advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

আকাশ সংস্কৃতি এবং আমাদের মানসিকতা

আকম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
১১ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২১ ১১:২৪ পিএম
advertisement

আমার মন ভালো নেই। এখন আমার সময় কাটে না। সকালে ঠিক সাড়ে ৭টায় ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজে। কিন্তু দেখা বা শোনার সুযোগ নেই আকাশ আটের গুড মর্নিং আকাশ। আহা, পাক্কা আড়াই ঘণ্টার গানের অনুষ্ঠান। গান শোনা, গান সম্পর্কে জানা। গুণী শিল্পীদের সম্পর্কে অজানা তথ্য জানার এক রস টইটুম্বুর সময়। কেউ হয়তো ধমক দিয়ে বলবেন, আমাদেরও তো হয়। হ্যাঁ, হয়। তবে আপনার যাকে ভালো লাগবে, তাকে আমার ভালো লাগতেই হবে? অথবা বিপরীতটাও, তা কি সম্ভব?

গুড মর্নিং আকাশ শুনতে শুনতে চলে যেতাম কাজে। কাজ থেকে ফিরে বিকালে দিদি নম্বর ওয়ান। এক দিদি নম্বর ওয়ানের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি দাঁড়ান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপক্ষে, তা হলে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। দশ বছর ধরে রচনা হয়েছেন বাংলাভাষী নারীদের পথের দিশা। পশ্চিম বাংলার অনেক নারীই- তা তিনি যে বয়সেরই হোন, রচনার কাছ থেকে সাহস পেয়ে হাল ধরেছেন জীবনের নৌকার। বাংলাদেশের নারীরাও কি সাহসের জোগান পান না রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে! আমি এখন নিত্যহারাই সেসব লড়াকু নারীর গল্পগাথা শোনার সুযোগ।

শুরু হয়েছিল দাদাগিরি। চলছিল ডান্স। বাংলা ডান্সের শেষের দিকের পর্বগুলো। বাংলা ভাষাভাষী- যারা ভালো অনুষ্ঠানের কাঙাল, তারা কে না দেখতেন এই অনুষ্ঠানগুলো!

আমি জি-বাংলার সিরিয়াল দেখি। অনেকেই বলেন, আমি কেন মেয়েদের কুটনিপনা দেখি গৃহবধূদের মতো করে? অবাক কা-, তারাও দেখেন। আমি দেখি যেমন তাদের কুটনিপনা- তেমনি দেখি অবশেষে সত্যের জয়, ন্যায়ের জয়। নাট্যকাররা মুনশিয়ানার সঙ্গেই দেখান ন্যায়ের পথ বিজয়ী হয় সর্বদাই। এই ন্যায়বাদিতা দেখা কি অন্যায়?

আমার নানি প্রয়াত হয়েছেন এক দেশ এক টিভির কালে। আমরা যখন মনোযোগ দিয়ে খবর দেখতাম কিংবা নাটক, তখন ‘নানি বলতেন- রোজ রোজ একই জিনিস দেখে কী মজা পাস। কালও তো টেলিভিশন দেখলু, পরশুও দেখলু। রোজ রোজ না দেখলি হয় না!’ শেষ জীবনে নানি হয়েছিলেন অন্ধ। তাই হয়তো ভাবতেন, আমরা একই জিনিস নিত্য নিত্য দেখি।

এবারের বিরোধটা মূলত বিজ্ঞাপন নিয়ে। আমরা কুয়ার ব্যাঙ। কুয়াজগতের বাসিন্দা আমার মনে হয়, বাংলাদেশের এক বড় প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন দেয় পশ্চিম বাংলার এক চ্যানেলে। এমনকি কোনো কোনো অনুষ্ঠান স্পন্সরও করে ওই প্রতিষ্ঠান। এতে আমাদের গাত্রদাহ হতেই পারে। একদা আমাদের বিটিভিতে ‘সকাল-সন্ধ্যা’, ‘সংশপ্তক’, ‘অয়োময়’, ‘আজ রবিবার’, ‘কোথাও কেউ নেই’ দেখার জন্য পশ্চিম বাংলার মানুষও অ্যান্টেনার সঙ্গে বেঁধেছে ঘটিবাটি। বারাসাতে ব্যবস্থা করে নিয়েছে বাংলাদেশের চ্যানেল দেখার।

