advertisement
DARAZ
advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

আহা! কী সেতুপ্রেম

। ১২টির মধ্যে ৬ সেতু নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ । মাঝপথে কাজ, বিল তুলে নিলেন ঠিকাদাররা । জনবসতি নেই, রাস্তা নেই, অপ্রয়োজনে ৩ সেতু

সানাউল হক সানী
৪ আগস্ট ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৪ আগস্ট ২০২১ ১০:১২ এএম
advertisement


সাবেক নাসিরাবাদ ইউনিয়নের দেব দোলাই খালের ওপর প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হচ্ছে একটি বৃহৎ সেতু। এর মধ্যে সেতুর জন্য সাড়ে পাঁচ কোটি আর সংযোগ সড়কের জন্য সাড়ে তিন কোটি। সিটি করপোরেশনের খাতায় এটিকে আবেদ মাস্টারের বাড়িসংলগ্ন সেতু বলা হয়েছে। তবে সেতুর দুই পাশে বসতি মাত্র কয়েক ঘর। মানুষের যাতায়াতও তেমন হয় না। সেতু নির্মাণ মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকলেও এখনো দুই পাশে নেই সড়কের অস্তিত্ব। অথচ নির্মাণ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনসাধারণ ও করপোরেশনের অনেক প্রকৌশলীর মনে প্রশ্নÑ এমন বৃহৎ সেতু নির্মাণ কার স্বার্থে? যেখানে এখন পর্যন্ত দুই পাশে রাস্তাই নির্মাণ করা হয়নি।
কেবল আবেদ মাস্টারের বাড়িসংলগ্ন সেতুই নয়, নির্মাণ হচ্ছে এমন আরও ছয়টি সেতু। এর মধ্যে একটি সেতুকে অপ্রয়োজনীয় বলছেন খোদ করপোরেশনের প্রকৌশলীরাই। নির্মাণাধীন এমন পাঁচটি সেতুর কাজের বিল ইতোমধ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমাদের সময়কে
বলেন, কোনো একটা সেতু থাকলেই হয় না। সেই সেতুর সঙ্গে সংযোগ সড়ক থাকলেই আশপাশের এলাকার উন্নয়ন হয়। প্রতিটি প্রকল্পের একটি লাইফ টাইম থাকে। এখন যদি আরও ১০ বছরে সংযোগ সড়ক হয়, উন্নয়ন হবে না। তখন তো সেতুর পেছনে বিনিয়োগ নষ্ট হবে। মূলত এমন প্রকল্পের মাধ্যমে টাকা এলোমেলো করাটাই প্রধান উদ্দেশ্যে।
করপোরেশনে নতুন যুক্ত হওয়া নাসিরাবাদ, দক্ষিণগাঁও, ডেমরা ও মান্ডাÑ সাবেক এই চারটি ইউনিয়নের অবকাঠামো উন্নয়নে ২০১৮ সালে ৫১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এ প্রকল্পের আওতায় সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রথমে ১৭টি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করা হলেও ‘যাচাই-বাছাই’ শেষে ১২টির অনুমোদন দেওয়া হয়।
দক্ষিণ সিটির প্রকৌশল বিভাগের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের শুরুতেই অসঙ্গতি ছিল। বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে সেতুর কাজ হাতে নেওয়া হয়নি। পরে নতুন মেয়র হিসেবে শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব নেওয়ার পরই ১২টি সেতুর মধ্যে ছয়টির নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দেন। এর মধ্যে ছিল দেব দোলাই খালের লায়নহাটি সড়ক থেকে নাসিরাবাদ দক্ষিণপাড়া মসজিদ ইন্টারসেকশনে ব্রিজ, ত্রিমোহনী প্রধান সড়ক থেকে জোরভিটা জিরানি খালের ওপর, বাউলের বাজার ব্রিজ, শুন্যার টেংরা পুঁটিচারা খালের ওপর ব্রিজ, মা-া প্রধান সড়কে মা-া খালের ওপর ব্রিজ।
প্রকল্পের আওতায় মা-া খালের ওপর একটি সেতু নির্মিত হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের খাতায় যার নাম মা-া কুসুমবাগ সেতু। সেতুটি নির্মাণের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সেতু নির্মাণে ৪ কোটি এবং অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণে ১ কোটি টাকা। সেতুটির নির্মাণকাজ শেষপর্যায়ে থাকলেও অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। সরেজমিন সেতু এলাকা ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খিলগাঁওয়ের মা-ার ‘শেষ মাথা’ নামে পরিচিত এলাকায় হচ্ছে একটি সেতু। দক্ষিণ সিটির খাতায় যার নাম শাপলা সেতু। তবে সেতু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে আশপাশে এখনো মানুষের বসতি গড়ে ওঠেনি। নেই চলাচলের সড়কও। প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। ঠিকাদার বিল তুলে নিলেও এখনো কাজ শেষ হয়নি। খালের ওপর নির্মিত এই সেতুটির দৈর্ঘ্য ৩০ মিটার, প্রস্থে ৯.