advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন প্রয়োজন

মাহফুজুর রহমান
১৭ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২১ ১১:৩২ পিএম
advertisement

পত্রিকান্তরে জানা গেছে, বিদ্যমান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে একটি উপধারা সংযোজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যৌথ তদন্তকারী দলের কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব প্রদান করা হবে। বাস্তব সমস্যার আলোকে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বিধায় এটি প্রশংসার দাবি রাখে।

বাংলাদেশে ২০০২ সালে প্রথমবার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন প্রবর্তন করা হয়। ৩০ এপ্রিল, ২০০২ তারিখ থেকে কার্যকর হয়ে এই আইনটি বলবৎ ছিল ১৪ এপ্রিল, ২০০৮ তারিখ পর্যন্ত। এই আইন অনুসারে বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি মানি লন্ডারিং অপরাধের তদন্ত করতে পারত। কোনো অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধির (১৮৯৮ সালের ৫নং আইন) অধীনে যে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন, এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি একই রূপ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এসব অপরাধ তদন্ত করার উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র ধারণের অধিকার না থাকার জন্য তাদের পক্ষে তখন একটি তদন্তও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। আইনটির প্রয়োগ অধিকতর কার্যকর করার উদ্দেশ্যে ১৮ এপ্রিল, ২০০৭ তারিখ থেকে কার্যকর করে একটি সংশোধনীমূলক অধ্যাদেশ (নং-১৭, ২০০৭) জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে অপরাধগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ (২০০৪ সালের ৫নং আইন)-এর তফসিলভুক্ত অপরাধ হিসেবে দুর্র্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক তদন্তযোগ্য করা হয়।

বিশ্বের প্রতিটি দেশেই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হয় বিধায় ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করে জারি করা হয় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২। এতদ্বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) সুপারিশগুলো সামনে রেখে প্রণীত এই আইনটি বেশ মানসম্পন্ন বলেই মনে করা হয়। এখানে তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে প্রথমে এককভাবে দুদকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরে দেখা যায় যে, ২৭টি সম্পৃক্ত অপরাধের ভেতর কেবল একটি অপরাধের (দুর্নীতি ও ঘুষ) তদন্ত দুদক কর্তৃক সম্পন্ন হয়ে থাকে। সম্পৃক্ত অপরাধগুলোর ভেতর ২৪টির তদন্তের সঙ্গে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সম্পর্কযুক্ত। এ ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কাস্টমস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও তদন্ত কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের সঙ্গে জড়িত না রাখা হলে সফল তদন্ত সম্পাদন করা যায় না। তাই বাস্তব সমস্যার আলোকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (সংশোধন) আইন, ২০১৫-এর ৫ ধারাবলে সম্পৃক্ত অপরাধ তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত তদন্তকারী সংস্থা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে দায়িত্ব প্রদানের কথা বলা হয়। এ ছাড়া যৌথ তদন্তের প্রয়োজনে সরকারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে বিএফআইইউ কর্তৃক এক বা একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে তদন্ত দল গঠন করা যাবে মর্মেও উল্লেখ করা হয়।

আইনের নির্দেশনাটি প্রয়োগ করতে গিয়ে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ সমন্বয়হীনতার অভাব লক্ষ করেছেন। এতে করে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের নিয়ে গঠিত তদন্তকারী দলের সদস্যরা নিজ নিজ সুবিধা অনুসারে তদন্তকাজ পরিচালনা করে থাকেন। ফলে যৌথ তদন্তের মাধ্যমে আকাক্সিক্ষত ফলাফল থেকে কর্তৃপক্ষ বঞ্চিত হচ্ছেন। এরূপ অবস্থায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে আবারও সংশোধনী এনে একটি উপধারা যুক্ত করা হবে। এই উপধারার মাধ্যমে উপরোক্ত যৌথ তদন্তকারী দলের সমন্বয় এবং তদারকির দায়িত্ব প্রদান করা হবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ-কে। উদ্যোগটি প্রশংসনীয় এবং বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে সক্ষম হবে বলেই মনে হয়।

বিদ্যমান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে আরও কিছু দুর্বল দিক রয়েছে। যেমন, ধারা ২ (ঈ) অনুসারে মানি লন্ডারিং অর্থ ‘কোনো আর্থিক লেনদেন এইরূপভাবে সম্পন্ন করা বা সম্পন্ন করিবার চেষ্টা করা যাহাতে এই আইনের অধীন উহা রিপোর্ট করিবার প্রয়োজন হইবে না।’

ব্যাংকের সঙ্গে মানুষের লেনদেনের ধারা বিশ্লেষণ হচ্ছে মানি লন্ডারিং অপরাধ উদঘাটনের একটি হাতিয়ার। একজন মানুষ যখন বিদ্যমান আইনের অনুশাসন থেকে জানবে যে, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার কাছাকাছি অঙ্কের লেনদেন করা মানি লন্ডারিং অপরাধ, তখন সে স্বাভাবিক লেনদেন করতে বিব্রতবোধ করবে এবং সচেতনভাবেই লেনদেন সম্পন্ন করতে চাইবে। অনেক সময় ব্যাংক কর্মকর্তারাও এরূপ লেনদেন করার পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। ফলে লেনদেনের প্রকৃত ধারা হাতে পাওয়া যায় না এবং সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না।

বিদ্যমান আইনের ২(ঊ) ধারা অনুসারে মানি লন্ডারিং অর্থ ‘সম্পৃক্ত অপরাধ হইতে অর্জিত জানা সত্ত্বেও এই ধরনের সম্পত্তি গ্রহণ, দখলে নেওয়া বা ভোগ করা।’

