘিরে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে শিল্পবিপ্লব ঘটবে, বদলে যাবে সামগ্রিক অর্থনীতির চেহারা। ফলে কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে। বাড়তি ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা অঞ্চল নির্ধারণ করা হয়েছে। ভারত, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, হংকং, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশ বিনিয়োগ করবে বিলিয়ন বিলিয়ন কোটি ডলার। কিন্তু সরকারের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে অনেক ফারাক রয়েছে।

কোনো এলাকাকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা কিংবা জমি অধিগ্রহণ করলেই অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের কাজ শেষ হয়ে যায় না। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আরও পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রধান উপাদান হলো সস্তা শ্রম। কিন্তু ¯্রফে সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করতেই খুব বেশি পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আনা যাবে না- এটি গভীরভাবে উপলদ্ধি করতে হবে সংশ্লিষ্ট মহলকে। এ জন্য তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরিতে সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক বিশ্বমানের শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি, উন্নত অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দূর করতে হবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও। করপোরেট করের পরিমাণও কমাতে হবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য। সেসব শিল্প প্রতিষ্ঠার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, যেসব শিল্প দেশের পুঁজি বৃদ্ধি ও অধিক পরিমাণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিদেশি বিনিয়োগের পূর্বশর্তগুলো যথাসময়ে পূরণ করতে না পারলে সরকারের উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে বিশাল ফারাক সৃষ্টি হবে। তা উতরে সামনের দিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন, এমনকি অবসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

রেজাউল করিম খোকন : সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা

advertisement