advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

রোদে পুড়ে অপেক্ষার পর শূন্য হাতে ফেরা টিসিবি

পণ্যের জন্য হাহাকার

রেজাউল রেজা
১৪ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২১ ০২:২৫ এএম
advertisement

ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন আড়াইটা। রাজধানীর শাহজাহানপুর ফ্লাইওভারের নিচে দেখা গেল একদল মানুষের জটলা। কড়া রোদ আর ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে লাইন ধরে রেখেছেন তারা। অনেকেই এসেছেন সকাল সাতটায়; জায়গা ধরে রাখতে ইট দিয়ে সড়কে এঁকেছেন বৃত্তাকার চিহ্ন। বৃত্তের ভেতর কেউ রেখেছেন স্যান্ডেল, কেউ রেখেছেন ইট, আবার কেউবা ব্যাগ। সবার অপেক্ষা টিসিবির ট্রাকের জন্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সকাল থেকে লাইন ধরে রেখেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে অনেককেই। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম অসহনীয় হওয়ায় টিসিবির পণ্য কেনা মানুষের সংখ্যা বেশ বেড়েছে। তা ছাড়া করোনায় আয় কমে যাওয়ায়ও অনেকেই দাঁড়াচ্ছেন এ সারিতে। কিন্তু সেই অনুযায়ী জোগান না বাড়ায় সবার ভাগ্যে জুটছে না পণ্য। ফিরতে হচ্ছে খালি হাতেই।

লাইনে দাঁড়ানো আমেনা বেগম বলেন, ‘কাজে না গিয়ে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি সদায়পাতির জন্য। কিন্তু দুপুর হয়ে গেলেও ট্রাকের দেখা নাই। ট্রাক না আসলে পুরা দিনটাই লোকসান। এতক্ষণ কাজে গেলে কিছু টাকা কামাই হইতো। সেইটাও হইলো না।’

বিকাল তিনটা নাগাদ সেখানে আসে কাক্সিক্ষত ট্রাক। মুহূর্তের মধ্যে লেগে যায় হুড়াহুড়ি। পণ্য বিক্রির একপর্যায়ে সিরিয়াল নিয়ে অপেক্ষামাণদের মধ্যে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। কয়েকজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলেও আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই ফুরিয়ে যায় সব পণ্য। অথচ তখনো পণ্যের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে অন্তত শখানেক মানুষ।

পণ্য না পেয়ে ক্ষুব্ধ শাহজাহানপুরের বাসিন্দা মো. লাভলী বেগম বলেন, ‘আর কত সহ্য করা যায় বলেন। সকাল থেইকা রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়ানো। গাড়ি আইল বিকালে। এর মধ্যে কেউ কেউ গায়ের জোরে দল বাইধাঁ সদায় নিতাছে। ঝগড়া করতে গিয়া গলাটাও ভাইঙা গেছে। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে শুনি বিক্রি শেষ। সেই সকাল থেইকা খারাইয়া থাইকা খালি হাতে বাসায় যেতে হবে। এটা কেমুন বিচার।’ আরেকজন ক্রেতা নাজমুল হক বলেন, ‘বাজারে তেল, চিনি,

পেঁয়াজ, ডালের দাম আমাদের সবার সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। আমরা নিরুপায়। আগে দেখতাম গরিবেরা লাইনে দাঁড়াত। করোনায় নিম্ন মধ্যবিত্তরাও টিসিবির লাইনে যোগ দিয়েছেন। এখন মধ্যবিত্তরাও লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। এতে ট্রাকের জিনিস আগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর অসংখ্য মানুষ খালি হাতে ফিরছেন। এটা অমানবিক।’

গতকাল মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদের পাশে টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে না পেরে আক্ষেপ করছিলেন রিকশাচালক মো. সুরুজ মিয়া। সকাল থেকে চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে সুরুজকে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘এক বেলা রিবশা বন্ধ রেখে লাইনে দাঁড়িয়েছি কম দামে তেল, ডাল, পেঁয়াজ কিনতে। অথচ ট্রাক আসার তিন ঘণ্টার মধ্যেই বিক্রি শেষ। না পারলাম কিনতে, না পারলাম আজকে রিবশা চালাইতে।’

