advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

স্বাস্থ্যের আজাদ ফাঁসছেন সাহেদ কেলেঙ্কারিতে

দুলাল হোসেন
২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১০:৫৭ এএম
advertisement

করোনা মহামারীর সময় যারা স্বাস্থ্য খাতে ধস নামিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান-তদন্ত শেষ করে এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তে স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম তদারককারী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) ও পরিচালকসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের নাম বেরিয়ে এসেছে; যাদের ধাপে ধাপে আসামি করে মামলা ও চার্জশিট দাখিল করবে দুদক। প্রথম ধাপে প্রতারক রিজেন্ট সাহেদের সহযোগী হিসেবে তৎকালীন
ডিজি ডা. আবুল কালাম আজাদসহ প্রতিষ্ঠানটির আরও ৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জশিট যাচ্ছে আদালতে।

তথ্য মতে, লাইসেন্সহীন রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনা ভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ ও চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের মামলায় হাসপাতালটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের সঙ্গে স্বাস্থ্যের ডিজি আবুল কালাম আজাদ আসামি হচ্ছেন। দুদকের উপপরিচালক আরিফ সাদেক আমাদের সময়কে বলেন, শিগগিরই ৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হবে। চার্জশিটে অন্য আসামিরা হচ্ছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (হাসপাতাল) আমিনুল হাসান, উপ-পরিচালক (হাসপাতাল-১) ইউনুস আলী, সহকারী পরিচালক (হাসপাতাল-১) শফিউর রহমান এবং গবেষণা কর্মকর্তা দিদারুল ইসলাম।

দেশের স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন না হলেও করোনাকালে তার ভয়াবহ রূপ উন্মোচিত হয়। ২০১৯ সালে বার্ষিক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবাসহ ১১টি খাত চিহ্নিত করেছিল দুদক। অন্যদিকে ২০২০ সালে টিআইবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা ভাইরাস সংকটের সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে আস্থার সংকটে পড়ে স্বাস্থ্য খাত। গণমাধ্যমে বড় বড় অনিয়ম-দুর্নীতি তথ্যপ্রমাণসহ প্রতিবেদন প্রকাশের পরও কেন তেমন কোনো ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, যেখানে সরকারি কর্মকর্তারা জড়িত, সেখানে দুর্নীতি বা অনিয়মের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এ রকম ক্ষেত্রে খুব কমই আমরা কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাই। বড়জোর বদলি হয়, যা আসলে কোনো পদক্ষেপ না। দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকেও খুব যে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা নয়। কখনো কখনো চুনোপুঁটি ছোটখাটো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাদের রাজনৈতিক যোগসাজশ নেই। কিন্তু রুই-কাতলাদের ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হতে দেখা যায় না। এ কারণে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েই চলেছে। আর এই মহামারীকে দুর্নীতির একটি মহোৎসবে পরিণত করা হয়।

করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে যারা ধস নামায় তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজির নামও মধ্যে ছিল। দুদকের তদন্তে সেই প্রমাণ মিলল। তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু না হলেও রিজেন্ট, জেকেজি, ঠিকাদারি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক।
২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একের পর এক কেলেঙ্কারির খবর বের হতে থাকে। এ ঘটনার সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের অনেক প্রভাবশালীর নাম উঠে আসে। মাস্ক কেলেঙ্কারি, করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিয়ে জেকেজি হেলথ কেয়ার ও রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতারণা ও জালিয়াতির খবর বের হয়। গত বছরের ২১ মার্চ রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চুক্তি হয়। ওই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ কয়েকজন সচিব উপস্থিত ছিলেন।

তিন মাস না যেতেই করোনার পরীক্ষা না করে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া, সরকারের কাছে বিল দেওয়ার পর রোগীর কাছ থেকেও অর্থ নেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে রিজেন্টের বিরুদ্ধে। ওই সময় জানা যায় ২০১৭ সালেই হাসপাতালটির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এর পর গত বছর ৭ ও ৮ জুলাই অভিযান চালিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর ও উত্তরা শাখা বন্ধ করে দেয় র‌্যাব। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে হাসপাতালের অনুমোদন বাতিল করে স্বাস্থ্য বিভাগ। অভিযোগ ওঠে স্বাস্থ্যের তৎকালীন ডিজি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না নিয়ে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে রিজেন্ট হাসপাতালকে অনুমোদন দেন।

রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে ডিজি আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর পরই তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। পরে তার ওই বক্তব্যের ব্যাখ্যা চায় মন্ত্রণালয়। তিনি লিখিত ব্যাখ্যাও দেন। তাতে তিনি দাবি করেন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সাবেক সচিব আসাদুল ইসলামের নির্দেশে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল। এর পর করোনা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে ব্যর্থতার পাশাপাশি রিজেন্ট-জেকেজি হেলথ কেয়ারকে করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ দেওয়াসহ কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। রিজেন্ট হাসপাতাল দুর্নীতির মামলার তদন্তকালে গত বছরের ১২ ও ১৩ আগস্ট ডা. আজাদকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

দুদকের তথ্য মতে, প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে গত বছরের জুলাই মাসে রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর ও উত্তরা শাখা সিলগালা করে দেওয়া হয়। এর পরই রিজেন্ট হাসপাতালের দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানে করোনার নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসায় খরচ বাবদ মোট তিন কোটি ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর পাঁচজনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন দুদকের উপ-পরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী। তবে রিজেন্ট কেলেঙ্কারির ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলেও তাকে মামলার আসামি করা হয়নি। মামলা দায়েরের বাদী উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারীকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয় দুদক। তদন্ত কর্মকর্তা দীর্ঘ এক বছর পর চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন চেয়ে কমিশনে একটি প্রতিবেদন জমা দেন। সে প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গতকাল সোমবার চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেয় কমিশন। মামলার তদন্তকালে এ দুর্নীতির সঙ্গে সাবেক ডিজি ডা. আবুল কালাম আজাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় তাকেও চার্জশিটভুক্ত করা হয়।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাহেদ স্বাস্থ্যের তৎকালীন ডিজির সঙ্গে যোগসাজশ করে লাইসেন্স নবায়নবিহীন বন্ধ রিজেন্ট হাসপাতালকে ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে রূপান্তর করেন। এ ছাড়া মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং চুক্তি সম্পাদন ও সরকারি প্রতিষ্ঠান নিপসমের ল্যাবে তিন হাজার ৯৩৯ জন কোভিড রোগীর নমুনা বিনামূল্যে পরীক্ষা করার অনুমোদন দেন। কিন্তু অবৈধভাবে জনপ্রতি সাড়ে তিন হাজার টাকা করে এক কোটি ৩৭ লাখ ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা গ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া রিজেন্ট হাসপাতালের মিরপুর ও উত্তরা শাখার চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয় ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর খাবার খরচ বরাদ্দের বিষয়ে এক কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার টাকার মাসিক চাহিদা তুলে ধরে তার খসড়া মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন।
২০২০ সালের ২১ মার্চ চুক্তির পর থেকে রিজেন্ট হাসপাতাল ১০ হাজারের বেশি টেস্ট করেছে। এর মধ্যে ৬ হাজারের বেশি ছিল ভুয়া রিপোর্ট। এই ভুয়া রিপোর্টের মাধ্যমে সাহেদ ২ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন। নিপসমে অভিযোগ পাওয়ার পর শুরু হয় র‌্যাবের অভিযান। সাহেদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা ছাড়াও সিলেট ও চট্টগ্রামের দুজন ব্যবসায়ী মামলা করেন। গত বছর ১৫ জুলাই সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা ছাড়াও ১৮টি প্রতারণা মামলা রয়েছে।

করোনা সংক্রমণের সময় শুধু রিজেন্ট হাসপাতাল কেলেঙ্কারিই ঘটেনি; মাস্ক, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী কেনাকাটা, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানকে করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া, ভুয়া করোনা রিপোর্ট প্রদান, হোটেল ভাড়া, খাবার বিলসহ নানা ধাপে দুর্নীতিও ঘটে। এসব দুর্নীতির অনেকগুলো চলে আসে দুদকের হাতে। দুর্নীতির অভিযোগগুলো তদন্তে নামে দুদকের একাধিক টিম। তদন্তকালে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের দেড় শতাধিক ব্যক্তির জড়িত থাকার তথ্য রয়েছে দুদকের কাছে। যাদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান-তদন্ত চলছে।

advertisement
advertisement