৮ মিটার। সেতুতে ওঠানামা করতে ৪৫ মিটার করে ৯০ মিটার সংযোগ সড়কও রয়েছে। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও এলাকা বিবেচনায় সেতু নির্মাণে এত টাকা ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেতুটি দক্ষিণ সিটিতে নতুন যুক্ত হওয়া ৭২ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়েছে। ঠিক যেখানে সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, তার পাশেই শাপলা সিটি আবাসন প্রকল্প। সেতু নির্মাণের কাজ শুরুর পর জমির দামও বাড়িয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যে খালের ওপর সেতুটি হচ্ছে, তা পার হলেই ওই আবাসন প্রকল্পের জমি।
এ ছাড়া নাসিরাবাদ এলাকার দাসের কান্দি সেতু নির্মাণ শেষ পর্যায়ে। তবে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায় সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণ শেষ। অ্যাপ্রোচ রোডও নির্মাণ শেষ। সেতুর দুই পাশে পাড় বাঁধানোর কাজ চলছে। এর বাইরে রয়েছে বাগপাড়া সেতু। খিলগাঁও-বাসাবো খালের ওপর নির্মিত সেতুটি ২৪ মিটার দৈর্ঘ্যরে। সেতু এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নির্মাণ শেষ হয়েছে। তবে অ্যাপ্রোচ সড়ক নেই। একপাশে সরু একটি রাস্তা রয়েছে। যেটি দিয়ে কেবল একসঙ্গে একটি রিকশা চলাচল করতে পারে। বিপরীত পাশে খোলা জায়গা থাকলেও কোনো রাস্তা নেই। ফলে সেতু নির্মাণ শেষ হলেও অনেকটা অব্যবহৃত অবস্থায়ই পড়ে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রাই। তারা বলছেন, দুই পাশে রাস্তা নেই। এর পরও বড় সেতু নির্মাণে অর্থ অপচয় ছাড়া কিছু নয়। তারা বলছেন, উভয় পাশে সড়ক নির্মাণ করে দিলে সেতুটি ব্যবহার করা যাবে।
এর বাইরে ঠুলঠুলিয়া খালের ওপর নির্মীয়মাণ ব্রিজটি গুরুত্বপূর্ণ বলছেন স্থানীয়রা। সেতু নির্মাণের জন্য ৫ কোটি এবং অ্যাপ্রোচ রোডের জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তবে কাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেতুটির বিল দেওয়া হয়নি। এটি নির্মাণ করছে অর্পি ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মালিক দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহমেদ রতন।
ঠুলঠুলিয়া ব্রিজ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। দেখভালের দায়িত্বে থাকা একজন জানান, শ্রমিকরা ঈদের ছুটিতে যাওয়ায় কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে সেতুর মূল অবকাঠামোই নির্মিত হয়নি। দুই পাশে বড় বড় গর্ত আর নির্মাণসামগ্রী থাকায় চলাচলেও অসুবিধা হচ্ছে। স্থানীয় জনসাধারণের দাবি, দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষের।
কাজ শেষের আগেই বিল তুলে নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ আমাদের সময়কে বলেন, পুরোপুরি কাজ শেষ না হলে বিল দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি সম্ভব নয়। এর বাইরে প্রকল্পটি অনেক আগে নেওয়া। বর্তমান মেয়র দায়িত্বে আসার পরে যেগুলো বাতিল করা সম্ভব, সেগুলো বাতিল করেছেন। বাকিগুলোর কাজ শুরু হয়ে যাওয়ায় বাতিল করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী তানভীর আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগের বিষয়বস্তু লিখিত আকারে করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে পাঠাতে বলেন। এর বাইরে কথা বলবেন না বলে জানান তিনি।

advertisement