advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

করোনা টিকাদানে চাই বৈশ্বিক সমতা

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান
১৭ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২১ ১১:৩২ পিএম
advertisement

বিশ্বজুড়েই করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার কমে যাচ্ছে। প্রায় এক বছর ১০ মাস ধরে গোটা বিশ্ব করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে পর্যুদস্ত, প্রাণ নিয়েছে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের, অর্থনীতি ধ্বংসের পথে, জীবনযাপন গতিরুদ্ধ, শিক্ষা বন্ধপ্রায়। এর মধ্যেই কিছুদিন ধরে আমাদের প্রিয় পৃথিবী ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছে তার আসল রূপ। দেশ থেকে দেশে খুলে দেওয়া হচ্ছে যাতায়াত ব্যবস্থা, নতুন করে শিক্ষার্থীদের কলরবে ফিরে পাচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাঞ্চল্য। ইতোমধ্যে খুলে দেওয়া হয়েছে অফিস-আদালত, শপিংমল, রেস্তোরাঁ, হাটবাজার। অনেকটাই জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসছে। তবে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। গত ১১ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৪ জন ও সংক্রমিত হয়েছেন ৪৮১ জন এবং সংক্রমণের হার ২.৩৬। বিশ্বে গত ১১ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণ করেছেন ২৮৫ জন এবং সংক্রমিত হয়েছেন ২০,৬৬৯ জন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ কী পৃথিবী থেকে সহসাই চলে যাবে না নতুন করে অন্য রূপে বা নতুন ঢেউ তুলে ফিরে আসবে?

এ নিয়ে নানা গবেষণা চলছে, রয়েছে নানা সতর্কবার্তা। করোনা প্রতিরোধের প্রধান তিনটি উপায় হচ্ছেÑ ১. করোনা টিকা প্রদান ২. স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং ৩. নিজেকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখা। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে এটি খুবই পরিষ্কার যে, টিকাদানের মাধ্যমে প্রাণহানি ও হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। ঝুঁকি বিবেচনায় টিকার অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা গেলে বহু মৃত্যুই এড়ানো সম্ভব। করোনাজনিত যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, তাদের অধিকাংশই টিকা না নেওয়া ব্যক্তি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানায়, টিকা না নেওয়া মানুষের মৃত্যুঝুঁকি ১১ গুণ বেশি এবং হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি থাকে প্রায় ১০ গুণ বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মনে করে, করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে বিশ্বে প্রতিদিনই যে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে তা অনেকটাই এড়ানো যেত। মূলত টিকা বৈষম্যের কারণে বহু মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করে জাতিসংঘের এ সংস্থাটি।

সিএনবিসির খবরে বলা হয়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনার ডব্লিউএইচওর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ৫৬টি দেশ ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থার কোভিড-১৯ কারিগরি কমিটির প্রধান মারিয়া ভ্যান কারখোভ। বিশ্বে ইতোমধ্যে ৬৪০ কোটি ডোজ করোনার টিকার প্রয়োগ হয়েছে। তবে এসব টিকার অধিকাংশই পেয়েছে ধনী ও মধ্যবিত্ত দেশের বাসিন্দারা। নিম্নআয়ের দেশের মানুষ মাত্র ২.৩ শতাংশ পেয়েছে এ প্রতিষেধক।

এই পরিস্থিতি চরম হৃদয়বিদারক ও হতাশাজনক উল্লেখ করে মারিয়া ভ্যান কারখোভ বলেছেন, ছয়শ কোটিরও বেশি ডোজ টিকার প্রয়োগ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এই বিপুল টিকা প্রয়োগে যদি সঠিক ব্যবস্থাপনা করা যেত তা হলে আজ আমরা খুবই ভিন্নরকম পরিস্থিতিতে থাকতে পারতাম।

মারিয়া ভ্যান কারখোভ বলেন, টিকাদানে ধীরগতি ও অতিসংক্রামক ডেল্টা ধরনের কারণে দরিদ্র দেশগুলো করোনা নিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে। টিকাদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

দেশে দেশে টিকাদানের হার ৪০ শতাংশ না হওয়া পর্যন্ত টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়ার বিপক্ষে ডব্লিউএইচও। এজন্য চলতি বছর বুস্টার ডোজ না দিতে ধনী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে সংস্থাটি।

করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এখনো বিপদমুক্ত হওয়া যায়নি বলে সতর্ক করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কোভিড-১৯বিষয়ক প্রধান মারিয়া ভ্যান কারখোভ। এই মহামারীর ঝুঁকি এখনো শেষ হয়ে যায়নি। মারিয়া বলেন, গত সপ্তাহে বিশ্বে ৩১ লাখ মানুষ নতুন করে করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন। মারা গেছেন আরও ৫৪ হাজার মানুষ। জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থার কাছে এই তথ্য এসেছে। ডব্লিউএইচওর এই কর্মকর্তা জানান, পরবর্তী ৩ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে মহামারী কেমন আকার ধারণ করতে পারে, তা নিয়ে সংস্থার ভেতরে আলোচনা চলছে। তবে খুব তাড়াতাড়ি করোনা বিদায় নেবে বলে মনে করেন না তিনি।

মারিয়া বলেন, এখনো অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা টিকার বাইরে রয়েছেন। হয় তারা টিকা পাননি অথবা তারা টিকা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আর এ কারণে এখনো করোনার বিস্তার চলছে।

