advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

মহিউদ্দীন আহমেদ
প্রকাশনাশিল্পের পথিকৃৎ

ড. বিমল গুহ
২৪ জুন ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জুন ২০২১ ১১:৩৬ পিএম
advertisement

বর্তমান বিশ্বে মুদ্রণ ও প্রকাশনা একটি অগ্রসরমান মাধ্যম- যা প্রতিনিয়ত আধুনিকতররূপে বিকশিত হচ্ছে। দিনে দিনে নবতর চিন্তা ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সমন্বয়ে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এর রূপাদল। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। আধুনিক বিশ্বকে প্রযুক্তিবিশ্ব বললে অত্যুক্তি হয় না। মানুষের চেতনা বিকাশের সব পর্যায়ে প্রযুক্তির প্রভাব বড় রকমের পরিবর্তন আনছে পৃথিবীতে। এর প্রভাব মুদ্রণ ও প্রকাশনাশিল্পেও সমভাবে বিদ্যমান। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই প্রযুক্তির এই সুফলপ্রাপ্তি থেকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্য অনেক বিষয়ের মতো আমাদের প্রকাশনা জগৎ নিয়ে যারা চিন্তাভাবনা করেছেন- সদ্য প্রয়াত মহিউদ্দীন আহমেদ সেই পুরোধা পুরুষদের মধ্যে অন্যতম। তিনি অতিসম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন বার্ধক্যজনিত কারণেই। যদিও এই বিজ্ঞানবিশ্বে ৭৭ বছর বয়স খুব বেশি নয়, তবুও তিনি দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে বে-আরামে ছিলেন। অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো।

প্রকাশনা যে ‘শিল্প’, এ ধারণা পেতে আমাদের অনেক সময় লেগেছে- মহিউদ্দীন আহমেদদের এই পেশায় আসা পর্যন্ত। এই অঞ্চলে শুরুর দিকে স্কুল-কলেজের পাঠ্যবইয়ের প্রকাশ, বিশেষ করে নোটবইয়ের মুদ্রণই ছিল প্রকাশনা! তখন আমাদের প্রকাশনা ভুবনও নোটবই-প্রকাশকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। আমরা স্মরণ করতে পারি, এক সময় ‘আদিল ব্রাদার্স’ নামে একটি প্রকাশনা হাউস ছিল। তারা ‘টেস্ট পেপার’ নামে একটি বই বের করত। সারাদেশে ব্যাপক চাহিদা ছিল বইটির। নামেই বোঝা যাচ্ছে কী থাকত এ বইয়ে। থাকত নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন ও এর উত্তর। আমরাও অজগাঁয়ে থেকেও কিনেছি এ বই। ‘পুঁথিঘর’ নামে চিত্তরঞ্জন সাহাও এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান করেন। এভাবে কেউ কেউ এসেছিলেন। এই ছিল আমাদের আদি প্রকাশনার রূপ।

স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রকাশনা জগতের প্রকৃতি পরিবর্তন হয় ব্যাপকভাবে। চিত্তরঞ্জন সাহা শুরু করেন ‘মুক্তধারা’ নামে আরেকটি সৃজনশীল প্রকাশনা হাউস। এই পেশায় এলেন মহিউদ্দীন আহমেদের মতো শিক্ষিত ব্যক্তিরা। মহিউদ্দীন আহমেদ প্রথম দিকে কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস’-এর সঙ্গে। তখন তিনি মনে-প্রাণ প্রকাশনা-পেশাজীবী হয়ে উঠতে লাগলেন। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ফজলে রাব্বিসহ কেউ কেউ যুক্ত ছিলেন। মহিউদ্দীন আহমেদ সংস্থাটির ঢাকা শাখার কর্মনির্বাহী ছিলেন। ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস’ শাখাটি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পরিচালিত হয়েছিল। এর পর বন্ধ হয়ে যায়। তখন প্রকাশনার সঙ্গে আত্মিকভাবে যুক্ত এই ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড’- সংক্ষেপে ইউপিএল। ইউপিএল প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলে একাডেমিক প্রকাশনা খুঁজে পায় এক বিরাট ক্ষেত্র। প্রকাশনা যে শুধু ছাপাকাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ বিষয় নয়, তা ভাবতে শিখিয়েছিলেন মহিউদ্দীন আহমেদের মতো ব্যক্তিত্বরা। প্রসঙ্গক্রমে মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা কিংবা জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীর মফিদুল হক প্রমুখের নাম আসে। তারাই মান-প্রকাশনা বলতে যা বোঝায়, এর পথ দেখিয়েছেন।

