advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

কন্যাশিশুর বিয়ে
পড়াশোনা তোমাকে আগলে রাখবে

আনোয়ারা আজাদ
১৩ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২১ ০৯:৪২ এএম
advertisement

আমাদের সমাজে এখনো কন্যাশিশু জন্ম নিলেই একটা অন্য রকম হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে যায়। গ্রামেই হোক কিংবা শহরে। গরিব কিংবা ধনী- যে পরিবারেই হোক না কেন, অন্য একটি হিসাব অটোমেটিক চালু হয়ে যায়! মুখে বলার প্রয়োজন হয় না, নীরবে-নিভৃতে মগজে ওই বার্তা পৌঁছে যায়! লেখাপড়া না জানা বা গরিব মানুষের কথা পরে। অনেক লেখাপড়া জানা মানুষের কথা শুনে হয়রান হয়েছি, হয়রান হই। সন্তানের বেলায় সমানভাবে চিন্তাভাবনা করার কথা বলতেই হেঁচকি উঠতে দেখেছি, কাশি উঠতে দেখেছি। ‘না না, তাহা কী করিয়া হয়’ প্রকাশ দেখেছি! যারা নিরুপায় মানে- যাদের দুজনই কন্যাসন্তান, তারা অন্য ভাবনায় এগোলেও সমাজ তা গুরুত্ব দেয় না। সেটি বোঝা যায় কন্যাদ্বয়ের পিতৃবিয়োগ হলে।

এদিকে যাদের পুত্র ও কন্যা দুজনই উপস্থিত, তাদেরও ভাবনার পরিবর্তন খুব একটা চোখে পড়ে না। সংসারে পুত্র ও কন্যা দুজনের উপস্থিতি পরিবারটিতে একটি অসম ফ্লেভার ছড়িয়ে রেখেছে যুগ যুগ ধরে। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না। আগে সমস্যাগুলো প্রকট থাকলেও এখন একটু হালকা-পাতলা মানে, অতটা দৃশ্যমান নয়! অথচ মূল সমস্যার কোনোই অগ্রগতি নেই তবুও। অনেকেই আহ্লাদ করে বলে থাকেন- মেয়েরা ঘরের শোভা, ঘরে মেয়ে না থাকলে ভালো লাগে না। আসলে এসব ফাঁকিবাজি কথাবার্তা, মন ভোলানো কথা। আসল কথা হলো- ঘরে মেয়ে থাকলে মায়ের কাজে হাত লাগায়, ঘরে ফেরা বাপের লুঙ্গি-গামছা-তোয়ালে এগিয়ে দেয়, মেহমান এলে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়, খাবার বানায় ইত্যাদি সুবিধা উপভোগ করা যায়। আর পরিবারে একটু অভাব-অনটন কিংবা সামান্য কোনো সমস্যা দেখা দিলেই সেটির সমাধান করার চেষ্টা করে ঘরের শোভাকে ঘর থেকে বিদায় করে! নিজের দায়দায়িত্ব এড়িয়ে বিয়ের নামে তখন চালান করে দেওয়া হয় অন্য পরিবারে শোভা বৃদ্ধির জন্য! যে পরিবারে ভাত-কাপড়ের সমস্যা নেই, সমস্যা আছে শোভা বৃদ্ধি ও কাজ করার লোকের কিংবা বখে যাওয়া পুত্রকে গোয়ালঘরে বাঁধার! আর নয়তো কোনো বিপত্নীকের ভাত রেঁধে দেওয়ার বিষয়টি সমাজের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে থাকলে! ঘর-সংসার সামলানো, ভাত রেঁধে খাওয়া পুরুষের জন্য কঠিনতর একটি কাজ! নারী সব সামলে নেয়! পুঁচকে কন্যাও পারে! কন্যা তখন পরিপূর্ণ নারী হয়ে যায়! তো ভাত-কাপড়ের বিনিময়ে ছোট্ট কন্যার ঘাড়ে যাবতীয় গৃহস্থালি ও নিজেদের উচ্ছন্নে যাওয়া পুত্র বা পুত্রের বাবার দায়িত্ব চাপিয়ে পরকালের সুখ সমৃদ্ধির চিন্তায় খুব সহজেই বিভোর হয়ে যাওয়া যায়! নারী তুমি জন্মই নিয়েছ বলির পাঁঠা হওয়ার জন্য! তোমার স্বপ্ন, তোমার জীবন- সবই মিথ্যা!

জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় বাল্যবিয়ে রোধে সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে শূন্যের কোঠায় নামানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দিয়েছিল। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সর্বশেষ জরিপ বলছে, বর্তমানে দেশে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ পত্রিকার খবর অনুযায়ী গত দেড় বছরে অর্থাৎ করোনা মহামারীর মধ্যে দেশের ৯ জেলায় সাড়ে সাত হাজারের বেশি বাল্যবিয়ে হয়েছে বা বলি দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর রিপোর্ট এখনো জানা হয়নি।

গত ১২ সেপ্টেম্বর সারাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলার পর ছাত্রীদের অনুপস্থিতি দেখে বাল্যবিয়ের জরিপটি সামনে আসে। পত্রিকার প্রতিনিধি ও বেসরকারি সংস্থগুলোর জরিপে উঠে আসে সংখ্যা ও জেলাগুলোর নাম। এই যে বাল্যবিয়ের সংখ্যা- এখানে ছাত্রীদের কথাই বলা হচ্ছে, ছাত্রদের কথা আসেনি। তাদের সঙ্গে যাদের বিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে পাত্রের বয়সের কথাও আসেনি কিংবা দুই-একটি এসেছে। কেন আসেনি? কারণ বেশিরভাগ বিয়েই অসম বয়সীর মধ্যে হওয়া। এদিকে পাত্রীর বয়স বাড়িয়ে সরকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এসব বিয়ে জায়েজ করা হয়েছে। সম্পন্ন ঘরের মধ্যবয়স্ক, ভ্যারেন্ডা ভাজা, লাফাঙ্গা- সব পাত্রের গলায় ঝুলিয়ে কন্যাদায়গ্রস্ত (!) পিতা দায়মুক্ত হওয়ার সুখে বিভোর হয়েছেন। সুখী হতে পেরেছেন কি?

আমার পরিচিত এক ড্রাইভার সেদিন তার একমাত্র বোনের কথা শুনিয়েছিলেন। সাত ভাইয়ের একমাত্র পারুল বোন! খুব শখ করে অল্পবয়সে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল পাত্রের ইচ্ছায়। পাত্রের ইচ্ছায় হলেও পাত্রের মায়ের পছন্দ ছিল না। যা হয়। শুরু হলো নির্যাতন। একটা সময়ে বোনকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হলেন ভাইয়েরা। দুই সন্তানও জন্ম দিয়েছিলেন বোন। কিন্তু নির্যাতনের মাত্রা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, বোন সন্তান ছাড়াই চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে এই বোন কাতারে চলে গিয়েছেন কাজ করার জন্য। তিনি জানিয়েছেন- কাতারে যে বাড়িতে আছেন, সেখানে খুব ভালো আছেন। এক বছরের মাথায় ভাইদের টাকা পাঠিয়েছে নিজের জন্য ঘর ওঠানোর। বোনের পরিকল্পনা- পাঁচ বছর কাজ করে দেশে ফিরে আসবেন। নিজের টাকায় করা বাড়িতে থেকে হাঁস-মুরগির ফার্ম করবেন।

ভাবুন এই জায়গাটা। বছর ঘুরে কোলে সন্তান নিয়ে অনেক মেয়েকেই ফিরতে হচ্ছে। ফেরার পর কী হচ্ছে ভাবুন! আরেকজনের দায়িত্ব কাঁধে হিমশিম অবস্থা। নিজেই সে একজন বালিকা, এর ওপর কোলে শিশু। জনসংখ্যা বৃদ্ধির দায় মাথায়! যে নিজেই পুষ্টিকর খাওয়া পায় না, সে আরেকজনের পুষ্টি জোগাবে কেমন করে? অনেককে ফিরতে হয় যৌতুকের চাপ সহ্য করতে না পেরে। তাদের জগৎ কীভাবে পাল্টে যায় ভাবুন! তা হলে শিক্ষিত হোক কিংবা মূর্খ, লেখাপড়া না জানা, গরিব- যেই হোক না কেন, বিয়ের রঙিন স্বপ্নে অযথা দিকভ্রান্ত না করে নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী আগে কাজ করতে আগ্রহী করে তুলতে হবে। তাই করজোড়ে অনুরোধ, কন্যাদের আগে নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করতে দিন। উপার্জন করতে দিন, নিজেকে মানুষ বলে যেন ভাবতে পারে- সেভাবে প্রস্তুত করুন। তুমি মেয়ে, তুমি মেয়ে- এই ভাবনায় বুঁদ না হয়ে তুমি মানুষ, এই ভাবনায় বড় করতে চেষ্টা করুন। মানুষ হওয়ার ভাবনাটাকেই প্রাধান্য দিন।

পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী ঢাকা শহরেই প্রতিদিন ৫০০ ডিভোর্স হচ্ছে। সারাদেশের সঠিক চিত্র জানতে পারিনি। তবে এটি মোটেও সুখকর নয়। কিছুটা হলেও তো মেয়েরা সচেতন হয়েছেন, ন্যায়-অন্যায় বুঝতে পারেন। মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করার মানসিকতায় নেই এখন। দুই-একজন মেয়ে নিজেই প্রতিবাদ করে বিয়ে ঠেকানোর দৃষ্টান্ত রেখেছে। কিন্তু জোর করে বা নানা অজুহাতে বাল্যবয়সে বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছে অনেকেই। আজকাল ধনি-গরিব ও শিক্ষিত-মূর্খ প্রায় সবারই বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। তা হলে খরচাপাতি, ধারদেনা ও জোর করে বিয়ে দিয়ে কোন কাজে লাগছে? অন্যান্য সমস্যার সঙ্গে বাংলাদেশ এখন ভুগছে বিয়ে সংক্রান্ত জটিলতায়। বয়স কম হোক আর বেশি! ছোটবেলায় পড়েছি- ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।’ তা মাথায় সেঁটে আছে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই উল্টোটা করে- ‘করিয়া ভাবিয়া মরে!’

এখন আসি আরেকটি বিষয়ে। সংসারে অভাব বা অন্য যে কোনো পারিবারিক টানাটানিতে মেয়েকেই কেন বিয়ে দিয়ে সমাধান করার চেষ্টা? গরু, ছাগল ইত্যাদি বেচা শেষ হয়ে গেলে মেয়ে বেচেন, তাই তো? ঘরে থাকা ১৫-১৬ বছরের ছেলেকে নিয়ে তো এভাবে ভাবছেন না। ভাবছেন, তাকে যে কোনো একটি কাজে ঢুকিয়ে দেবেন, তাই তো? তা হলে একই বয়সের মেয়েকে কেন বলির পাঁঠা হতে হবে? সেও তো যে কোনো কাজে ঢুকতে পারে। আজকাল কোন কাজটা করছেন না মেয়েরা? মাঠে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে গরু-ছাগলের খামারবাড়িও গড়ে তুলছে মেয়েরা। তা হলে শুধু ভাত-কাপড়ের বিনিময়ে বিনা পারিশ্রমিকে অন্যের জোয়ালে লাগানোর প্রয়োজন কী? বিয়ের পর মহারানির মতো থাকার সুযোগ পান কোন মেয়ে? একমাত্র নিজের উপাজর্নেই তিনি মহারানির মতো থাকতে পারেন। অনেকেই মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবেও বিয়ে দেন। এসব পুরনো ধারণা। পুরনো ধারণাগুলো পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে আসার দিন এখন। মেয়েকেও ওই একইভাবে মানসিক শক্তি জোগাতে সাহায্য করুন। জীবনকে জটিল করে না তুলে সহজভাবে গ্রহণ করার সময় এখন। বিয়েতে যে টাকা খরচ করবেন, এ টাকা দিয়ে ওই মেয়েও ছোট্ট একটি দোকান দিয়ে উপার্জন করতে পারবেন। মেয়েরা জন্মগতভাবেই দায়িত্বশীল। সংসারে উপার্জনের ভার ছেলেরাই নিতে পারবেন, মেয়েরা পারবেন না- এ ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত এখন। অন্যের সংসারের জন্য প্রস্তুত না করে মেয়েকে নিজের মতো করে বাঁচতে শিক্ষা দিন।

সবশেষে বলব- অলরেডি যারা বাল্যকালেই বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছ, লেখাপড়া বন্ধ করে দিও না। যে কোনো মূল্যে কাজকর্মের অবসরে হলেও পড়াশোনা চালিয়ে যাও। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্রীদের উপবৃত্তি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। তোমরা তো জানোই- যে দেশে মেয়েদের শিক্ষিতের হার যত বেশি, ওই দেশ তত বেশি উন্নত।

আনোয়ারা আজাদ : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

advertisement