advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনে চীনারা কী আসলেই সুরক্ষিত?

পলাশ আহসান
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৮:২৭ পিএম | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৮:২৭ পিএম
advertisement

পুরো উহান জুড়ে যখন করোনার তাণ্ডব, তখন চীনের প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ চলছিল। করোনার তাণ্ডব যখন গোটা পৃথিবী আচ্ছন্ন তখনো চীনের রাজ্যে রাজ্যে চলছে নাগরিকদের তথ্যব্যাংক তৈরির কাজ। বলা হচ্ছিল, এতে প্রত্যেক নাগরিকের ওপর নজর রাখা সহজ হবে। মানুষ দ্রুত চিকিৎসা পাবে। পরে চীনা গণমাধ্যমগুলো বলেছে, কোনো রকম ঢাক ঢোল না পিটিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৭ থেকে। করোনার সময় কাজটি প্রকাশ্যে করার সুযোগ পায় সরকার।

এর মাত্র বছর দেড়েক পর এই আগস্টে চীনের আইন প্রণেতারা পাশ করলেন ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন। যেটা চীনাদের কাছে পরিচিত পিআইপিএল হিসাবে। বলা হচ্ছে, টানা কাজ করে প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে তথ্যব্যংক করা হয়েছে। যেটা রীতিমতো গবেষণা। তবে চাইলেই সেই তথ্য কেউ নিতে পারবে না। এরই মধ্যে কয়েকটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আইনটা মূলত এই ব্যাংক পরিচালনার কয়েকগুচ্ছ নিয়ম।

যদিও বেশিরভাগ চীনা নাগরিক বলছেন, এটি তাদের জন্যে প্যানডোরার বক্স। গ্রিক পূরাণের প্রথম মানবী প্যানডোরা ও মানুষ জাতির নিয়ন্ত্রক প্রমিথিউসের বিয়েতে যে নিষিদ্ধ বাক্সটি উপহার দিয়েছিলেন খোদ দেব রাজ জিউস। এটি সেরকমই। কারণ স্বয়ং দেবরাজ বলেছিলেন, এই বাক্সটি রহস্যময়। এটি খুললেই জীবনের সুখ নষ্ট হবে। চীনের নতুন তথ্য সুরক্ষা আইনও তাদের কাছে রহস্যময়। শি জিন পিং প্রশাসন কীভাবে এটি ব্যবহার করবে সেটিই এখন তাদের জন্য উদ্বেগের।

নাগরিকের এই উদ্বেগ যে মোটেও অবাস্তব নয়, বলছেন আইনের বিশ্লেষকরাই। এরই মধ্যে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো গণমাধ্যমও বলেছে, আইনটি বিশ্বের অন্যতম কঠোর উপাত্তভিত্তক আইন। এখানে বলা হচ্ছে, কোনো ব্যক্তির তথ্য ব্যবহার করতে হলে তাঁর নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিতে হবে। আবার ব্যক্তির অনুমতিও লাগবে।

বিশ্লেষকদের মতে এ পর্যন্ত ঠিক আছে। সবার মতে এই আইনের বিপত্তিটা ঠিক এর পরের লাইনে। কারণ সেখানে বলা হচ্ছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের সংবিধিবদ্ধ ভিত্তি থাকলে তারা তথ্য ব্যবহারে ছাড় পাবেন। অর্থাৎ তারা ব্যক্তির তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু কে পাবে সেই সংবিধিবদ্ধ ভিত্তি?  কী হবে তার যোগ্যতা? এর কোনো সংজ্ঞা আইনে নির্ধারণ করা হয়নি।

বিপত্তি আরেও আছে। করোনার সময় তথ্য নিতে গিয়ে নাগরিকদের লাল-সবুজ-হলুদের মতো রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ ছাড়া অন্য সময় তাদের নানা আচরণের ওপর ভিত্তি করে পয়েন্ট দেওয়া হয়েছিল। এই চিহ্নিতকরণ রঙ এবং পয়েন্ট নাগরিকদের জীবনে নানা বিপর্যয় ডেকে আনার আশঙ্কা করেন বেশিরভাগ চীনা। তারা বলেন, একটা ঘোর বিপদের সময় তাদের দেওয়া তথ্য আরো যাচাই করে তথ্যব্যংকে দেওয়া দরকার ছিল। কারণ এখন একটু ভুলের কারণে অনেকেই ভ্রমণে যেতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না, চাকরিও পাবেন না। এমনকি ব্যাংকে লেনদেনও করতে পারবেন না।

এই আইনের কাছে এরই মধ্যে আত্মসমর্পণ করেছেন বেশিরভাগ চীনা। যদিও তারা জানেন এই আইনের উৎস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের নাগরিকদের তথ্য গোপন আইন সম্পর্কে। তারা এও জানেন যে, ওই সব দেশে এই আইনগুলো ভোক্তা অধিকার আইনের মতোই জনবান্ধব। কিন্ত মুখে মুখে বলা হলেও এখনো চীনে এমন কোনো আইন হয়নি যেটা নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের পুরোপুরি সুবিধা দেবে। কারণ এখনো ইন্টারনেটে কোনো প্রতিষ্ঠানের সেবা নিতে হলে সেখানে তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের প্রায় পুরোটাই দিতে হচ্ছে।

তবুও একটা খরাপ সময় কাটিয়ে ওঠার তাগিদে তারা বেশি বেশি নমনীয়। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইনটি তারা মানতেই চান। কিন্তু যে অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে বর্তমান তথ্যবাংকটি করা হয়েছে সেটি সংশোধনের দাবি তুলছেন সরকারের কাছে। পাশাপাশি বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ক্ষমতা, তথ্য ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির মধ্যে একটি পরিষ্কার নিয়মের লাইন থাকা দরকার। শি জিন পিং এর দেওয়া প্যানডোরার বাক্সটি ভাঙার পৌরানিক ভুলের পথে তারা হাঁটতেই চান না। বিশেষ করে এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে।

লেখক : গণমাধ্যম কর্মী।

advertisement