advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বিশেষ লেখা
আনন্দে মাতি সতর্কও থাকি

আবুল মোমেন
১২ মে ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১১ মে ২০২১ ২২:৪৩
advertisement

ঈদ হলো মুসলিম সমাজের সবচেয়ে বড় উৎসব। আর এ দেশে ৮৫ শতাংশ মানুষই মুসলমান হওয়ায় এটি দেশের প্রধান উৎসব। তবে উৎসবের আনন্দে ধর্মীয় ব্যবধান ঘুচে যায়। রোজার কারণে প্রস্তুতিও চলে মাসখানেক ধরে। এর নানা দিক থাকায় উৎসব ঘিরে বহু রকম বাণিজ্যের চলও রয়েছে। এ উৎসব দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখে। খাবার, পোশাক আর পর্যটন- মোটা দাগে এই তিন খাতে প্রায় লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। কিন্তু করোনার কারণে গত বছর যেমন উৎসব ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এবারও তেমন বাস্তবতা। তবে এবার যেন অবরুদ্ধ মানুষের মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব এসে গেছে। কেনাকাটা কম হয়নি, আর বাড়ি যাওয়ার হিড়িক তো সবার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। গত বছরের করোনা ভাইরাস মানুষের এমন অবিমৃষ্যকারিতার শোধ দেননি, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এবারে তেমনটা নাও হতে পারে। অর্থাৎ ভয় পাচ্ছেন ঈদের আনন্দ শেষ হলে না আবার দুঃখের ঘনঘটা নিয়ে আসে করোনার তৃতীয় ঢেউ। সত্যি, মানুষ এবার ভেবেচিন্তে কাজ করেনি।

ঈদ সবচেয়ে বড় আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে শিশুদের জন্যে। তারা নতুন জামা পায়, সুস্বাদু খাবার পায়, বেড়াতে যায়, অনেক সময় ঈদি পাওয়ার বাড়তি আনন্দও জোটে। খরচের এবং উপার্জনের দ্বিমুখী আনন্দে তারা থাকে মহানন্দে। আর এর সাথে যোগ হয় আরও দুটি আনন্দের উপলক্ষ- পেট ভরে মজার খাবার আর বন্ধুদের সাথে বেড়ানো। কিন্তু এবারে কি তা হচ্ছে? গতবার তেমনটা হয়নি। অবশ্য মনে হচ্ছে এবারে যেন অনেক অভিভাবকই করোনার

ভয়কে দূরে হটিয়ে দিয়েছেন। যা হয় হোক, জীবন কি কেবল বেঁচে থাকার নিমিত্ত মাত্র? এটা ঠিক, সত্যিকারভাবে বেঁচে থাকতে হলে কেবল প্রাণধারণের মধ্যে আটকে থাকা যায় না। মানুষের মনের আরও খোরাক দরকার। তেমনই খোরাকের বার্ষিক বড় উৎস হলো ঈদ উৎসব। এটি দ্বিতীয়বারের মতো বিবর্ণ নিরানন্দ কেটে যাবে- তা অনেকেই মানতে পারছেন না। তাই সরকারি বাধা ও করোনার ভয়কে তুচ্ছ করে তারা প্রায় দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে শিশু-সন্তানসহ পরিবার নিয়ে ফেরিঘাটে, বাসস্ট্যান্ডে ছুটছেন। অনেকে পায়ে হেঁটে রওয়ানা হয়েছেন, ভাড়া গুনছেন দ্বিগুণ থেকে চারগুণ। ভাবা যায় না এ কেমন পাগলামো, ঝুঁকি কতটা নিচ্ছেন, এর পরিণতিই বা কি হবে- তা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবছেন না।

উৎসব যেহেতু সামাজিক বিষয়, তাই কেবল নিজের কথা না ভেবে সবার কথা ভাবা জরুরি। আর মহামারি বা অতিমারি কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করে আসে না, তার সংক্রমণের আশঙ্কা সবার জন্যেই সমান। যে কেউ যে কাউকে সংক্রমিত করতে সক্ষম। ফলে কেবল নিজের ও নিজের পরিবারের কথা ভেবে চলা যাবে না, ভাবতে হবে সবার কথা, এমনকি বিশ্বায়নের একালে বিশ্বমানবতার কথাও রাখতে হবে বিবেচনায়।

ঈদ উৎসবের আগে আমরা ত্যাগ ও সংযমের শিক্ষা গ্রহণ করি। এ দুইয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করা জরুরি, করোনা অতিমারি এসে মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে তারা নানাভাবে অসংযত আচরণ ও স্বার্থপরের ভূমিকা পালন করেছে। ফলে যেমন অন্য মানুষ বঞ্চিত হয়েছে, তেমনি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এ গ্রহের প্রাকৃতিক সম্পদ, নষ্ট হয়েছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য, ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে জীববৈচিত্র্য। আর এসবের সম্মিলিত প্রভাব পড়েছে গোটা গ্রহ ও সম্পূর্ণ মানবজাতির ওপর। বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা বলতে চান- করোনাও কোনো বিচ্ছিন্ন উৎপাত নয়, এ-ও মানুষের যথেচ্ছাচারের প্রতিফল। আগে থেকেই বন্যা ও খরা, দাবানল ও অতিবৃষ্টি, ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুৎপাত, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন, বিভিন্ন মহামারি, নানা প্রাণীর বিলুপ্তি, ঝড় ও সুনামি ইত্যাদি দুর্যোগের মাধ্যমে পৃথিবী ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার হুশিয়ারি দিচ্ছিল। কিন্তু ভোগে, স্বার্থোদ্ধারে, হানাহানিতে ব্যস্ত মানুষ এসব সতর্ক সংকেতে কান দেয়নি। অনেকেই মনে করছেন এর ফলে এ রকম দুর্যোগ আরও আসতে থাকবে।

