advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

তালেবানরা ধারণার চেয়ে কম সংঘবদ্ধ

জেসিকা তানিজা
২৫ আগস্ট ২০২১ ১০:২৪ এএম | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২১ ১০:২৭ এএম
ছবি : ইউরো অবজারভার
advertisement

তালেবানদের দ্রুত আফগানিস্তান দখল বিশ্বের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে রীতিমতো বিস্মিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মিত্রদের বিরুদ্ধে ২০ বছরের যুদ্ধের সমাপ্তি হলো। তালেবানদের ৮০ হাজার যোদ্ধা মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে আফগান সরকারের ৩ লাখ ৬৯৯ জন সৈন্যকে হটিয়ে দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, তালেবানরা আফগানিস্তান দখল করে ফেলবে তার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দেশটি এখন এই কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী দলটির হাতেই; যারা এই গোটা অঞ্চলকেই অস্থিতিশীল করে তুলতে পারবে।

যদিও দেশটিতে গণতন্ত্র ও সক্রিয় আইনসভা গঠিত না হওয়ার ব্যর্থতার বেশিরভাগ দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রের ওপরেই বর্তায়। তালেবানের এই বিজয় শুধুমাত্র বিদ্রোহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও তাদের মতাদর্শই দলটিকে এতটা কার্যকর হতে সহায়তা করেছে।

আফগান উপজাতি ব্যবস্থার বিরোধীতা করা ছাড়াও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও বিদেশি বাহিনীগুলোর প্রত্যাখান থেকেও বছরের পর বছর ধরে তালেবানরা উপকৃত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটি শক্তি বজায় রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ কলহ বন্ধ করতে সক্ষম হবে?

তালেবানদের অভ্যন্তরীণ কলহ

যদিও তালেবানের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দক্ষতা বছরের পর বছর সময় নিয়ে বিকশিত হয়েছে,তারপরও বিভিন্ন দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নতুন সরকারকে দীর্ঘমেয়াদের জন্য অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তালেবানদের লক্ষ্য ইসলামিক সাম্রাজ্য পুনর্গঠন করা হলেও তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এর আগে তালেবান ও হিজাব-ই-ইসলামীর মধ্যে অর্থ অথবা পারস্পরিক বিদ্বেষকে ঘিরে অর্ন্তকলহ হতো। উল্লেখ্য, হিজাব-ই-ইসলামী একটি রাজনৈতিক দল যারা ১৯৮০ সালে সোভিয়েত আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।

তালেবানদের বিশিষ্ট নেতা মোল্লা উমরের মৃত্যুর পর পদের জন্য দলের ভেতরে নানা রকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৫ সালে মোল্লা মনসুরের নিয়োগ তালেবানদের অনেক জেষ্ঠ্য নেতাই মেনে নেননি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে নিজের রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণ করার জন্য তিনি দলকে ভুল পথে পরিচালিত করেছেন এবং মোল্লা উমরের মৃত্যু দুই বছর গোপন রেখেছেন।

তড়িঘরি উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া তালেবানদের ঐক্যতাকে চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (আইএসআই) পৃষ্ঠপোষকতায় মোল্লা মনসুর শান্তি আলোচনায় যোগ দেন। যদিও শান্তি আলোচনায় যোগ দেওয়া নিয়ে তালেবানদের অনেক জেষ্ঠ্য সদস্য আপত্তি জানিয়েছিলেন; যা সংগঠনটির মধ্যে আরও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। অবশ্য মনসুরের রাজত্ব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক ড্রোন হামলায় মনসুর নিহত হন।

অস্বাভাবিক নেতৃত্ব

খুব সতর্ক বিশ্লেষণের পর তালেবান সুপ্রিম কাউন্সিল হায়বাতুল্লাহ আখুনজাদাকে নিয়োগ দেয়। তিনি একজন ধর্মীয় পন্ডিত এবং তালেবানদের শাসনকালে (১৯৯৬-২০০১) শরিয়া আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক জ্ঞান এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আখুনজাদা নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী ছিলেন না। তিনি একজন বদ্ধপরিকর ধর্মীয় নেতা, যিনি কঠোরভাবে শরিয়া আইন কার্যকর এবং পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে অত্মঘাতী বোমা হামলার পক্ষে ফতোয়া জারি করা নিয়ে পরিচিত।

আখুনজাদাকে তার ডেপুটিদের নিয়ে পুনঃর্গঠন নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সংগঠনের রাজনৈতিক শক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে আখুনজাদা শের মোহাম্মাদ আব্বাস স্টানিকজাইয়ের সঙ্গে যোগ দেন। তালেবান সরকারের এই সাবেক উপমন্ত্রী স্টানিকজাই ২০১৫ সালে দোহায় দলের রাজনৈতিক কার্যালয়ের প্রধান ছিলেন।

আব্দুল গনি বারাদর যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটির নতুন প্রেসিডন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে বড় ধরনের আপোষ করতে হবে। পাকিস্তানের কারাগারে প্রায় ১০ বছর বন্দী থাকার পর বারাদর দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোয় মধ্যস্ততা করার জন্য পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও আইএসএর গুটিতে পরিণত হন।

পাকিস্তানের সমর্থন

সত্তরের দশক থেকেই তালেবানদের প্রতি পাকিস্তানের নীরব সমর্থন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দশকের পর দশক ধরে দেশটি আশ্রয়প্রার্থী তালেবান নেতা ও তাদের পরিবারের নিরাপদ স্বর্গ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।

দলটি শুধু পাকিস্তান থেকে বেড়ে উঠার ভিত্তিই পায়নি, বরং নেটওয়ার্ক পরিচালনার স্বাধীনতাও পেয়েছে। এটি তালেবানদের স্বায়ত্ত্বশাসন ও উচ্চপদে অধিষ্ঠিত বাহিনীর শিষ্ঠাচারকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। আর বিষয়টি অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, এই সংগঠনটি খুব শিগগিরই নিজেদেরকে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলবে এবং নিজেদের নিয়মের মধ্যে তারা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। উপরন্তু দলটির কট্টরনীতি মেনে না চলা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো অন্যান্য উগ্রবাদী দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলায় দলটি ভেঙ্গে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তালেবানরা কতটা মারাত্বকভাবে ভেঙ্গে পড়বে এবং তাদের সঙ্গে গোটা দেশই তলিয়ে যাবে কি না।

লেখক : মধ্যপ্রাচ্য ও আফগান বিষয়ক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

সূত্র: ইউরো অবজারভার

advertisement