advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

আকাশপানে ছুটছে সংক্রমণ

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর হওয়ার আহ্বান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের

দুলাল হোসেন
২৪ জুন ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২১ ০৮:৪২
advertisement

সারাদেশেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হু হু করে বাড়ছে। তবে বেশি বাড়ছে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে। আগের দিন সকাল থেকে গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় যত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে, তাতে রোগী শনাক্তের হার ২০ শতাংশের বেশি। অথচ এ মাসের শুরুতে সংক্রমণ হার ছিল ১০ শতাংশের নিচে। রোগী বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে সংক্রমণ আরও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সাবধান করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও বলছে, পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে আরও শোচনীয় হতে পারে। তাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলমান লকডাউন ও বিধিনিষেধকে কঠোরভাবে মেনে চলতে সবার প্রতি অনুরোধ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনে আরও কঠোর হওয়ারও আহ্বান জনিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ২৮ হাজার ২৫৬টি নমুনা পরীক্ষায় ৫ হাজার ৭২৭ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছেন আরও ৮৫ জন। এর মধ্যে ৫৫ জন পুরুষ ও ৩০ জন নারী। এদিন মোট নমুনা পরীক্ষায় রোগী শনাক্তের হার ২০.২৭ শতাংশ। দেশে এখন পর্যন্ত মোট ৬৪ লাখ ৫ হাজার ৭৫টি নমুনা পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৮৭৭ জন। মোট নমুনা পরীক্ষায় রোগী শনাক্তের হার ১৩.৫৩ শতাংশ।

রাজধানীতে গত ১৭ জুন ১০ হাজার ৬৫৩টি নমুনা পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৯১৬ জন। ওই দিনের নমুনা পরীক্ষায় রোগী শনাক্তের হার ছিল ৮.৬০ শতাংশ। তার সাত দিন পর গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ১৩ হাজার ২৪০টি নমুনা পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৬৪ জন এবং সংক্রমণ হার ১৫.৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে একদিনে সংক্রমণ ৭ শতাংশ বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন জানান, তারা দেশে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থার দিকে কড়া নজর রাখছেন। তবে এখনো সারাদেশে সর্বাত্মক লকডাউনের কথা ভাবা হচ্ছে না। কিন্তু পরিস্থিতি যদি নাজুক হয় এবং প্রতিটি জেলায় যদি সংক্রমণ ২০ শতাংশের ওপরে চলে যায় তা হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গতকাল স্বাস্থ্য বুলেটিনে অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, ‘গত ১৬ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েই যাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই দৈনিক শনাক্ত ৪ হাজারের বেশি। বিশেষ করে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা সীমান্তবর্তী এলাকাতে বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। গত এপ্রিল মাসে দেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর ছিল। সে সময় এক মাসেই প্রায় ১ লাখ রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন। মে মাসে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শনাক্ত কমে আসে ৪১ হাজার ৪০৮ জনে। কিন্তু জুন মাসে এরই মধ্যে ৬০ হাজার ৬১০ জন রোগী শনাক্ত হয়ে গেছে। এখন জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

ঢাকায় সংক্রমণের হার এখনো এতটা বাড়েনি, তবে যে কোনো সময় বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করেন ডা. আমিন। তিনি বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী ৭ জেলায় লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। আমরা আপাতত ঢাকার পার্শ্ববর্তী ৭ জেলার সংক্রমণ পরিস্থিতি দেখছি। যদি সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি এবং ঢাকার পরিস্থিতি নাজুক হয় তা হলে শুরুতে রাজধানীতে লকডাউনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা হলে সারাদেশে লকডাউনের প্রয়োজন হবে বলে মনে করি না। তাই সংক্রমণ কমিয়ে আনার জন্য চলমান লকডাউন ও বিধিনিষেধ কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনে কঠোর হতে অনুরোধ করা হলো।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে চলমান লকডাউন এবং বিধিনিষেধে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা, হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুতি নিতে সুযোগ দেওয়া এবং মৃত্যু কমিয়ে আনার জন্য সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। একই সঙ্গে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে বর্তমান পরিস্থিতি আরও শোচনীয় অবস্থায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।’

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কমিটির সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘রাজধানীতে যেন সংক্রমণ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য ঢাকাকে আশপাশের জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। কিন্তু সংক্রমণ প্রতিরোধে যে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা ছিল সেগুলো করা হচ্ছে না। ফলে করোনার সংক্রমণ সামনের দিকে খুবই ভয়ানক হবে। গত ১০ দিনের মধ্যে করোনা সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে ২০-২১ চলে এসেছে, এটা এখন খুব ভয়ানক অবস্থায় যাচ্ছে। আমরা খারাপ অবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এ অবস্থা থেকে ঢাকা শহরকে বাইরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেই সংক্রমণ কমবে না। এখানকার সংক্রমণ কমানোর জন্য ঢাকার ভেতরে কাজ করতে হবে। ঢাকার ভেতরে কোনো রকম যদি কাজ শুরু না করি, শহরের ভেতরেই তো হাজার-হাজার করোনা রোগী আছে। এত রোগী থাকার পরও অন্য শহর থেকে ঢাকাকে আলাদা করে লাভ নেই। এমন নয় যে বিচ্ছিন্ন করলেই সংক্রমণ কমে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে যেন বাইরে থেকে মানুষ না আসতে পারে এবং ঢাকার মানুষ যেন বাইরে যেতে না পারে। ট্রেন বন্ধ, আন্তঃজেলা পরিবহন বন্ধ কিন্তু মানুষের চলাচল তো আর বন্ধ হয়নি। মানুষ ঢাকা শহর থেকে হেঁটে বা ছোট ছোট বাহনে করে শহরের বাইরে পাশর্^বর্তী এলাকা থেকে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। আবার একই কায়দা আসছে। এভাবে হাজার-হাজার মানুষ আসা-যাওয়া করলে সক্রমণ তো কমবে না। ঢাকায় সংক্রমণ কমাতে হলে আমাদের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হবে। যেমন জনসমাগম বন্ধ, শপিংমল ও দোকানপাট সীমিত সময় খোলা রাখা, সন্ধ্যার পর সব ধরনের চলাচল বন্ধ, খাবারের দোকান বন্ধ, কলকারখানায় স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা, শতভাগ মাস্ক পরা নিশ্চিত করা, ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালনোসহ জনগণকে সম্পৃক্ত করা, বেশি বেশি পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত, চিকিৎসাসেবা প্রদান, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এগুলো করতে দেখা যাচ্ছে না।’

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণপূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, ‘সংক্রমণ কমানোর একটি পন্থা হচ্ছে লকডাউন। কিন্তু একমাত্র পন্থা নয়। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট হোক বা অন্য কোনো ভ্যারিয়েন্ট, এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রোগী শনাক্ত। যদি তাড়াতাড়ি শনাক্ত করা যায় তাহলে চিকিৎসায় দ্রুত ভালো হয়ে যাবে। টিকা নেওয়া থাকলে সংক্রমণ হলেও তাদের ঝুঁকি থাকবে না। লকডাউনের সঙ্গে যেসব বিধিনিষেধ আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি বাস্তবায়ন করা যায় তা হলে সংক্রমণ কমার সম্ভাবনা আছে।’

advertisement