এ ক্ষেত্রে কারও সঙ্গে কোনো লেনদেন করার আগে সবাইকে জেনে নিতে হবে যে, লেনদেনকৃত সম্পত্তিটি সম্পৃক্ত অপরাধ থেকে অর্জিত কিনা। আবার কোনো লোকের পাওনা টাকা গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও দেনাদার কর্তৃক প্রদেয় অর্থ বা সম্পদ যদি সম্পৃক্ত অপরাধ থেকে অর্জিত হয়ে থাকে তা হলে গ্রহণ করা যাবে না। আবার একজন অপরাধীর বৈধ এবং অবৈধ আয় থাকতে পারে। ধরা যাক একজন সরকারি কর্মকর্তা এক লাখ টাকা বেতন পানÑ যা তার বৈধ আয়। আবার তিনি এক লাখ টাকা ঘুষ খেয়েছেনÑ যা তার অবৈধ আয়। এখন এই দুটো আয় তিনি একত্রে মিশিয়ে ফেলেছেন। এই ভদ্রলোকের কাছে যদি কারও টাকা পাওনা থাকে তা হলে তিনি আয়ের কোন অংশ থেকে টাকা পরিশোধ করছেন তা জানা সম্ভব নয়। রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা ব্যাংক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক ও সঙ্গত কারণেই সম্পৃক্ত অপরাধ থেকে অর্জিত আয় দখলে নিয়ে থাকে। আয়টি বা জমার টাকার উৎস সন্দেহজনক মনে হলে আইনের নির্দেশনা অনুসারে তারা বিএফআইইউর কাছে সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট পাঠায়। এখন এই বিধান অনুসারে ব্যাংক বা অন্য রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা, সম্পৃক্ত অপরাধ থেকে অর্জিত আয় জমা নিয়েছে বা দখলে নিয়েছে বিধায়, মানি লন্ডারিং অপরাধে অপরাধী হওয়ার কথা।

আইনের ২৩(১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থার সঙ্গে পরিচালিত যে কোনো হিসাবে পর্যায়ক্রমিক আদেশের মাধ্যমে ২১০ দিন পর্যন্ত লেনদেন স্থগিত বা অবরুদ্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করতে পারে। একটি হিসাব এভাবে বিএফআইইউ কর্তৃক অবরোধ করার পর যদি তারা নিশ্চিতভাবে জানতে পারে যে, হিসাবে রক্ষিত অর্থ সন্দেহজনক কোনো খাত থেকে অর্জিত নয়, তা হলেও এই অবরুদ্ধ হিসাব মুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা আইনে বা সংশ্লিষ্ট বিধিতে উল্লেখ করা হয়নি। এর ফলে অনেকেই ঝামেলায় পড়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে অবরোধকারী হিসেবে বিএফআইইউ প্রায়ই কিছু করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে বিএফআইইউ প্রধানকে প্রধান করে এবং কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে অবরোধ আদেশটি পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ থাকা উচিত বলে মনে হয়।

বর্তমানে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের লেনদেন বা সম্পদের তথ্য সংগ্রহের জন্য বিএফআইইউ সবগুলো ব্যাংককে অতি গোপনীয়(!) পত্র প্রেরণ করে। এসব পত্র ব্যাংকের হাতে পৌঁছার পর পরই সংবাদটি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয় এবং পত্রিকায় ছাপা হয়ে যায়। অর্থাৎ গোপন কথাটি আর গোপন থাকে না। সংবাদটি কীভাবে প্রচারমাধ্যমের কাছে গেল তাও জানা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের তথ্যভাণ্ডারে বিএফআইইউর প্রবেশাধিকার প্রদত্ত হলে সংবাদ সংগ্রহের প্রয়োজনে আর চিঠি লিখতে হবে না। বিএফআইইউ কর্মকর্তারা নিজেদের অফিসে বসেই অনলাইনে তদন্ত করে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। পৃথিবীর অনেক দেশেই ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জন্য এই সুযোগ রক্ষিত আছে। প্রয়োজনবোধে বাংলাদেশেও এই সুযোগ অবারিত করা যায়।

এ দেশে ভূমি, ফ্ল্যাট ইত্যাদির মালিকানার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার নেই। আবার ইমিগ্রেশন, আয়কর, পাসপোর্ট, গাড়ি রেজিস্ট্রেশন ইত্যাদি খাতে তথ্যভাণ্ডার থাকলেও বিএফআইইউর প্রবেশাধিকার নেই। ফলে কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তির অন্যান্য সম্পদ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধীদের শনাক্ত করার প্রয়োজনে এসব তথ্যভাণ্ডারে বিএফআইইউর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) দায়িত্ব হচ্ছে অপরাধীদের সম্পদ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে কেবল সন্দেহজনক বলে চিহ্নিত লেনদেন বা কার্যক্রমগুলো সম্পর্কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানিয়ে দেওয়া। এসব তথ্য প্রাপ্তির পর আরও তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়ার পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম শুরু করবে। বিএফআইইউ যাতে দক্ষতার সঙ্গে সন্দেহজনক লেনদেনের এবং সম্পৃক্ত অপরাধ থেকে অর্জিত সম্পদ বৈধ করার প্রচেষ্টা সংবলিত কার্যক্রম চিহ্নিত করার লক্ষ্যে মানসম্পন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে সে লক্ষ্যেই আইনের সংশোধন করা প্রয়োজন। আইন যেহেতু বারবার সংশোধন করা যায় না, সেহেতু সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সবগুলো সংশোধনী একসঙ্গে আনাই যথাযথ উদ্যোগ বলে বিবেচিত হবে।

মাহফুজুর রহমান : চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি লিমিটেড; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement
advertisement