অন্যদিকে করোনা টিকার প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে চলছে নতুন নতুন গবেষণা। করোনা ভাইরাসরোধী ফাইজারের টিকার দুই ডোজ গ্রহণের এক মাস পর সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিয়ে থাকে। এর পর টিকার প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তবে এ নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। সিএনএনের খবরে ইসরায়েল ও কাতারে পরিচালিত দুটি গবেষণায় এমন ফল পাওয়া গেছে।

করোনা ভাইরাসরোধী প্রায় সব টিকারই নির্দিষ্ট সময়ের পর প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। বিষয়টি ফাইজার আগেই জানিয়েছিল। এ কারণে বিভিন্ন দেশ বুস্টার ডোজ দেওয়ার কথা ভাবছে। নতুন গবেষণায় সেই বিষয়টি আবারও উঠে এলো। ইসরায়েলে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ৪ হাজার ৮শ স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর গবেষণাকাজ চালানো হয়েছে। দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও শরীরে অ্যান্টিবডির মাত্রা কমে যায়। কাতারে দেখা গেছে, দুই ডোজ দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে টিকার কার্যকারিতা কমতে শুরু করে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে এসব গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে।

এদিকে নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টার ¯ু‹ল অব মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান ফলসি টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, টিকা নেওয়ার পর শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। বিষয়টি নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। তার মতে, করোনায় সংক্রামিত হওয়ার পর গুরুতর অসুস্থতা থেকে বা জীবন বাঁচাতে ফাইজার, মডার্না ও জনসনের টিকা ভালো কাজ করছে। অর্থাৎ টিকা নেওয়ার পর আক্রান্ত হলেও রোগীর অবস্থা গুরুতর হচ্ছে না।

এই চিকিৎসক অবশ্য টিকার বুস্টার ডোজের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। ডা. ফলসির ভাষ্যÑ সব টিকারই বুস্টার ডোজ নেওয়া দরকার। এতে সুরক্ষা আরও মজবুত হতে পারে। কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকারÑ বুস্টার ডোজ অপরিহার্য নয়।

করোনা টিকার সব গবেষণায় দেখা গেছে, এই টিকা প্রয়োগের পর একজন মানুষ সর্বোচ্চ এক বছর করোনা প্রতিরোধ করতে পারে।

করোনা টিকাকরণে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বেশ স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছে। আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসের মধ্যে আট কোটি মানুষকে দুই ডোজ করে টিকা দেওয়া হবে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ১০ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষকে দুই ডোজ টিকা দিতে পেরেছে। অবশ্য সরকারের লক্ষ্য দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা। সেই হিসাবে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি মানুষকে টিকা দিতে হবে।

টিকা এসেছে ৭ কোটি ২২ লাখ। প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ। দৈনিক ১০-১৫ লাখ টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জানুয়ারির মধ্যে কমবেশি ১৬ কোটি টিকা দেশে আসবে। এসব টিকার মূল্য বাবদ অর্থ পরিশোধ করাও হয়ে গেছে।

সরকার ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করেছে, অবশ্যই টিকাপ্রাপ্তি সাপেক্ষে।

কোভিড-১৯ মহামারীর ধাক্কা সামাল দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি প্রকাশিত জাপানের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক নিক্কির কোভিড-১৯ রিকভারি সূচকে এ তথ্য উঠে এসেছে। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতা ধরে রাখা এবং টিকাদান কর্মসূচি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এ সূচক তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নিক্কি।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ১২১টি দেশ ও অঞ্চলের করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে সূচকটি তৈরি করা হয়। সূচক অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় এ বছরে এই সূচকে বাংলাদেশের ৪৮ ধাপ উন্নতি হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় সফলতার সূচকে ১২১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে ২৬তম স্থানে রয়েছে। সূচকে সর্বোচ্চ স্কোর ৯০; বাংলাদেশের স্কোর ৬০। এই স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় স্থানে আছে পাকিস্তান, তৃতীয় ভারত, চতুর্থ নেপাল, পঞ্চম শ্রীলংকা এবং ষষ্ঠ স্থানে আছে ভুটান ও মালদ্বীপ। তলানিতে আফগানিস্তান।

বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গোটা বিশ্বেই করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হারও নিয়ন্ত্রণে। স্বাভাবিক হতে চলেছে পৃথিবী। তার পরও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা করোনার নতুন ঢেউর পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছেন। বাংলাদেশ-ভারতে দুর্গাপূজার মহোৎসব চলছে। করোনা বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

করোনা টিকা বিশ্বের সব দেশে একযোগে প্রয়োগ করতে হবে। কারণ রোগটি দেশ থেকে দেশে ছড়িয়েছে। কোথাও কোথাও রয়ে গেলে সেখান থেকে নতুন করে ছড়াতে পারে। ইতোমধ্যে করোনা টিকার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। সে কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরু থেকেই করোনা টিকার বৈশ্বিক সমতা রাখার জন্য বারবার তাগিদ দিয়েছে। এ লক্ষ্যে ধনী দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। নতুন করে আবার যদি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হয় তা হলে ধনী-দরিদ্র কেউ রক্ষা পাবে না। তাই এখন প্রয়োজন বুস্টার ডোজের পরিবর্তে বিশ্বের সব প্রান্তের মানুষদের ২ ডোজ টিকার আওতায় নিয়ে আসাÑ তা হলেই করোনা ভাইরাস নতুন করে সংক্রমণ করতে পারবে না এবং কাজটি করতে হবে দ্রুততার সঙ্গে। পাশাপাশি সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস করতে হবে। এখন সবারই দায়িত্ব নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। আমাদের অবহেলার কারণে যদি আবার নতুন করে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যায় তখন কিন্তু আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছেÑ চিকিৎসাবিজ্ঞান তাই বলে।

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement
advertisement