advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

চীনের করোনা ভ্যাকসিন ও বাস্তবতা

বিপ্লব কুমার পাল
৩০ জুন ২০২১ ২২:০৯ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২১ ২২:০৯
প্রতীকী ছবি
advertisement

দেশে কোভিড আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নয় লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৪ হাজার ৩৮৮ জনের। পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। সংক্রমণ ছড়িয়েছে গ্রামাঞ্চলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো দেশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা বোঝার একটি নির্দেশক হলো করোনা শনাক্তের হার। টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্ত ৫ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা যায়। সেখানে কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশে রোগী শনাক্ত ২৩ শতাংশের বেশি হচ্ছে। এতেই চিন্তা বাড়িয়েছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। বাধ্য হয়ে সরকার বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে কঠোর লকডাউন দিয়েছে।

করোনা থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি টিকার বিকল্প দেখছেন না চিকিৎসকেরা। তাই টিকা কিনতে মরিয়া সরকার। যত টাকাই লাগুক দেশের সব নাগরিককে বিনামূল্যে টিকা দিতে চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকার দেশের সকল নাগরিককে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন প্রদান নিশ্চিত করবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য যত টাকাই লাগুক না কেন, আমরা সেই টাকা দেব।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যখন ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা চলছিল, তখন থেকেই সরকার ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য পৃথিবীর সমস্ত জায়গায় চেষ্টা শুরু করে। এটা দুর্ভাগ্য, ভারতে হঠাৎ করোনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেল। তারা এই ভ্যাকসিন রপ্তানি করা বন্ধ করে দেওয়ায় আমরা সাময়িকভাবে কিছুটা সমস্যায় পড়ে গেছি। কিন্তু বর্তমানে আল্লাহর রহমতে আমাদের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এখন আর কোনো সমস্যা হবে না।’

যখন ভারত থেকে টিকা আসা বন্ধ তখনই উপহার হিসেবে বাংলাদেশকে দুই দফায় ১১ লাখ টিকা দিয়েছে চীন। যদিও চীনের সিনোফার্মের কাছ থেকে টিকা পাওয়ার বিষয়ে চার মাস আগে আলোচনা শুরু হয়েছিল। সিনোফার্মের কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের দেড় কোটি ডোজ কিনছে বাংলাদেশ। মন্ত্রিপরিষদের ভ্যাকসিন ক্রয় কমিটি চীনের এই ভ্যাকসিন কেনার অনুমোদনও দিয়েছে।

এরপর এক কর্মকর্তা জানিয়েছে, সিনোফার্মের প্রতি ডোজ ভ্যাকসিন ১০ ডলারে কিনছে বাংলাদেশ। চীনের সিনোফার্মের ভ্যাকসিনের এই দাম প্রকাশের পর শ্রীলংকায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। একই ভ্যাকসিনের প্রতি ডোজ ১৫ ডলারে কিনছে শ্রীলংকা। করোনার টিকার দাম সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করায় চীন বিরক্ত হয়। এ নিয়ে চীনের আনুষ্ঠানিক চিঠির জবাবে বাংলাদেশ দুঃখ প্রকাশও করেছে। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী গণমাধ্যমে সিনোফার্মের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের কথা জানান। যদিও তখন পর্যন্ত চুক্তিতে বাংলাদেশ সই করলেও চীন সই করেনি। আবারও বিরক্তির কথা বাংলাদেশকে জানায় চীন।

চীন থেকে প্রতি চালানে ৫০ লাখ করে তিন ধাপে দেড় কোটি ডোজ করোনার টিকা দেশ আসবে। এক ডোজ টিকা ১০ ডলার ধরে হিসাব করলে দেড় কোটি ডোজ আনতে সরকারের খরচ হবে ১ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। অথচ ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত প্রতি ডোজ ৪ ডলারে কিনছে বাংলাদেশ।

এদিকে চীনের টিকার দাম প্রকাশ করার পর সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ওএসডি হয়েছে। টিকা ক্রয়ের দাম গোপন রাখতে বলেছিল চীন। অথচ ভারত টিকার দাম গোপন করেনি। কিন্তু ভারত থেকে সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদিত টিকার দাম নিয়ে দেশে কতো সমালোচনা হয়েছে। অথচ চীনের টিকার দাম নিয়ে কারোর মুখে ’রা’ শব্দ নেই। যদি দাম আরো পাঁচ ডলার বেড়ে যায়!

গত মাসে চীনের সিনোফার্মের টিকা দেওয়া শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ঢাকার চার মেডিকেল কলেজের এক হাজার শিক্ষার্থীকে সিনোফার্মের টিকা দেওয়া হয়। যেহেতু বাংলাদেশে এ টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ আগে হয়নি, সেহেতু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী প্রথম টিকা পাওয়া ওই এক হাজার জনকে কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

সিনোফার্মের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে গণমাধ্যমে। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফাঁস হওয়া দলিল অনুসারে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ি, সিনোফার্মের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিশ্চিত না করে গ্রহণ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। এদিকে ব্রাজিলের স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে, অ্যান্টিবডি তৈরির ক্ষেত্রে সিনোফার্মের ভ্যাকসিন কেবল ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ কার্যকর। সম্প্রতি, বাহরাইন তার নাগরিক এবং প্রবাসীদের সিনোফার্মের  তৃতীয় ‘বুস্টার ডোজ’ গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে। সৌদি আরব ফাইজার, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জনসন অ্যান্ড জনসন এবং মডার্নার ভ্যাকসিন স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সিনোফার্মসহ অন্য কোনো ভ্যাকসিন নিলে তাদের বাধ্যতামূলক সাত দিনের কোয়ারেন্টিনে যেতে হবে।

জাপানের রাজধানীতে বসছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ।’ করোনার টিকা নিয়ে এই অলিম্পিকে অংশ নিতে হবে অ্যাথলেটদের। অংশগ্রহণকারী অ্যাথলেটদের এই টিকা সরবরাহ করার প্রস্তাব দিয়েছিল চীন। কিন্তু আয়োজক দেশ জাপান চীনের এই টিকা নিতে রাজি নয়। জাপান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, ‘চীনের এই টিকা চাই না।’ করোনার প্রতিষেধক হিসেবে চীনের বানানো টিকা ব্যবহারের যোগ্য বলে মনে করছে না জাপান।

করোনা টিকা নিয়ে বিশ্বে যখন হাহাকার, তখন বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন পাঠিয়েছিল ভারত। কিন্তু এ নিয়েও ষড়যন্ত্র কম হয়নি। একবার বলা হলো, করোনার ভ্যাকসিন বাংলাদেশকে দেবে না ভারত। যখন বাংলাদেশে ভ্যাকসিন এলো, তখন বলা হলো- ভেজাল ভ্যাকসিন পাঠানো হয়েছে। এই ভ্যাকসিন নিয়ে যারা তাচ্ছিল্য করেছিলেন তারাই আবার ওই ভ্যাকসিন নিয়েছেন।

ভারতে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়া এবং টিকা উৎপাদনের কাঁচামাল সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করায় সেরাম ইন্সটিটিউটএখন বাংলাদেশে প্রতিশ্রুত টিকা সরবরাহ করতে পারছে না বলে জানিয়েছে। এতে করে কয়েক লাখ লোকের সময়মতো দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে আশার কথা সেরামের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি বহাল আছে। আশা করা যায় ভারতের পরিস্থিতি উন্নতি হলে বাংলাদেশও টিকা পেতে শুরু করবে।

বিপ্লব কুমার পাল: গণমাধ্যমকর্মী

advertisement