করোনা আমাদের অনেক নতুন নতুন শিক্ষাও দিয়েছে। অনলাইন পদ্ধতিতে শিক্ষাসহ বিনোদন, কেনাকাটা, দাপ্তরিক কাজ, মননশীল-সৃষ্টিশীল কাজ ইত্যাদি অনেক রকম কাজের পথ খুলে দিয়েছে। পাশাপাশি যাতায়াত, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য দাপ্তরিক ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। তবে এ সুযোগ এখনো সবার আয়ত্ত হয়নি, তা ছাড়া আয়ত্তে থাকলেও সামর্থ্যরে প্রশ্নও রয়েছে। দেশের সর্বত্র হয়ত ইন্টারনেট সংযোগ ও পরিসেবার সুযোগ এখনো অবারিত ও মসৃণ নয়। তবু বর্তমান বাস্তবতায় দেশের মানুষের বড় একটি অংশ অনলাইনে অনেক কাজই করতে পারেন। একটু বুদ্ধি খাটিয়ে উদ্যোগী হলে ঈদের মতো উৎসবের আনন্দও এ পদ্ধতিতে ভাগ করে নেওয়া যায়। ঈদ কেনাকাটার বেশ বড় অংশই এবার অনলাইনে সম্পন্ন হয়েছে। করোনা শিখিয়েছে- এ সম্ভাবনাকে আরও বেশি করে কাজে লাগাতে হবে। তা হলে মানুষ আর এভাবে বাঁধ ভেঙে বিপদের ঝুঁকি বাড়াবে না।

উৎসবের সময় আমাদের ভাবতে হবে সমাজের অভাবী মানুষের কথা। বাংলাদেশ গত দুই দশকে দ্রুত দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনছিল, যা উন্নত বিশ্বের স্বীকৃতি ও প্রশংসা অর্জন করেছে। কিন্তু করোনার প্রকোপে আবার নতুন করে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে- যে হার ২০-২২ শতাংশে নেমে এসেছিল, তা করোনাকালে লাফিয়ে ৪২ শতাংশে পৌঁছে গেছে। এর অর্থ হবে এবারে অনেক পরিবার এবং অগণিত শিশু ঈদে উৎসবের আনন্দ ভোগ করবে না। তাদের কথা আমাদের ভোলা উচিত হবে না। সবসময়ই কিছু মানুষ অন্যের সহায়তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন, তাদের জন্যে কাজের সংস্থান ও আয়ের পথ খোলা নেই। করোনার কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি একেবারেই মন্থর হয়ে গেছে। অথচ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা তরুণের সংখ্যা তো বেড়েই চলেছে। আবার করোনার কারণে অনেকের চাকরি গেছে। ফলে দেশে বেকারের সংখ্যাও বেড়েছে অনেক। এ অবস্থায় এমনিতেই সচ্ছল পরিবারের উচিত ছিল- উৎসবের ব্যয় কমিয়ে অভাবী মানুষের সহায়তায় তা ব্যয় করা। সেবাই হতে পারত এবারের উৎসবের মূল আদর্শ।

তবে এটা ঠিক, জাতিকে এ রকম একটি মহৎ আদর্শে চালিত করতে হলে দেশের নেতৃত্বকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হয়। সেখান থেকে সবার জন্যে যদি স্পষ্টভাষায় দ্ব্যর্থহীনভাবে আদর্শিক মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে বিপদগ্রস্ত মানবতার পাশে দাঁড়ানোর জোরালো আহ্বান জানানো হয়- তা হলে মানুষ কিন্তু সাড়া দেয়। এটি আমরা অতীতে বারবার দেখেছি। তাই বলব সরকার ও ক্ষমতাসীন নেতৃত্বকে ত্যাগ ও সংযম এবং সেবা ও সহানভূতির সাথে কষ্টে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদাত্ত আহ্বান জানাতে হতো। এতে জনগণ অনুপ্রাণিত হতো বলেই আমাদের বিশ্বাস। কারণ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা- এমনি বিভিন্ন উপলক্ষে মানুষ ত্যাগ ও সেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মুক্তিযুদ্ধ বা বিভিন্ন সংগ্রামেও জাতির ত্যাগ ও প্রকৃত বীরত্বের পরিচয় আমরা পেয়েছি। আজও তেমনভাবে তাদের সুপ্ত মহত্ত্বকে জাগিয়ে তোলার দায় ছিল নেতৃত্বের। সেভাবে আমরা বাস্তবতার আলোকে ঈদের এক নতুন তাৎপর্যময় উদযাপন করতে পারতাম। এ হতো করোনাকালের যথার্থ উদযাপন।

তবু আমরা আশা করব, সব শেষ হয়ে যায়নি। করোনা ভাইরাসের আচরণ অনিশ্চিত, হয়তো গতবারের মতো আমরা রক্ষা পাব এবং ভবিষ্যতের জন্যে এ অতিমারি মোকাবিলায় জাতি আবারও জাগরণ ও ঐক্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এ দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের পথ খুলে দেবে। আর তখন যে কোনো উৎসব হয়ে উঠবে আনন্দময় উদযাপনের উপলক্ষ- ঈদ তো বটেই।

advertisement