advertisement
DARAZ
advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা
সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা কাগজ-কলমেই

আমিনুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ
২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০২:৫৬ এএম
advertisement

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার যমুনার চর কাওয়াকোলা ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বে নিয়োজিত স্বাস্থ্যসহকারী শাহিন হোসেন; কিন্তু তিনি থাকেন সিরাজগঞ্জ শহরে। শহরে কেন? জানতে চাইলে সরল স্বীকারোক্তি- সবার মতো তিনিও এই অনিয়ম করেন। শাহিন হোসেনের এই স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়েই উঠে এলো সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বেহাল চিত্র।

সম্প্রতি শাহিন আরও জানান, দুর্গম এই চরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত তিনিসহ মাত্র পাঁচজন। এর মধ্যে সিএইচসিপি তিনজন, স্বাস্থ্যসহকারী একজন এবং পরিদর্শক একজন। তাদের প্রত্যেকের সপ্তাহের শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কর্মস্থলে থাকার কথা; কিন্তু বেশিরভাগ সময় তারা অনুপস্থিত থাকেন। এজন্য তারা দুর্গত যাতায়াতব্যবস্থাকে অজুহাতে হিসেবে খাড়া করেন। শুধু কাওয়াকোলার ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিক নয়, সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের প্রায় সব কমিউনিটি

ক্লিনিকেরই এমন চিত্র বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা নেই যমুনার চরবাসীর। সরকারিভাবে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সুচিকিৎসার যে ব্যবস্থা থাকার কথা, তার ছিটেফোটা পর্যন্ত নেই চরাঞ্চলে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, সব ধরনের চিকিৎসাসেবা শহরের মানুষের মতো নদীতীরবর্তী ও দুর্গম চরাঞ্চলেও আছে। তবে সরেজমিন কয়েকটি চর এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে তার সত্যতা মেলেনি। সিরাজগঞ্জের ৯ উপজেলার মধ্যে সদর, কাজিপুর, চৌহালী, শাহজাদপুর, বেলকুচির অনেক স্থানেই নেই সঠিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা।

সদর উপজেলার দুর্গম মেছড়া ইউনিয়ন। এখানকার ১৮ হাজার ৫২৫ জনের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের মাত্র ৯ ব্যক্তি কাগজ-কলমে নিয়োজিত। চাকরিবিধি অনুযায়ী তাদের প্রতি শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সেবাদানের কথা। বাস্তবে তাদের দেখা চরবাসী খুব কমই পান। অধিকাংশ শহরে অবস্থান করাতে সপ্তাহে দুই-একবার কর্মস্থলে যান। তাতে চরবাসীর তেমন উপকার হয় না। কেউ কেউ একদিন গিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বাকি সপ্তাহ বাড়িতেই কাটান। এমন অনিয়মে সরকারি ২৭ প্রকার ওষুধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চরবাসী। স্বাস্থ্যকর্মীদের কেউ কেউ রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে নিয়োগ পাওয়া। ফলে তাদের কেউ কিছু বলতে সাহস পান না। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন চরবাসীর কেউ না কেউ কমিউনিটি ক্লিনিকে যান; কিন্তু বেশিরভাগ সময় ক্লিনিক দেখেন তালাবদ্ধ। ফলে বাধ্য হয়ে সাধারণ জ্বর-ঠা-ার মতো অসুখে এক চারবাসীকে প্রয়োজনীয় নাপা-প্যারাসিটামল জাতীয় একটি ট্যাবলয়েট কিনতে ১২০ টাকা খরচ করে শহরে আসতে হয়। শুধু তা-ই নয়, চরের মানুষের জন্য কোনো প্রকার নৌঅ্যাম্বুলেন্স না থাকায় রাতে কোনো রোগীকে দ্রুত শহরে আনা সম্ভব হয় না। আবার শহরে থাকা অ্যাম্বুলেন্সগুলোও সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না চরবাসীর জন্য। বছরের পর বছর এগুলো পড়ে থাকে অফিসের গ্যারেজে।

সিরাজগঞ্জ সদর থেকে সড়ক ও নৌপথ মিলে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার নদীপথ পারি দিয়ে যেতে হয় মেছড়া উইনয়নে। এজন্য সময় লাগে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। আবার শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে গেলে আরও বেশি ব্যয় হয়। এই অজুহাতে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর অধিকাংশ কর্মকর্তা-মাঠকর্মী থাকেন শহরে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য বিভাগের তেমন কোনো পদক্ষে নেই।

মেছড়া ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিকের সহকারী স্বাস্থ্যকর্মী মো. জেল হোসেন সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে বলেন, ‘আমরা কী করব। ওপরের নির্দেশনা থাকলেও কেউ তা মানে না। আর চরের পথ দুর্গম হওয়ায় সবাই এমনটি করে থাকে। সরকারি ২৭ প্রকার ওষুধ বিতরণ বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারিভাবে ওষুধ দেওয়া হয় সত্য। তবে ক্লিনিক বন্ধ থাকার করণে মাঝেমধ্যে এমনটি হয়, সব সময় না। তিনি এজন্য সিএইচসিপির দায়িত্বে থাকা শেখ সাদীর অবহেলাকে দায়ী করে বলেন, তার প্রতিদিন ক্লিনিক খোলার কথা; কিন্তু না খোলার কারণে সবাই এভাবেই অফিস করছে।’

মেছড়া ইউনিয়নের গোটিয়ারচর গ্রামের আলতাফ হোসেন জানান, সরকারি টাকায় বেতন নিয়ে চরের মানুষের সঙ্গে এরা প্রতারণা করছে। নদীপথে এসে এদের চাকরি করতে ইচ্ছা না করলেও বেতন-ভাতা ঠিকই নিচ্ছে। এর অবসান হওয়া দরকার।

