advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

করোনাকালীন আমাদের ঈদ

আনোয়ারা সৈয়দ হক
১২ মে ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১১ মে ২০২১ ২১:৫৩
advertisement

বছর ঘুরে ঈদ আবার চলে এলো আমাদের বাড়ির দরজায়। কিন্তু করোনার অবসান ঘটল না। গত বছরের মতো এবারও করোনার ভেতরই আমাদের ঈদ উদযাপন করতে হচ্ছে। এর চেয়ে দুঃখ ও আফসোসের কথা আর কী হতে পারে! এবারও যে এভাবে আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হবে, এটা কল্পনাও করতে পারিনি কেউ।

আমাদের ধারণা ছিল, কোভিড-১৯ একটি আপেক্ষিক দুর্যোগ। স্বল্পসময়ের জন্য মানুষকে বি¯্রস্ত করে আবার চলে যাবে- যেমন অন্যান্য অসুখ আসে আবার চলে যায়। কিন্তু এ অসুখ যে মানুষের ধ্যান-ধারণা সব পাল্টে মানুষকে অস্থির করে তুলবে, এটা আমরা কখনই ভাবতে পারিনি।

মুসলিম জীবনে ঈদ হচ্ছে প্রধান উৎসব। এই উৎসবে আমরা যতখানি পরস্পরের সঙ্গে প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ হই, ততখানি আর কোনো উৎসবে নয়। এই উৎসবের আরও একটি বৈশিষ্ট যে, এক মাস উপবাসের পর আমরা মুক্ত অনুভব করি। আমাদের শরীর ও মনে এক ধরনের আনন্দ এবং স্বাধীনতা বিরাজ করে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে আমরা পুনরায় আমাদের সাধারণ জীবনে প্রবেশ করি। কিন্তু এই করোনাকালীন আমাদের ওই মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করতে পারছি না। সবর্ক্ষণ অদৃশ্য এক শত্রুর আক্রমণভীতি আমাদের তাড়িত করছে। আমরা সত্যিকার অর্থেই আর মুক্ত ও স্বাধীন নই। তবু ঈদ উৎসব আমাদের পালন করতে হচ্ছে।

বাড়িতে আমাদের সবার ছেলেমেয়ে আছে। তাদের কাছে করোনা কোনো বাধা নয়। তারা তাদের বায়না নিয়ে আছে। তাদের মুখের দিকে তাকিয়েই আমাদের সবাইকে যতটুকু সম্ভব আনন্দের সঙ্গেই ঈদ উৎসব পালন করতে হবে।

এই উৎসব যদি শুধু নিরানন্দ হতো, এতেও অসুবিধা ছিল না। কিন্তু এই উৎসবের সঙ্গে জড়িত হয়েছে ভীতি। এ এমন এক ভয়- যেখানে জীবননাশ হওয়ার শঙ্কা ভীষণভাবে প্রকট হয়ে পড়েছে। ফলে মা যদি করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়েন, তা হলে তাকেও সন্তানরা ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। তার লাশ দাফন করার ঝুঁকিও নিতে চাচ্ছে না!

এই সংকট আমাদের মতো প্রবীণদের আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ওই ভয়ঙ্কর ’৭১ সালের কথা- যখন মানুষ প্রাণভয়ে উন্মাদের মতো ছুটে বেড়াচ্ছিল দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে। কোথাও গিয়ে মানুষ সুস্থির ছিল না। কোথাও মানুষের শান্তি ছিল না। কোথাও মানুষের নিরাপত্তা ছিল না।

ওই ’৭১-এও আমাদের জীবনে ঈদ এসেছিল। একদিকে রক্তের গন্ধ, আরেকদিকে মানুষ ঈদের জামাতে ইমামের পেছনে সারবেঁধে দাঁড়িয়েছিল। এতবড় দুর্যোগেও মানুষ ঈদের জামাত বাতিল করেনি। তবু ওই দুর্যোগে ঘাতককে চেনা গিয়েছিল। ঘাতকের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে মানুষ পালাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই করোনায় শত্রুকে চোখে দেখা যায় না। শত্রু অদৃশ্য থেকে মানুষ হনন করছে। এ উপস্থিতির কোনো সাড়াশব্দ নেই, কোনো গন্ধ নেই। এ একেবারে চিতা বাঘের মতো নিঃশব্দে লাফিয়ে পড়ে ঘাড়ে এবং অচিরেই ঘাড় মটকে রেখে চলে যায়। যার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে, শুধু তাকেই নয়- তার পরিবারের সবাকে। তবু এই ঘোর দুর্যোগে আবার এসেছে আমাদের প্রাণের উৎসব ঈদুল ফিতর। এক মাস সিয়াম সাধনার পর এসেছে ঈদ। এ ঘোর সংকটের ভেতরেই আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি পালন করতে হচ্ছে। এ অনুষ্ঠান তো আমরা পালন করবই। কিন্তু আমাদের থাকতে হবে প্রতি পদে পদে সাবধান।

আমরা যদি ’৭১-এর দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে পারি, তা হলে এই দুর্যোগও আল্লাহতাআলার অসীম করুণায় কাটিয়ে উঠতে পারব। আমরা ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হব, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হব, হাসি-ঠাট্টা তামাশায় ভরে তুলব ভার্চুয়াল পর্দা। আমরা থেমে থাকব না। আমরা এগিয়ে যাব। কারণ আমরা মানুষ।

এই করোনাকালীনও মানুষ ঈদের জামাত বন্ধ করবে না। কারণ ধর্ম হচ্ছে মানুষের আত্মিক একটি শক্তি। এই শক্তি মানুষকে সাহস জোগায়, সম্মুখে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দেয়। তাই সব সাবধানতা অবলম্বন করেই মানুষ এবারের ঈদ উদযাপন করবে, ঈদে কোলাকুলি না করলেও কুশল বিনিময় করবে, একে অন্যের খোঁজখবর নেবে। যার যতটুকু সাধ্য অনাথ, আঁতুড়কে সাহায্য করব।

মানুষ ভাইরাসের কাছে হার মানবে না, ওই ভাইরাস যত শক্তিশালীই হোক।

জয় মানুষের হবেই।

আনোয়ারা সৈয়দ হক : মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কথাসাহিত্যিক

advertisement