প্রকাশনা জগতের পথিকৃৎ মহিউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের অনুষ্ঠানে। গ্রন্থকেন্দ্রের তৎকালীন পরিচালক ফজলে রাব্বি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তার সঙ্গে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা। এর কিছুদিন আগে ফিলিপাইন থেকে সম্পাদনা প্রকাশনা বিষয়ে একটি প্রশিক্ষণ শেষ করে দেশে ফিরেছি। বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের প্রকাশনার মানোন্নয়নে কাজ করছি। ওই সময় প্রতিষ্ঠা করি ‘বাংলাদেশ সম্পাদনা ও প্রকাশনা সমিতি’। মহিউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে পেশাগত বিষয়ে অনেকবার আলোচনা হয়েছে। সমিতির ব্যাপারেও নানা পরামর্শ পেতাম তার কাছে। পরে যখন ২০০৭, ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পাদনা ও প্রকাশনা বিষয়ে তিনটি আন্তর্জাতিক মানের ওয়ার্কশপের আয়োজন করি, তখনো তার পরামর্শ পেয়েছি। ওয়ার্কশপ সমাপ্তির পর ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ বিভাগ’ প্রতিষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করেছি শুনেও তিনি খুশি হয়েছিলেন। এই বিভাগ প্রতিষ্ঠার পেছনে যিনি আমাকে পরামর্শ দিয়ে এগিয়ে দিয়েছেন, তিনি হলেন আন্তর্জাতিক প্রকাশনা বিশেষজ্ঞ ও আমার শিক্ষক কানাডার টরেন্টো ইউনিভার্সিটির ইয়ান মনটাগনেস। মহিউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে তারও পরিচয় ছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

আজ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মর্যাদা পেয়েছে। আমাদের কৃষি, শিল্প, অর্থনীতির কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়েছে। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক সূচকের প্রতিটি ধাপে বাংলাদেশ সফলতার ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তখনই সফলতা আসতে পারে- জাতি যখন সমাজের সার্বিক অগ্রগতির জন্য প্রকাশনাশিল্পসহ মানুষের জ্ঞানবৃদ্ধির সব অনুষঙ্গকে জাতীয় অগ্রগতির সম্পূরক বিষয় হিসেবে ভাবতে শেখে। এ ক্ষেত্রে প্রকাশনাশিল্পের অবদান গুরুত্বপূর্ণ এই জন্য যে, মানুষের অধীতজ্ঞান ও সৃষ্টজ্ঞান উদ্দিষ্ট পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মান প্রকাশনাই গুরুত্বই ভূমিকা রাখতে পারে। এই শিল্পকে বাংলাদেশে উন্নতির এই জায়গায় যারা নিয়ে এসেছেন, তাদের নক্ষত্রপুরুষ হলেন প্রকাশনা-পেশাজীবীদের কাছে সম্মানিত ‘ইমেরিটাস প্রকাশক’ মহিউদ্দীন আহমেদ। প্রকাশনাশিল্পের মানোন্নয়নে ‘গ্রন্থ নীতিমালা’ প্রণয়নের জন্যও তিনি আমৃত্যু সোচ্চার ছিলেন। আজ তার বিদায় যেন প্রকাশনাশিল্প জগতের নক্ষত্র পতন।

ড. বিমল গুহ : কবি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ বিভাগের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা

advertisement