advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ঈদ উৎসব ও ঈদ সংখ্যা

সেলিনা হোসেন
১২ মে ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১১ মে ২০২১ ২১:৫৩
advertisement

প্রতিটি পত্রিকা থেকে ঈদের সময় প্রকাশিত হয় ঈদ সংখ্যা। সাহিত্যের সব শাখার নবীন-প্রবীণ লেখকরা আগ্রহ নিয়ে লেখেন। সাহিত্য ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটা উৎসবের একটি অংশ। উৎসবের নতুন পোশাক ও বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে এই ঈদ সংখ্যাগুলো মানসিক স্বস্তির বড় আয়োজন। উৎসবের অব্যয়ে ভরে দেয় এই পত্রিকাগুলো। অনেকে বলেন, ঈদের উৎসবকে বিশাল করে তোলে ঈদ সংখ্যা। যারা সাহিত্যের এই আয়োজন করেন, তাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। পাঠকের এই কৃতজ্ঞতা আমাকে স্বস্তি দেয়। নিজে লেখক বলে এই কথা লিখলাম, তা নয়। একজন পাঠক হিসেবে এই আয়োজন আমার কাছে প্রেরণার উৎস।

ঈদ একটি ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক থাকতে পারে এমন চিন্তা যারা করেছিলেন, তারা আমার নমস্য। ঈদ মানে ঈদগাহে যাওয়া, নতুন কাপড় কেনা, সেমাই-ফিরনি, পোলাও-কোর্মা রান্না- এই সঙ্গে একটি ঈদ সংখ্যা প্রকাশ এবং বিপণন করে বাঙালির সাংস্কৃতিক রুচির সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে অভিনব। স্বীকার না করে উপায় নেই।

ষাটের দশকের শুরুর দিকের কথা। আব্বার চাকরি সূত্রে থাকতাম রাজশাহী শহরে। মফস্বল শহরে বসে প্রথম যে ঈদ সংখ্যাটি হাতে পাই, সেটি ছিল নুরজাহান বেগম সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকা।

এর আগে অন্য কোনো ঈদ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে কিনা, তা আমার জানা নেই। হয়নি, গায়ের জোরে এ কথা বলব না। সেটি ধৃষ্টতা হয়ে যাবে। মফস্বল শহরে বাস করে ওই সময়ে দেশের সব পত্রিকার খবর আমি জানতাম, এটা বলা কোনোভাবে যৌক্তিক নয়।

ষাটের দশকের মধ্যভাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। কলেজে পড়ার সময় থেকে কবিতা লিখে খাতা ভরাতে শুরু করেছি। ওই খাতা যথারীতি লুকিয়ে রেখেছি দীর্ঘকাল। এর পাশাপাশি পরিবারের সবাইকে লুকিয়ে ঢাকায় ‘বেগম’ পত্রিকা, দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী কিংবা মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ সম্পাদিত ‘পূবালী’ সাহিত্য পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছি। ছাপা হয়েছে। ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা দেখে বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকেছি।

ওই সময়ে আমার প্রধান আকর্ষণ ছিল ঈদ সংখ্যা বেগম। বেশ বড় আকারে ‘বেগম’ প্রকাশিত হতো। এর সঙ্গে লেখকদের ছবি ছাপা হতো কয়েক পৃষ্ঠাভরে। লেখাপড়ার পাশাপাশি লেখকদের ছবি দেখাও ছিল আনন্দের ব্যাপার। মনে আছে, পত্রিকার পৃষ্ঠায় উপুড় হয়ে খুঁটিয়ে লেখকদের ছবি দেখেছি। ইচ্ছা এমন ছিল যে, কখনো সামনাসামনি দেখা হলে যেন চিনতে পারি। আর নিজের ছবি? দেখে তো শেষ করতে পারতাম না। মনে হতো, সময়কে বলি- সময় দ্রুত পার হয়ে যেও না, একটু থমকে দাঁড়াও। তরুণ বয়সে নিজের একটি ছবি ছাপা হয়েছে ভাবতে এখনো রোমাঞ্চিত হই। মনে হয়, লেখালেখির জীবনে সেটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য সময়। ‘বেগম’-এর ঈদ সংখ্যা কেন্দ্র করে এই স্মৃতি এখনো আমার গভীর আনন্দের জায়গা।

