advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

স্বাধীনতার পঞ্চাশে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম
২৪ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২১ ১০:১৩ পিএম
advertisement

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ অনেক বদলে গেছে। আর্থসামাজিক উন্নয়নে দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশকে পেছনে ফেলে ধারাবাহিকভাবে এক ঈর্ষণীয় সাফল্য ধরে রেখে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সারাবিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের জীবন্ত উদাহরণ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যে উন্নয়ন, এর ৭০ শতাংশ হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের এই আমলে অর্থাৎ গত ১২ বছরে। তা হাসিনা বা হাসিনা যুগ হিসেবে ধরা হয়। ৮০ শতাংশ কৃষিনির্ভর একটি দেশ ধীরে ধীরে কৃষিকে পেছনে ফেলে সেবা ও শিল্প খাত হয়ে উঠেছে জিডিপিতে অবদান রাখা প্রধান ও দ্বিতীয় খাত। ফলে কর্মসংস্থান বেড়েছে। বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত মজবুত হয়েছে, তৈরি হয়েছে উদ্যোক্তা শ্রেণি। তা টেকসই জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখছে। দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বিদেশি সহায়তার আর ওপর নির্ভরশীল নয়। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য এসেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং লিঙ্গবৈষম্য নিরসনে আমাদের অর্জনগুলো নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিচার-বিশ্লেষণ এবং পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে বিদেশে লেখা হচ্ছে বই। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন অর্থনীতি ও সামাজিক বেশিরভাগ সূচকে উদীয়মান একটি রাষ্ট্র। সিএনএন জার্মানির বিজনেস নিউজের সাবেক সঞ্চালক ড্যানিয়েল সিডল তুলে ধরেছেন ‘বাংলাদেশের ৫০ বছর’ নামে তার ওই বইয়ে। বইটি বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে।

২০০৬ সালে বাংলাদেশ যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের হারে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যায়, তখন অনেকেই সেটিকে আকস্মিক সৌভাগ্য বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু সেই থেকে প্রতিবছরই জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এগোতে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এখন বিস্ময়করভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। মাথাপিছু জিডিপির হারে পাকিস্তানকে বেশ পেছনে ফেলে এখন ভারতেকেও ছাড়িয়েছে। নতুন ভিত্তিবছরের (২০১৫-১৬) হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে ২ হাজার ৫৫৪ মার্কিন ডলার হয়েছে। এতদিন পুরনো ভিত্তিবছর (২০০৫-০৬) অনুযায়ী মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ২২৭ ডলার। ফলে মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০৯ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ২৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। বহুল সমালোচিত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতেও গত ৫০ বছরে রয়েছে বড় অর্জন। বিশেষ করে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছর। তা প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান এমনকি বৈশ্বিক গড় আয়ুর চেয়েও বেশি। বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখন নেতৃত্বের আসনে রয়েছে। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প সমৃদ্ধশালী হয়েছে। ৫০ বছর আগের তুলনায় দেশ এখন অনেক শক্তিশালী। সামগ্রিকভাবে দেশে উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকলেও হতাশার জায়গাও কম নয়। পঞ্চাশ বছরেও অনেক কিছু বদলায়নি। এখনো বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে চলার প্রধান প্রতিবন্ধকতা দুর্নীতি, আইনের শাসনের অভাব, জবাবদিহির অভাব, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, রাজনীতিকরণ, সংঘাতপূর্ণ ও পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি। বাংলাদেশে এক নতুন ধনিক শ্রেণির বিস্তার ঘটেছে। এর সূচনা হয়েছিল সেনাশাসনের আওতায় আশির দশক থেকেই। কিন্তু তা ব্যাপক রূপ নিয়েছে নব্বইয়ের পর। রাষ্ট্রীয় পরিপোষণে এই শ্রেণি বেড়ে উঠেছে।

