advertisement
DARAZ
advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য
ডিআইজি মিজান দুই দফায় দুদকের বাছিরকে ৩৫ লাখ টাকা ঘুষ দেন

আদালত প্রতিবেদক
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৭:০১ পিএম | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৮:০২ পিএম
বরখাস্ত হওয়া ডিআইজি মিজানুর রহমান (বাঁয়ে) ও দুদকের বরখাস্ত হওয়া পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। পুরোনো ছবি
advertisement

বরখাস্ত হওয়া ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) মিজানুর রহমান দুই দফায় ৩৫ লাখ টাকা ঘুষ দুদকের বরখাস্ত হওয়া পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে দিয়েছেন মর্মে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। ওই সাক্ষী নাম কনস্টেবল সাদ্দাম হোসেন। তিনি ডিআইজি মিজানের অর্ডারলী ছিলেন। এছাড়া এদিন ডিআইজি মিজানের স্ত্রীর দোকানের কর্মচারী রফিকুল ইসলাম নামেও একজন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

আজ রোববার ঢাকার চার নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ নাজমুল আলম এ সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আগামী ১২ অক্টোবর পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ঠিক করেছেন। সাক্ষীর জবানবন্দিতে কনস্টেবল সাদ্দাম হোসেন নিজ পরিচয় উল্লেখ করে বলেন, ২০১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে ডিআইজি মিজানের উত্তরার বাসা থেকে সে (সাদ্দাম হোসেন) দুইটি ব্যাগে ২৫ লাখ টাকা ও কিছু বই গাড়িতে তুলে দেন।

এরপর সে ও ডিআইজি মিজান ওই গাড়ীতে রমনা পার্কের সামনে আসেন এবং জিআইজি মিজান সাদ্দামকে বলেন, তার সঙ্গে কথা বলার জন্য একজন লোক আসবে। কিছুক্ষণ পরে লোকটি পার্কের আসেন। এরপর ডিআইজি মিজান তার সঙ্গে গিয়ে কথা বলেন। এরপর তারা গাড়িতে ওঠেন। ডিআইজি মিজান চালককে তার সঙ্গে গাড়িতে ওঠা লোকটিকে রাজারবাগ মোড়ে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের গলিতে নামিয়ে দিতে বলেন। যাতায়াতের মধ্যবর্তী সময়ে তারা অনেক কথা বলেন।

সাক্ষী সাদ্দাম বলেন, ‘গাড়ি যাওয়ার সময় মিজান স্যার ওই লোককে বলেন, ব্যাগে ২৫ লাখ আছে। তখন ওই লোক প্রশ্ন করেন যে সব ঠিক আছে ভাই? মিজান স্যার বলেন, সব ঠিক আছে। পরে ওই লোকটাকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের গলিতে নামিয়ে দেয়া হয়। লোকটি যাওয়ার পর সাদ্দাম ডিআইজি মিজানের কাছে জিজ্ঞাসা করেন, সে কে স্যার? তখন ডিআইজি মিজান তাকে বলেন, লোকটি দুদক কর্মকর্তা এনামুল বাছির।’

সাক্ষী সাদ্দাম আরও বলেন, পরবর্তীতে ওই বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি মিজান স্যারের বাসা থেকে তিনি (সাদ্দাম হোসেন) একটি শপিং ব্যাগ ও একটি হ্যান্ড বল গাড়িতে তুলে দেন। ব্যাগে টাকা ছিল। জিজ্ঞাসাবাদে মিজান স্যার জানান, ব্যাগে ১৫ লাখ টাকা আছে। একইভাবে তারা সেদিনও রমনা পার্কের সামনে আসেন। গাড়িতে বসে এনামুল বাছিরের সঙ্গে কথা বলেন ডিআইজি মিজান। তাকে রমনা পার্কের সামনে আসতে বলেন। এনামুল বাছির পাকের সামনে এলে তারা ভেতরে যান। কথা শেষে তারা আবার গাড়িতে ওঠেন। এনামুল বাছিরকে শান্তিনগর মোড়ে নামিয়ে দিতে বলেন ডিআইজি মিজান। সেদিনও গাড়িতে তারা কথা বলেন।

এনামুল বাছির ডিআইজি মিজানকে বলেন, ‘আপনার মামলায় কিছু নেই। আপনার কিছুই হবে না। পরে তাকে শান্তিনগর মোড়ে নামিয়ে দেন ডিআইজি মিজান। যাওয়ার সময় এনামুল বাছির টাকাসহ ব্যাগটি নিয়ে যান।’