এখানকার ডিলার কোয়ালিটি জেনারেল স্টোরের কর্ণধার মো. দেলোয়ার হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, টিসিবি থেকে পণ্য বুঝে পেতে অনেক ডিলারের দেরি হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় ১১টাও বেজে যাচ্ছে। তা ছাড়া যানজট পেরিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। অপরদিকে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পণ্য বিক্রিও দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। শেষদিকে অসংখ্য মানুষকে খালি হাতে ফেরাতে হচ্ছে। খালি হাতে ফেরাতে আমাদেরও কষ্ট হয়। কিন্তু আমরা নিরুপায়।

দেলোয়ার বলেন, ‘পণ্যের সরবরাহ কমেনি। বরং এ দফায় পেঁয়াজের বরাদ্দ ২০০ কেজি বেড়েছে। এখন ট্রাকপ্রতি ৭০০ কেজি পেঁয়াজ, ৩০০ কেজি করে ডাল ও চিনি এবং ৪০০ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে। আসলে বাজারে পণ্যগুলোর দাম অনেক বেশি হওয়ায় টিসিবির পণ্যে চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, যা বর্তমান বরাদ্দ দিয়ে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।’

দুর্গাপূজা ও করোনাকালে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে গত বুধবার থেকে ভর্তুকিমূলে পণ্য বিক্রি শুরু করেছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ট্রাকসেলে সাশ্রয়ী মূল্যে চারটি পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১০০ টাকা; মসুর ডাল ও চিনি প্রতি কেজি ৫৫ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া পেঁয়াজ (আমদানিকৃত) বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩০ টাকা দরে। একজন ক্রেতা ২ লিটার তেল, ২ কেজি করে ডাল ও চিনি এবং ৪ কেজি পর্যন্ত পেঁয়াজ কিনতে পারছেন। অপরদিকে বাজারে এ পণ্যগুলোর দাম হু হু করে বাড়ছে। রাজধানীর বাজারে খোলা চিনির কেজি এখন ৮০ থেকে ৮২ টাকা, প্যাকেট চিনির কেজি ৮৫টাকা এবং প্রতিকেজি ডাল দানাভেদে ৯০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত সয়াবিনের দাম বেড়েছে অনেক আগেই। প্রতিকেজি খোলা সয়াবিন তেলের দামও ১৫০ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন করে বাড়ছে পেঁয়াজের দামও। দেশি পেঁয়াজের কেজি এখন ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। বাজারদরের এমন চাপে একটু কম দামে পণ্য পেতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ এখন ছুটছেন টিসিবির ট্রাক সেলে। কিন্তু দিনভর কষ্টের পরও অনেকে বাড়ি ফিরছেন খালি হাতে।

গতকাল মহাখালি কাঁচাবাজারের পাশে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়েছে। সেখানেও ক্রেতার ব্যাপক ভিড় ছিল। পণ্য ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেককে খালি হাতে ফেরাতে হয়েছে বলে জানান ডিলার মো. সাইফুল ইসলাম। মেসার্স এসএস এন্টারপ্রাইজের এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘বেশি মানুষ যাতে পণ্য পেতে পারে, সে জন্য জনপ্রতি বিক্রির পরিমাণ কমিয়েছে টিসিবি। এর পরও সবাইকে পণ্য দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্রেতা পণ্য না পেয়ে আমাদের বকাবকি করেন। কিন্তু আমরা তো নিরুপায়। বাজারে এসব পণ্যের দাম কমানো না গেলে ট্রাকের সামনে ভিড় আরও বাড়বে।’

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ বলেন, করোনাকালে নিত্য পণ্যের অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়াটা অমানবিক। গরিবরা ডাল-ভাতটুকুও কিনে খেতে পারছে না। মধ্যবিত্তরাও চাপে আছেন। তারাও এখন টিসিবির ট্রাকের সামনে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সরকার টিসিবি ও ওএমএস-এর মাধ্যমে কম দামে চালসহ প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছে। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। এ কার্যক্রম সারা বছর চালু রেখে পরিধি ও পণ্য বিক্রির পরিমাণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির আমাদের সময়কে বলেন, পেঁয়াজের বাজার এখন অস্থিতিশীল হওয়ায় টিসিবি তুরস্ক থেকে আমদানি বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ট্রাকের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু চাহিদা অনেক বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই পণ্য পাচ্ছেন না। পেঁয়াজের মতো পর্যায়ক্রমে অন্যান্য পণ্যের বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে তুরস্ক থেকে এক হাজার টন পেঁয়াজ এসেছে। পর্যায়ক্রমে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন লটে পেঁয়াজ এসে পৌঁছবে। চলতি পণ্য বিক্রি কার্যক্রম আগামী ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিক্রি বন্ধ থাকছে।

advertisement