আমাদের চ্যানেলগুলো প্রচারিত হয় পৃথিবীর নানা দেশে এবং সবিজ্ঞাপনে। ভারতের চ্যানেল আমাদের দেশের আকাশসীমা পেরোলেও বারাসাতের একটা ছোট এলাকা ছাড়া পুরো ভারতে আমাদের চ্যানেলগুলো ঢুকতে পারে না কারও ঘরে। আমাদের পণ্যও ভারতে বিক্রি হয়। প্রাণ, রুচি, কেয়া ভারতের অনেক এলাকায় পপুলার ব্র্যান্ড। আমাদের চ্যানেল তাদের আকাশসীমায় গেলে প্রাণকে হয়তো বিজ্ঞাপন দিতে হতো না ভারতের চ্যানেলে। আমরা পারছি না বলেই ভারতে প্রাণের বাণিজ্যসম্ভার বজায় রাখতে তাদের চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিতেই হয়। আমাদের আকাশ সংকুচিত হলেই কি আমাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন ভারতীয় চ্যানেলে বন্ধ হবে?

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন যখন ডাব করে আমাদের চ্যানেলে প্রচারিত হয়, তখন কি আমাদের বিজ্ঞাপনশিল্প কোনো সুবিধা পায়? তাদের বিজ্ঞাপন আমরা কেন দেখব বা আমাদের দেশীয় কোম্পানির বিজ্ঞাপন কেন অন্য দেশের চ্যানেলে দেখব- এই যদি হয় আমাদের ক্ষোভের কারণ, তা হলে তো বন্ধ হওয়া উচিত বাংলায় ডাব করা বিদেশি বিজ্ঞাপনও।

সব পরিস্থিতিতে সুবিধা আদায় করে আনতে পারাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের দেশীয় কোম্পানিগুলো যে বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে ভিনদেশি চ্যানেলে, এর ওপর কর নির্ধারণ করতে পারি। শর্ত আরোপ করতে পারি নানা ধরনের। আবার কেবল দেশীয় মডেলদের দিয়ে বিজ্ঞাপন নির্মাণ করতে হবে- এ শর্তও ধোপে টিকবে না। আমরা এখন প্রায় চলচ্চিত্রই নির্মাণ করি দুই দেশের শিল্পী নিয়ে। আমাদের কয়েক শিল্পী দেশের চেয়ে সীমানার ওপারেই কাজ করেন বেশি। এতে আমরাও গর্ববোধ করি।

ও হ্যাঁ, আরেকটা কারণে আমি পশ্চিম বাংলার চ্যানেল দেখি। সেটি হলো বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ শুনতে আমি কষ্ট পাই। আমাদের ইদানীংকার নাটকগুলো ওই কষ্ট শুধু বৃদ্ধি করে। আমরা যদি কেবল আমাদের চ্যানেলেই নির্ভরশীল হয়ে যাই, তা হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক নতুন ধরনের বাংলা বলবে। তা হয়তো অনেকের কাছে ভালো লাগলেই আমার মতো বোকা-সোকাদের ভালো লাগবে না।

যদি লড়াকু মনোভাব নিয়ে প্রতিযোগিতা করি ও ভালো অনুষ্ঠান করি, তা হলে কাকলি ফার্নিচারের বিজ্ঞাপন ওখানে প্রচারিত হবে না। তারাই আমাদের চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেবে। ওই মনোভাব না নিয়ে আমরা ঘরবন্দি হলে আখেরে ক্ষতি আমাদেরই। আমাদের ঘরের টিভি অচল হলে দেশের বিজ্ঞাপনশিল্পও ব্যাহত হবে। তাই শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পাল্লা দিতে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করি। উটপাখির মতো বালুতে মুখ গুঁজে রাখলে প্রতিপক্ষের শক্তি হ্রাস হবে না।

আকম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

advertisement