advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

‘আমাদের ন্যূনতম সম্মান নেই...’

মোহাম্মদ আলম ও ফয়সাল আহমেদ, গাজীপুর থেকে
১ আগস্ট ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২১ ১১:২৮ পিএম
advertisement

ঈদের পূর্বেই ঘোষণা দেওয়া হয় ৫ আগস্ট পর্যন্ত কারখানা বন্ধ। এমন ঘোষণায় গাজীপুরের মোহাম্মদী গ্রুপের একটি কারখানা শ্রমিক আবদুল করিম মিয়া স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঈদ করতে গিয়েছিলেন জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গ্রামের বাড়িতে। গত শুক্রবার ঘোষণা হয় কারখানা খোলা রবিবার থেকে। সড়কে যানবাহন না থাকায় শুক্রবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পা দিয়ে চালিত ভ্যান ও অটোরিকশায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা ব্যয় করে শনিবার সকাল পর্যন্ত মাওনা চৌরাস্তায় পৌঁছান। এর মধ্যে দুবার বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে। যাত্রাবিরতি দিতে হয়েছে আটবার। এমন ভোগান্তিতে তার সাত বছর বয়সী শিশুসন্তানও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আবদুল করিমের দীর্ঘশ্বাস- ‘আমরা কারখানা শ্রমিক, সবাই যার যার ইচ্ছেমতো আমাদের ব্যবহার করেন। ন্যূনতম সম্মান নেই কোথাও। যানবাহন বন্ধ রেখে কারখানা খোলার ঘোষণায় যে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে এ যেন মরণ যন্ত্রণার সমান।’

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ সদর উপজেলার সাহিদা খাতুন কাজ করেন গাজীপুরের শ্রীপুরের নোমান গ্রুপের জাবের জোবায়ের অ্যাক্সেসরিস কারখানায়। তার সঙ্গে গতকাল কথা হয় গাজীপুর বাইপাস এলাকায়। তিনি বলেন, ‘১৫ দিন বন্ধের কারণে বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ঈদ কাটিয়েছি। ৫ তারিখ পর্যন্ত কারখানা বন্ধের কথা বলা হলেও হঠাৎ করে বলা হয়েছে, রবিবার সকাল থেকে কারখানা খোলা। গত তিন দিন ধরে তার স্বামীর জ্বর। তিনি অসুস্থ স্বামীসহ ক্ষুদ্র বাহনে করে ভোগান্তি মাথায় নিয়েই ফিরছেন। গণপরিবহন বন্ধের কারণে তাদের দুজনের আসতে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার টাকা।

রাজশাহীর পুঠিয়া থেকে কারখানা শ্রমিক তরিকুল ইসলাম ফিরছিলেন ৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে। তার মতে, শিল্পকারখানার চাকরি বর্তমানে সোনার হরিণ। কারখানা কর্তৃপক্ষের কথামতো চলতে হয়। না হলে চাকরি চলে যায়। অন্তত চাকরি টিকিয়ে রাখতে তিনি ভোগান্তি ও অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে ফিরে এসেছেন।

গাজীপুর সদরের ম-ল গ্রুপের কারখানা শ্রমিক তাসলিমা বলেন, ‘ঈদের পূর্বে আমাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য গণপরিবহন খুলে দিল সরকার। পরে ৫ আগস্ট পর্যন্ত লকডাউন দিয়ে গণপরিবহন বন্ধ করে ১ আগস্ট থেকে কারখানা খোলার ঘোষণা দিল। আমরা গরিব মানুষ, যা বেতন পাই তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাই। আমরা কীভাবে ফিরব তা কেউ ভাবে না। যে যার মতো আমাদের ব্যবহার করে। অতিরিক্ত ভাড়ায় যেতে ও আসতে এবার অনেক টাকাই যে দেনা হয়ে গেল। জানি না সামনে কীভাবে চলব।’

গতকাল দুপুরে চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন কোনাবাড়ী এলাকার স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কারখানার শ্রমিক সিরাজগঞ্জের আবু তাহের ও আমজাদ হোসেন। তারা বললেন, ‘কত কষ্ট করে সিরাজগঞ্জ থেকে আইলাম ভাই। চেকপোস্টে পুলিশ নামায়া দেয়। পাঁচবার পিকআপ আর অটো বদলাইছি। জনপ্রতি কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা আসতেই এক হাজার টাকা খরচ হইছে। কষ্টের সীমা নাই।’

ট্রাকচালক আবদুল আলীম বলেন, তিনি গত এক সপ্তাহ ধরে রাতে সিরাজগঞ্জ থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত যাত্রী নিয়ে আসছেন। ভাড়া বেশি, তাই আয়ও বেশি হচ্ছে। আর তাদের বেলায় পুলিশের ঝামেলাও একটু কম থাকে। যমুনা সেতু ও মির্জাপুর এলাকায় পুলিশ ধরেছিল। দুই জায়গায় ২০০ টাকা দিতে হয়েছে।

মানিকগঞ্জের মম আক্তার গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার ল্যাবেন্ডার গার্মেন্টসের সেবিকা। তিনি চারবার গাড়ি বদলিয়ে চন্দ্রা মোড় পর্যন্ত এসেছেন। সেখান থেকে হেঁটে কালিয়াকৈর পৌঁছান। তার পরও কোনো গাড়িতে ওঠার সাহস পাচ্ছেন না। ৫০০ টাকা নিয়ে রওনা দিয়ে এরই মধ্যে ৪০০ টাকা শেষ হয়ে গেছে। এসব জানিয়ে তিনি বলেন, এভাবে হঠাৎ করে কারখানা খোলার ঘোষণা দিয়ে আমাদের মৃত্যুর মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এতদিন সুস্থ থাকলেও চাকরি বাঁচাতে পিকআপে যেভাবে ঠাসাঠাসি করে এসেছি, খুবই ভয় লাগছে। কী হবে জানি না।

ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে রাতের বেলায় ট্রাক, পিকআপ ও অ্যাম্বুলেন্স যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে। এসব পরিবহন আবার ভাড়াও বেশি নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। কর্মস্থলে ফেরার তাগিদে তারাও অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গাজীপুর, ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় যাচ্ছেন।

ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে চলমান কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই তৈরি পোশাকসহ সব রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা আগামী রবিবার খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কোনাবাড়ী হাইওয়ে পুলিশের ওসি মীর গোলাম ফারুক জানান, কারখানা খোলার খবরে হাজার হাজার মানুষ গ্রাম থেকে নানাভাবে ফিরে আসছে। তবে তারা চেকপোস্টের আগেই নেমে হাঁটতে শুরু করে।

advertisement