শুরু করেছিলাম ষাটের দশক দিয়ে সময় পার হয়ে গেছে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি। বদলেছে ঈদ সংখ্যার চরিত্র, আকার, প্রকাশনা সৌষ্ঠব এবং সাহিত্যের অনুষঙ্গ। বাণিজ্য ঢুকেছে প্রবলভাবে। এর পাশাপাশি পাঠক সংখ্যা বেড়েছে। ষাটের দশকে বাণিজ্য ছিল না। তবে জনসংখ্যা কম ছিল বলে পাঠকের সংখ্যাও কম ছিল। এখন বাজারে ঈদ সংখ্যা নিয়ে প্রতিযোগিতার জোয়ার। তার পরও বলব, বাণিজ্যের বাইরে এই সংখ্যাগুলোর কিছু ইতিবাচক দিক আছে। এক ফুঁয়ে আমি পণ্যের দরে বিকিয়ে দিতে চাই না। এই সংখ্যাগুলোয় নতুনরা উঠে আসবে। সাহিত্যের ধারাবাহিক স্রােতে নবীনদের সুযোগ পাওয়া সংখ্যার বড় পরিসরের কারণে দেওয়া সম্ভব হয়। ঈদ সংখ্যাগুলোয় বিষয়ে বৈচিত্র্য দেখা যায়। সাহিত্যের গবেষণা, ইতিহাস, বিজ্ঞান, পরিবেশ, মুক্তিযুদ্ধের নানা দিকসহ অনেক কিছু তুলে আনার চেষ্টা করা হয় ঈদ সংখ্যায়।

লেখকদের আত্মজীবনী লেখার আগ্রহ বেড়েছে এসব সংখ্যায়। প্রবীণ অনেক লেখক বিভিন্ন খ-ে নিজেদের আত্মজীবনী লেখায় ব্রতী হয়েছেন। সময়ে নানা দিক উঠে আসছে তাদের লেখায়। একদিন কবি আসাদ চৌধুরী বলছিলেন, পত্রিকার তাগাদা পেলে লিখতে উৎসাহী বোধ করি। তখন মাথায় ভাবনা আপনাআপনি এসে যায়। কোনো কোনো কবি-সাহিত্যিকের এটি একটি দিক। আমি নিজের জন্য হিসাব করে দেখেছি যে, ঈদ সংখ্যায় একটি উপন্যাসের খসড়া দাঁড় করানো যায়। তার পর সেটির সংশোধন, পরিমার্জনা চলে। এটিও যে কোনো ঔপন্যাসিকের একটি দিক বলে মনে হয় আমার।

সাংস্কৃতিক রুচি তৈরিতে এই সংখ্যাগুলো উৎসবের একটি বেশ বড় দিক বলা যায়। মধ্যবিত্তের নানা সওদার সঙ্গে একটি ঈদ সংখ্যা এই সময়ের বাংলাদেশের নতুন সংযোজন আর বলা যাবে না। এর একটি চরিত্র দাঁড়িয়ে গেছে। ঈদ সংখ্যা কেন্দ্র করে ইফতার পার্টির আয়োজন লেখক-পাঠকের বাড়তি আয়োজন। সামাজিক সম্প্রীতির একটি জায়গা নিঃসন্দেহে।

এভাবে ঈদ সংখ্যাগুলো উৎসব আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। একে বাণিজ্যিক প্রচারণা বলে নানাজনে সমালোচনা করেন। মুনাফা অর্জনের বাহন মনে করে এর সাহিত্যিক বিবেচনাকে উড়িয়ে দেন। সাংস্কৃতিক মূল্যকে স্বীকার করতে চান না। পাঠকের গ্রহণযোগ্যতাকে পরিশীলিত রুচির মধ্যে আনতে চান না।

তার পরও বলব, সমালোচনা সহজ কাজ। তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া আরও সহজ। কিন্তু যারা এটি প্রকাশ করেন, তার নেপথ্য কর্মীদের মেধা ও শ্রমকে মল্যায়ন করাও জরুরি। আগেই বলেছি, বিষয়-বৈচিত্র্য নিয়ে সাজানোর পরিকল্পনা একটি সৃজনশীল কাজ। সুন্দর করে প্রকাশও সৃজনশীল কাজ। পরিশ্রমের দিকটিও বিবেচনার বিষয়। সব মিলিয়ে ঈদ সংখ্যাগুলো দেশের সামাজিক বিন্যাসে সাংস্কৃতিক মাত্রা। একে মূল্যায়ন না করলে নিজেদেরই ক্ষতি।

বিশ্বজুড়ে মহামারী করোনা আমাদের জীবনকে ছিন্নভিন্ন করেছে। বাংলাদেশে থেকে প্রকাশিত অনেক পত্রিকাই ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করতে পারেনি। সামাজিক জীবনের নানা বিপর্যয় রোধ করার জন্য মানুষ নানাভাবে সক্রিয়। এ জন্য সব পত্রিকার ঈদ সংখ্যা হয়নি। এটা নিয়ে পাঠকের তেমন দুঃখবোধ নেই। আমাদের কেউ কেউ বলেছেন, মহামারীর জন্য করা যায়নি, তাতে কিছু এসে যায়নি। মহামারী তো চিরকাল থাকবে না। কিন্তু আগামী বছরই আমাদের ঈদ সংখ্যা হাতে পাব। ঈদ সংখ্যা আমাদের সম্পদ। এমন কথা শুনে লেখক হিসেবে পাঠকের প্রত্যাশা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। এ জন্য সবার সঙ্গে আমিও ঈদ সংখ্যা চাই।

সেলিনা হোসেন : কথাসাহিত্যিক

advertisement