advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বিচ্ছিন্ন করা যায়নি ঢাকাকে

বেড়েছে কেবল ভোগান্তি আশপাশের সাত জেলায় ঢিলেঢালা লকডাউন

তাওহীদুল ইসলাম
২৪ জুন ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২১ ০৮:২৭
advertisement

মহামারী করোনার সংক্রমণ বাড়ায় রাজধানী ঢাকার আশপাশের সাত জেলায় চলছে পুরোপুরি লকডাউন। বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে ঢাকার সঙ্গে অন্য জেলার যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, তা পূরণ হয়নি। নগরীর প্রবেশপথগুলো থেকে যানবাহন ফিরিয়ে দেওয়া হলেও ঠেকানো যাচ্ছে না মানুষের আসা-যাওয়া।

সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে না পারার ব্যর্থতায় সংক্রমণঝুঁকি রয়েই গেছে। যদিও ঢাকার প্রবেশ ও বহির্গমন পথে স্থাপন করা হয়েছে চেকপোস্ট। ফলে গতকালও রাজধানীর গাবতলী, টঙ্গী ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রবেশ করতে পারেনি দূরপাল্লার কোনো গাড়ি। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় বিকল্প বাহনে মহানগরীতে প্রবেশ ঠিকই চলেছে। প্রাইভেট কার, হিউম্যান হলার, ভ্যান, অটোরিকশায় পার হয়েছে মানুষ। পুলিশের চেকপোস্ট আছে এমন স্থান পাড়ি দিতে অনেকেই দিচ্ছেন অসুস্থতার দোহাই।

যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে অবশ্য জানা গেছে, মহানগরীতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অনেকেরই কর্মস্থল রয়েছে। ঢাকা থেকে অনেকেই টঙ্গী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মেঘনাঘাট অঞ্চলে অফিস করেন। আবার সেসব অঞ্চলের লোকজন প্রতিদিন এসে রাজধানীতেও চাকরি করেন। পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের

সাবেক সভাপতি ডা. আবু জামিল ফয়সাল আমাদের সময়কে বলেন, ‘ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করার মধ্য দিয়ে করোনা সংক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু বিদ্যমান পদ্ধতি কার্যকর হচ্ছে না। কারণ সাভার, মাওয়া, কেরানীগঞ্জ, চট্টগ্রাম রোডে নেমে ঠিকই ঢাকায় আসছে লোকজন। অর্থাৎ যাতায়াতের ধরন বদলে মানুষের ভোগান্তিই বাড়ানো হয়েছে কেবল। গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়াও।’

দেখা গেছে, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি ভাড়ায় যাত্রী আনা-নেওয়া করছে ছোট ছোট যান। হাসান আলী বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছেন গতকাল। লঞ্চ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে তিনি বিকল্প ব্যবস্থায় রওনা হন। চলতি পথে নয়বার বাস, ভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ফেরিতে চেপে কয়েক গুণ ভাড়ায় ঢাকা ফিরেছেন তিনি। হাসান জানান, গ্রামের বাড়িতে ছিল নির্বাচন। কিন্তু ভোট শেষে হঠাৎ করে শোনেন লকডাউন। তাই বাধ্য হয়েই এভাবে ঢাকায় ফিরতে হয়েছে। পথে পুলিশ আটকালেও ম্যানেজ করে চলে এসেছেন। হাসান মনে করেন, পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া তাৎক্ষণিক ঘোষণায় এমন কঠোর লকডাউন দেওয়ায় করোনা সংক্রমণ ঢের বাড়তে পারে। কেননা গাদাগাদি করে ফেরিসহ বিকল্প বাহনে চড়ছে মানুষ। এতে সরকারের সংক্রমণঝুঁকি এড়ানোর চিন্তা বিফলেই যাচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে অফিস করেন লুৎফর। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের লকডাউনে গাড়ি চলছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের ভোগান্তি চরমে। অতিরিক্ত ভাড়া গুণে বিকল্প বাহনে ঠিকই মানুষ তার কাক্সিক্ষত গন্তব্যে যেতে পারছে। বরং এতে করে উল্টো সংক্রমণঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে। রাজধানীগামী ও রাজধানী ছেড়ে যাওয়া যাত্রীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।’

রাজধানীর চট্টগ্রাম রোড, সায়েদাবাদ, গাবতলী ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে আটকেপড়া যাত্রীরা বাড়ি যেতে ভিড় জমাচ্ছেন সানারপাড় এলাকায়। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসগুলো নিয়ম না মেনেই যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন জেলায় ছুটছে। পুলিশ আটকালেই চিকিৎসাপত্র দেখিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন অনেকে। তবে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল পুরোপুরি ফাঁকা। কমলাপুর রেলস্টেশনও যাত্রীহীন। গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে হেঁটেই যাত্রীরা আসা-যাওয়া করছেন। গতকাল বুধবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেই এলাকায় দেখা যায় মানুষের ঢল। বেশিরভাগই হেঁটে প্রবেশ করছেন ঢাকায়। তাদের মধ্যে অফিসগামী মানুষের সংখ্যাই বেশি, যারা মূলত সাভারে থাকেন। এ ছাড়া রয়েছেন পোশাককর্মী। এর বাইরে অন্যান্য জেলা থেকে ঢাকার পথে আসছেন চিকিৎসা করাতে আসা রোগী, বেড়াতে গিয়ে আটকে পড়া ঢাকার বাসিন্দারা। এ ছাড়া বাইরের জেলাগুলো থেকে ভেঙে ভেঙে আসছেন অনেকে। এতে খরচ হচ্ছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, ‘বাসে করে গাইবান্ধা থেকে মির্জাপুরে আসতে প্রতি টিকিটের মূল্য ৪০০ টাকা। মির্জাপুর থেকে চন্দ্রা ভ্যানে এসেছেন জনপ্রতি ৩০০ টাকায়। সেখান থেকে নবীনগর এসেছেন ৪০০ টাকায়। আবার নবীনগর থেকে আমিনবাজার ব্রিজের গোড়া পর্যন্ত লেগুনায় এসেছেন ৩০০ টাকায়। এর পর শুধু চালের বস্তাটা ভ্যানে করে আমিনবাজর ব্রিজ পার হতে লেগেছে ২০০ টাকা।’ গাবতলীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মোহাম্মদ নাজমুল বলেন, ‘আমরা চেক করছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ চিকিৎসার কথা বলছে। মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল- এগুলোই চলাচল করছে বেশি।’