সাক্ষী সাদ্দাম বলেন, ‘একই বছর ৩০ মে গুলশান পুলিশ প্লাজায় ডিআইজি মিজান যান। এনামুল বাছির সেখানে আসেন। তারা সেখানে কথা বলেন। এনামুল বাছির ডিআইজি মিজানকে বলেন, “আপনার মামলায় কোনো কাগজপত্র নেই। আপনার কিছু হবে না”।’

অন্যদিকে সাক্ষী রফিকুল ইসলাম নিজের পরিচয় উল্লেখ করে বলেন, ‘২০১৯ সালে গুলশান পুলিশ প্লাজায় আসেন এনামুল বাছির। তখন ডিআইজি মিজান বলেন, টাকা দিলাম, তারপরও আমার নামে কেস হলো।’ এই কথোপকথনের পর তারা বের হয়ে যান।

রোববার সাক্ষ্য নেয়ার সময় কারাগার থেকে মামলার আসামি মিজান ও বাছিরকে আদালতে হাজির করা হয়। এ নিয়ে মামলাটিতে ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৫ জনের সাক্ষ্য শেষ হলো।

মামলাটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৮ মার্চ অভিযোগ গঠন করেন আদালত। একই বছরের ১৪ জানুয়ারি অভিযোগপত্র জমা দেয় দুদক। ওই বছর ১৯ আগস্ট শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।

মামলার চার্জশিটে বলা হয়, দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ডিআইজি মিজানের জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধানকারী করছিলেন। অনুসন্ধানচলাকালে ২০১৯ সালের ৯ জুন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় সাংবাদ প্রকাশিত হয় যে, ডিআইজি মিজান অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টে এনামুল বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ/ উৎকোচ দিয়েছেন। তৎক্ষনিত দুদক একটি তদন্ত কমিটি করে তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পায়। এরপর এ সংক্রান্তে তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটিও ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় মামলাটি রজু করা হয়।

চার্জশিটে আরও বলা হয়, মামলার তদন্তকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং এনটিএমসি হতে প্রাাপ্ত বিশেজ্ঞ বিশ্লেষনে প্রতিয়মান হয়, ২০১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি ও ২৫ ফেব্রুয়ারি ডিআইজি মিজান একটি বাজারের ব্যাগে কিছু বইসহ যথাক্রমে ২৫ লাখ টাকা ও ১৫ লাখ টাকা রমনা পার্কে এনামুল বাছিরকে দুইদফায় প্রদান করেন। যার চাক্ষুস সাক্ষী আসামি মিজানের দেহরক্ষী হৃদয় হাসান ও অর্ডারলি মো. সাদ্দাম হোসেন। এ ছাড়া মিজান ও বাছিরের মুঠোফোনের কথোপকথন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাছির তার ছেলেকে কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে আনা-নেওয়ার জন্য মিজানের কাছে একটি গাড়িও দাবি করেন। যা তিনি দুদকের বিভাগীয় তদন্ত টিমের কাছে স্বীকারও করেছেন।

চার্জশিটে বলা হয়, আসামি মিজান ও বাছির অবৈধভাবে দুটি পৃধক সিম ব্যবহার করে একে অপরের মধ্যে কথোপকথনসহ ক্ষুদেবার্তা আদান-প্রদান করেছেন। সিম দুটি হেদরক্ষী হৃদয় হাসান ও অর্ডারলি সাদ্দামের নামে কেনা।

হৃদয়ের নামে কেনা সিমটি মিজান বাছিরকে একটি স্যামসাং মোবাইলসহ প্রদান করেন এবং সাদ্দামের নামে কেনা সিমটি নিজে বাছিরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য গোপনে ব্যবহার করেন। নম্বরগুলো থেকে মিজান বিভিন্ন সময় ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে বাছিলের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন মর্মে তথ্য-প্রমান পাওয়া গেছে। তদন্তে আরও প্রমাণিত হয় যে, মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে বাছিরের সঙ্গে ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত কথোপকথন রেকর্ড করে সংরক্ষণ করেন এবং পরবর্তীতে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করেন। মিজান নিজে অবৈধ সম্পদের অভিযোগ থেকে বাঁচার জন্যই অসৎ উদ্দেশে বাছিরকে ঘুষ প্রদান করে প্রভাবিত করেন। আর বাছির সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তার ওপর অর্পিত দায়িত্বপালনকালে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য ঘুষ গ্রহণ করে গোপন করেন।

advertisement