কাওয়াকোলা ইউনিয়নের সুকিতন বেওয়া জানান, আমাদের চরের মানুষের জন্য সরকার যে ওষুধ দেয়, তার কোনোটাই আমরা পাই না। শুধু মাঝেমধ্যে টিকাদানের কাজ হয়। তা-ও অনেকে পায়, অনেকে পায় না।

মেছড়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ মাস্টারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও ফোন না ধরায় কথা বলা সম্ভব হয়নি। কাওয়াকোলা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম জানান, চরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। অবহেলা আছে স্বীকার করে এই জনপ্রতিনিধি বলেন, যাতায়াত ব্যবস্থার করণে অনেক সময় কমিউনিটি ক্লিনিক একদিন বন্ধ রাখেন, একদিন খোলেন। তবে এতে চরবাসী অভ্যস্ত। তিনি আগামীতে এর অবসান হবে বলে আশা করেন।

সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম হীরা জানান, চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে তিনি নিয়মিত মনিটরিং করেন। তাই এমনটি হবার কথা নয়। তারপরও যদি এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে দোসিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

যমুনার ভাঙনে বার বার মানচিত্র থেকে হারাতে বসা চৌহালী উপজেলার স্বাস্থ্যসেবার চিত্র আরও করুণ। এ উপজেলায় মোট ১৭টি কমিউনিটি ক্লনিকের মাধ্যমে চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আছে শুধু কাগজ-কলমে। অভিযোগ আছে- এই উপজেলার অনেক স্বাস্থ্যকর্মীই কর্ম এলাকায় পা রাখেন না। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আব্দুল কাদেরও অধিকাংশ সময় থাকেন শহরে। আর কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর অধিকাংশের অবকাঠামোই নেই। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান বেশ কষ্টকর।

চরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চৌহালী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আব্দুল কাদের বলেন, ‘অভিযোগ সত্য নয়, এই উপজেলার ১৭টি ক্লিনিকের মধ্যে ২টি যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে, একটি ব্যবহার অনুপযোগী। বাকিগুলো অন্যের বাড়িতে অস্থায়ীভাবে ঘর নিয়ে চলছে। আর দুর্গম এলাকা হওয়া কারণে সেবা প্রদানে সময় হের-ফের হতে পারে। তবে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত সেবা প্রদান করছেন বলেই চরের মানুষ সুস্থ আছে বলে দাবি করেন তিনি।

শাহজাদপুরের দুর্গম চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। অভিযোগ থেকে বাদ নেই উত্তরের উপজেলা কাজিপুরের বিভিন্ন উইনয়ন কমিউনিটি ক্লিনিকও। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকর্মী এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা প্রায় সময় অনুপস্থিত থাকেন কর্মস্থলে। তাদের কারণে চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

কাজিপুর উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়ন যমুনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল হওয়ায় এখানেও একই অবস্থা। নাটুয়ারপাড়া, চরগিরিশ, তেকানীর মতো চরের মানুষ আজও চিকিৎসাসেবা থেকে পিছিয়ে। এ অঞ্চলের মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য পার্শ্ববর্তী জামালপুর, সরিষাবাড়ী, টাঙ্গাইল জেলায় যেতে হয়।

চরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি পরিবার-পরিকল্পনা বিভাগে নিয়োজিত মাঠকর্মীদের বিরুদ্ধেও রয়েছে অভিযোগ। এ যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠকর্মীরাও ফাঁকি দিচ্ছেন দায়িত্বে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতি, মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরামর্শসহ একাধিক কাজ এই বিভাগের মাঠকর্মীদের করার কথা থাকলেও তাদের তেমন সাড়া নেই চরাঞ্চলে।

এ বিষয়ে জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) আব্দুল্লাহেল বাকী আমাদের সময়কে বলেন, আমি অল্প কিছুদিন ধরে সিরাজগঞ্জে এসেছি। এ ধরনের অভিযোগ আমিও পেয়েছি। সরকারি বিধি মতে মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গ্রাম পর্যায়ে মাঠকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু চরাঞ্চলে যাতায়াতব্যবস্থা কষ্টকর হলেও সেবা প্রদানে তাদের আপত্তি থাকার কথা নয়; কিন্তু এমনটি হচ্ছে জানতে পেরেছি। দ্রুত তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন এই কর্মককর্তা। তিনি এজন্য উপজেলা পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের গাফিলতি আছে বলেও স্বীকার করেন।

সিরাজগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. রামপদ রায় বলেন, অভিযোগ বিস্তর। চরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নানা কথা কানে আসছে। আমি বিষয়টি খোতিয়ে দেখার ব্যবস্থা করছি। সেই সঙ্গে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাশ দেন তিনি। তিনি গণমাধ্যমের সহযোগিতাও কামনা করেন।

চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে জেলা স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির নেতা কমরেড নবকুমার কর্মকার বলেন, সরকারি অর্থের বিনিময়ে নিয়োগপ্রাপ্তরা যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেন, তা হলে চরের মানুষকে প্যারাসিটামল কিনতে শহরে আসতে হবে না। তিনি এজন্য চরাঞ্চলে নৌঅ্যাম্বুলেন্স চালুর দাবি ও মাঠকর্মীদের যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন। তার মতে, জেলার ৯ উপজেলার ৩২ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য জেলা শহর এবং গ্রাম পর্যায়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, তারা সকলে যদি একযোগে সেবা প্রদান করেন, তা হলে জেলা থেকে যে কোনো রোগ-বালাই সহজেই দূর করাসহ রোগ প্রতিরোধ আরও সহজ হবে।

advertisement