এদিকে ঢাকার চারপাশের জেলাগুলোতেও ছিল প্রায় একই চিত্র। বেশিরভাগ এলাকাতেই চলছে ঢিলেঢালা লকডাউন। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, বিভিন্ন জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

গাজীপুর : সরকার ঘোষিত চলমান লকডাউনে গাজীপুরে বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লার যানবাহন, দোকান, মার্কেটসহ সব বিপণিবিতান। যানবাহন সংকটে দুর্ভোগে পড়েছেন কর্মস্থলে যাওয়া গার্মেন্টস শ্রমিক, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। তবে কাঁচাবাজার ও নিত্যপণ্যের দোকানে ক্রেতা-বিক্রেতারা মানছেন না সামাজিক দূরত্ব কিংবা স্বাস্থ্যবিধি। অনেকটা দায়সারাভাবে এসব স্থানে লোকজন আনাগোনা করছে। চান্দনা চৌরাস্তা, জয়দেবপুরসহ বিভিন্ন স্থানের বাজারেই দেখা গেছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। অনেকের মুখেই নেই কোনো মাস্ক। এ ব্যাপারে গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার জাকির হাসান বলেন, ‘প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় লকডাউন বাস্তবায়নে পুলিশ কঠোর অবস্থানে ছিল। জনসচেতনতায় করা হচ্ছে মাইকিং।’ এদিকে গাজীপুরে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৬ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

মানিকগঞ্জ : লকডাউনে মানিকগঞ্জ শহর এবং ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ রয়েছে। জেলা শহরের সড়কগুলোতেও যান চলাচল খুবই কম। বন্ধ রয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথেও যাত্রীদের যাতায়াত ছিল কম।

নারায়ণগঞ্জ : জেলায় লকডাউন চলছে ঢিলেঢালা। প্রশাসনের কড়াকড়ির মাঝেও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে। নানা অজুহাতে ঘর থেকে বের হচ্ছে লোকজন। বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও অন্যান্য পরিবহনের চলাচল আগের তুলনায় ছিল অনেকটাই বেশি। অনিয়ম রুখতে ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্টকে।

গোপালগঞ্জ : সর্বাত্মক লকডাউনের দ্বিতীয় দিনেও সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে উদাসীন দেখা গেছে। বেশিরভাগ মানুষই উপযুক্ত কারণ ছাড়া বাইরে বেরিয়েছে। কাঁচাবাজারে আর ইজিবাইক ও মাহেন্দ্রগুলোয় নেই স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই। যদিও বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করছে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীরা। গোপালগঞ্জ থেকে গতকাল ছেড়ে যায়নি দূরপাল্লার কোনো যান। চলাচল করেনি লোকাল বাসও। এদিকে জেলায় নতুন করে ৪২ জনের শরীরে করোনার জীবাণু পাওয়া গেছে। শনাক্তের হার ৪৪ দশমিক ২১ শতাংশ। মৃত্যু হয়েছে মুকসুদপুরের এক কোভিড রোগীর।

রাজবাড়ী : করোনা ঠেকাতে কঠোর লকডাউনের কারণে রাজবাড়ী জেলা প্রায় অবরুদ্ধ। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে গোয়ালন্দ মোড়ে আহলাদীপুর হাইওয়ে থানা পুলিশ দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ করে রেখেছে। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটেও বন্ধ রয়েছে লঞ্চ চলাচল। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৯৫ জনের করোনা পরীক্ষায় ৩৫ জনের পজিটিভ ধরা পড়েছে।

মুন্সীগঞ্জ : লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে ছিল ঢিলেঢালা পরিস্থিতি। জেলা শহরসহ উপজেলাগুলোয় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অন্যান্য দিনের মতোই খোলা ছিল। ছোট ছোট যানবাহন ও মানুষের চলাচলও ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়কের মুক্তারপুর সেতু এলাকাসহ ১০টি পয়েন্টে বসানো হয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট। এদিকে জেলায় আরও ছয়জনের দেহে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

প্রতিদেবনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আবুল হাসান (গাজীপুর), আশরাফুল আলম লিটন (মানিকগঞ্জ), নাদিম হোসাইন (মুন্সীগঞ্জ), সৈয়দ মুরাদুল ইসলাম (গোপালগঞ্জ), আবু সাউদ মাসুদ (নারায়ণগঞ্জ), মো. রফিকুল ইসলাম (রাজবাড়ী)।

advertisement