advertisement
DARAZ
advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

প্রতিদিন ঘাটতি এক হাজার এমএমসিএফডি
বিদ্যুৎ শিল্প খাতে গ্যাস সংকট চরমে

লুৎফর রহমান কাকন
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:৪৭ এএম
প্রতীকী ছবি
advertisement

দেশে গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত। সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে এর সমাধান হচ্ছে না। করোনা মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে দেশ যখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে, শিল্প কারখানাগুলোয় উৎপাদন বেড়েছে- এ সময় দরকার পর্যাপ্ত গ্যাসের সরবরাহ। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বন্ধ রাখতে হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রও। বর্তমানে বড় ধরনের রিজার্ভের কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পায়নে গ্যাসের চাহিদাও বেড়ে চলেছে। ফলে দিন দিন ক্রমেই গ্যাস সংকট গভীর হচ্ছে। সরকার দেশের নিজস্ব উৎপাদিত গ্যাসের সঙ্গে বিদেশ থেকে লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে আপাতত সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

গ্যাস সংকট সমাধানে সরকার কী করছে- এমন প্রশ্নে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ আমাদের সময়কে বলেন, দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে আসছে। ফলে দেশের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। কয়েকটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগ
সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক হিসাবে দেশে ১০ দশমিক শূন্য ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে। একই সময় পর্যন্ত দেশি গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ১৮ দশমিক ২৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করে ব্যবহার করা হয়েছে। এদিকে ২০১৫ সালের ৬ মে দেশে একদিনে সর্বোচ্চ গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে ২ হাজার ৭৫৮ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। তবে গড়ে দেশে গ্যাস উৎপাদন হয় ২৩শ মিলিয়ন থেকে ২৪শ মিলিয়ন ঘনফুট।

জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ২৮টি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি গ্যাসক্ষেত্রের ১০৪টি গ্যাসকূপ থেকে প্রতিদিন ২ হাজার ৩৮৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন হয়। এ ছাড়া গড়ে আরও ৭শ মিলিয়ট ঘনফুট লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) বিদেশ থেকে আমদানি করে দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হচ্ছে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন সরবরাহ হচ্ছে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ঘাটতি থেকে যাচ্ছে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এ বিশাল ঘাটতি শিল্পে উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা যায়, গ্যাস সংকট দূর করতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি (তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি শুরু করে সরকার। দুটি এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে দেশে। কিন্তু এ পর্যন্ত ৭৫০ এমএমসিএফডি থেকে ৮০০ এমএমসিএফডির বেশি গ্যাস সরবরাহ করা যায়নি। সরকার কাতার এবং ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি আমদানি করছে। এ ছাড়া স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনেও সরবরাহ করেছে। তবে গত জুন থেকে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় স্পট মার্কেট থেকে তা কেনা বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় হঠাৎ করে গ্যাস সংকট প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, স্পিনিং, উইভিং ও ডাইং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং মিলের অধিকাংশই নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র (ক্যাপটিভ পাওয়ার) উৎপাদনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যেখানে মূল জ্বালানি গ্যাস। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। ফলে যেসব টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে তাদের উৎপাদন প্রায়বন্ধ। তিনি জানান, বিটিএমএর কিছু সদস্যের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে তথা ১ দশমিক ৫০ পিএসআইতে (প্রতিবর্গ ইঞ্চি) নেমে গেছে। ফলে মিলগুলোয় স্থাপিত মেশিনারিজের সক্ষমতার ৭০ শতাংশ অব্যবহৃত থাকছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে পরিস্থিতির উন্নতি করা যেতে পারে। না হয় বর্তমান পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও ব্যাংক ঋণের নিয়মিত কিস্তি পরিশোধসহ ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য খরচ মেটানো কঠিন হবে। শুধু বিটিএমএর সভাপতিরই গ্যাস সংকট নিয়ে অভিযোগ নয়, দেশে অধিকাংশ শিল্পকারখানার মালিকদেরই অভিযোগ এমনই।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরে যেখানেই গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেই অঞ্চলেই বাপেক্স অনুসন্ধান করে যাচ্ছে। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে গ্যাস আমদানি করে সরবরাহের সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক শিল্প মালিক নতুন সংযোগের জন্য অপেক্ষা করছেন। অনেক কারখানা লোড বাড়াতে চায়। ফলে সরকার গ্যাসের সামগ্রিক চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে সংকট সমাধানে তৎপর।

জ্বালানি বিভাগের করা এক রিপোর্টে দেখাা যায়, বর্তমানে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমে ২৩শ এমএমসিএফডি থেকে ২৪শ এমএমসিএফডিতে নেমে এসেছে। ক্রমান্বয়ে উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে ২০২২-২৩ সালে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে প্রতিদিন উৎপাদন ১৮ দশমিক ৪ কোটি ঘনফুট কমতে পারে। ২৩-২৪ সালে এটা কমতে পারে ৪৩ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুট। এ অবস্থায় বিকল্প হিসেবে সরকার এলএনজির আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস এলএনজি আমদানি করে গ্যাসের চাহিদা মেটানো হবে।
উল্লেখ্য, দেশে সরবরাহকৃত গ্যাসের ৪২ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে। বাকিটা শিল্প, আবাসিক, সার ও অন্যান্য খাতে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা যায়, বিদ্যুৎ সংকটে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, গ্যাস সংকট সমাধানের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় জুনের পর স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ অবস্থায় দিনে ২০-২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। যার প্রভাব পড়ে শিল্প খাতে। দেশের রপ্তানি ও শিল্প খাতের কথা ভেবে দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনে আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি অক্টোবরের শেষের দিক থেকে এলএনজি সরবরাহ বাড়বে। তখন গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করতে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের ৫৯০টি সিএনজি স্টেশনে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০ পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী আলী মো. আল মামুন আমাদের সময়কে বলেন, সিএনজি স্টেশনগুলোয় রেশনিংয়ের ফলে ওই সময়ে প্রায় ৮০ এমএমসিএফডি গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় সরবরাহ করা যাবে। তিনি বলেন, দুটি দেশের সঙ্গে এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি রয়েছে। আরেকটি তৃতীয় চুক্তির বিষয়ে সরকার কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে শিল্প উৎপাদন বাড়ছে। এ জন্য যে পরিমাণ গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চয়তা থাকা দরকার। বিদ্যমান দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে হলে জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ম তামিম গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারের উচিত হবে খুব দ্রুত গ্যাস সংকট সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া। পরিকল্পিতভাবে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ না নিলে দিন পরিস্থিতি খারাপ হবে, যা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। সামনে এলএনজির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। তাই এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করা যেতে পারে। কারণ শিল্প চাহিদার কথা মাথায় রাখলে দাম যতই বাড়ুক এলএনজি কিনতেই হবে। তাই স্পট মার্কেট আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মধ্যে সমন্বয় করে কেনাকাটা করতে হবে। তবে দেশি উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধানে বেশি জোর দেওয়া উচিত।

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতিমাসেই দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। খনিগুলো থেকে প্রতিমাসে দুই থেকে ৮ শতাংশ হারে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এদিকে গত দশ বছরে দেশে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি। দ্বিতীয় ও তৃতীয়মাত্রার জরিপের ফলে সাড়া জাগানো কোনো খবর আসেনি। সামনের দিনগুলোয় গ্যাস ক্রমান্বয়ে একটি ব্যয়বহুল জ্বালানিতে পরিণত হবে। দেশে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে আগামী কয়েক বছর দেশে যে গ্যাসের ঘাটতি হবে তার পুরোটা আমদানি করেই চালাতে হবে।

advertisement