advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

নামকরণের স্মৃতিকথা

কাজী রেহানা বেগম
১৮ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২১ ১১:০৩ পিএম
advertisement

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানম-ির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িতে শেখ রাসেল জন্মগ্রহণ করে। ওই সময় পূর্ব পাকিস্তান ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলিতে ভরপুর। কঠিন অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারের মধ্যেও যখন এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধুর ঘর আলোকিত করে জন্ম নিল ছোট্ট শিশু রাসেল।

আর এই রাসেল নামটিও রাখেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর প্রিয় লেখক ছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেল। পৃথিবীর বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের নামের সঙ্গে মিলিয়ে পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যের নাম রাখলেন রাসেল, শেখ রাসেল। পৃথিবীতে মানুষের বসবাস যাতে সুন্দর ও শান্তিময় হয়, ওই লক্ষ্যে কাজ করেছেন বার্ট্রান্ড রাসেল।

বঙ্গবন্ধু জীবনের দীর্ঘদিন কারাবন্দি ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনের পর থেকেই রাজবন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই তার বাবাকে রেখে আসবে না। এ কারণেই তার মন খারাপ থাকত।

‘কারাগারের রোজনামচা’য় শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “৮ ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, ‘আব্বা বাড়ি চলো।’ কী উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম। ও তো বোঝে না, আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, ‘তোমার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’ ও কি বুঝতে চায়। কী করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্তি করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে। দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনো বুঝতে শিখেনি। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।’

‘আমাদের ছোট্ট রাসেল সোনা’ বইয়ের ২১ পৃষ্ঠায় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করত। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাব। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকত। বাবা জেলে থাকায় বাড়িটা থাকত নীরব, রাসেলেরও থাকত মন খারাপ। তাই মা রাসেলের মন ভালো রাখার জন্য বুদ্ধি করে কিনে দেন একটা তিন চাকার সাইকেল। ছোট্ট মানুষ, দুই চাকার সাইকেল চালানোর বয়স তো তখনো হয়নি তার। মায়ের কিনে দেওয়া সাইকেল চালিয়ে বেড়াত সে। রাসেল মায়ের কাছে দেখে বাড়ির কবুতরগুলোকে খাবার দিত। কিন্তু কবুতরের মাংস খেত না। টমি নামে রাসেলের একটা পোষা কুকুর ছিল। টমির সঙ্গে ওর খুব বন্ধুত্ব ছিল। রাসেলও তার পোষা টমির সঙ্গে খেলা করত।’

রাসেলের জন্মের ওইদিনের সৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা চাচা বাসায়। বড় ফুফু ও মেজফুফু মায়ের সাথে। একজন ডাক্তার ও নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আবার জেগে ওঠে। আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেজফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালো চুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় হয়েছিল রাসেল।’

সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা। রাজনৈতিক হত্যাকা-ের এমন বর্বরোচিত উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই আছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ওই কালরাতে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি তার ছোট ছেলে শিশু রাসেলকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল সে। নিষ্পাপ ও নিরপরাধ এই শিশুকে হত্যা করতেও সেদিন খুনিদের বুক কাঁপেনি। মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম মর্মস্পর্শী হত্যাকা- হয়ে থাকবে। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে শিশু রাসেলের মৃত্যু হলেও সে বেঁচে আছে এ দেশের প্রত্যেক মানুষের অন্তরে।

কাজী রেহানা বেগম : গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি

advertisement
advertisement