হাতাশার বিষয় হলো, সম্প্রতি সরকারের ‘এ’ ক্যাটাগরির কেপিআইভুক্ত (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন) প্রতিষ্ঠান বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা- যা সার্বক্ষণিক কঠোর নিরাপত্তাবলয়ে থাকে। সেই সচিবালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ’ বিভাগ থেকে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বব্যাপী সত্যিই বিরল ও ন্যক্কারজনক। এটি ইতিহাসে সাক্ষী হয়ে থাকবে। স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক দুর্নীতিই ২০২০ সালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে আমাদের ডুবিয়েছে। অনুরূপভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনের (এমসিসি) মূল্যায়নে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণসহ ২০ সূচকের মধ্যে ১৬টিতেই বাংলাদেশ রেড জোনে পড়ে রেকর্ড করেছে। সম্প্রতি ২০২২ সালের জন্য বাংলাদেশের মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে মার্কিন এই সংস্থা। এ ক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এত হতাশার মধ্যেও আশার কথা হলো, দেশে একশ্রেণির ভোক্তা তৈরি হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ডেটা ল্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এশিয়ায়-বাংলাদেশের ভোক্তাশ্রেণির বিকাশ হবে সবচেয়ে বেশি। ২০২০ সালে বাংলাদেশে মোট ভোক্তাশ্রেণির মানুষের সংখ্যা ছিল সাড়ে ৩ কোটি। তা ২০৩০ সাল নাগাদ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে ৮ কোটি দাঁড়াবে। এই সুবাদে বৈশ্বিক ভোক্তাশ্রেণির তালিকায় বাংলাদেশ ১৭ ধাপ এগিয়ে যাবে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার জোরদারে এই ভোক্তাশ্রেণির ভূমিকাই প্রধান। মাথাপিছু আয় বাড়লে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ভোগ্যব্যয়ও বাড়ে। আর তার ওপর ভর করেই এগিয়ে চলে দেশের অর্থনীতি। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছেÑ উন্নয়ন, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের এই কালপর্বে নব্বইয়ের দশকের শেষ সময়ে এর সঙ্গে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে একটি ঝোঁক তৈরি হয়েছে। এটি এখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আষ্টেপৃষ্ঠে জাতির মনোজগতে গেঁথে আছে, বিশেষ করে জনমিতিক লভ্যাংশের এই পর্বে- যখন একটি দেশ অধিক জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যাবে। নেতৃত্বে থাকবে তরুণরা। সেখানে দেখা যাচ্ছে, তরুণদের মধ্যেই রাজনৈতিক এই অতিঝোঁক। আবার স্বাভাবিকভাবে এটি সরকারি দলের সমর্থকদের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ সবাই রাজনীতির উচ্চাকাক্সক্ষার আড়ালে তোষণনীতির মাধ্যমে ক্ষমতার রস আস্বাদন করতে চায়, ক্ষমতাচর্চায় প্রশান্তি খুঁজে পায়।

শিক্ষার মান আজ তলানিতে। শিক্ষার মান বিশ্লেষণ বলছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাংলাদেশের শিক্ষার মান ২ দশমিক ৮, ভারত ও শ্রীলংকায় ২০ দশমিক ৮ ও পাকিস্তানে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বেহাল অবস্থা। কেননা শিক্ষা ক্ষেত্রে যথাযথ কাজ না করে সবকিছু রাজনীতিকরণ হচ্ছে। ধনি-গরিব, ব্যবসায়ী, ছাত্র-শিক্ষক, যুবক, কৃষক কিংবা সরকারি চাকরিজীবী কর্মকর্তা-কর্মচারী- সবার মধ্যেই এ অতিরাজনীতির প্রবণতা প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে। এই শ্রেণির জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেশের যে কোনো পেশার চেয়ে রাজনীতি পেশা হিসেবে নেওয়ার আগ্রহ লক্ষণীয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে পেশাতেই থাকুন না কেন, নিজেকে সরকারদলীয় রাজনৈতিক কর্মী পরিচয়ে গর্ববোধ করেন এবং তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। তা সরকার নিজেদের ক্ষমতা স্থায়ীকরণে সুকৌশলে আপমর জনসাধারণের মনে রাজনৈতিক এই বিষবাষ্প ঢুকিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন বিজ্ঞজনরা। ফলে সরকার এখন সুফল পাচ্ছে ঠিকই কিন্তু কালক্রমে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞান সমৃদ্ধ জাতি গঠনে এই মিথ্যা দম্ভোক্তির ভোগান্তির শেষ থাকবে না।

এভাবে চলতে থাকলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে প্রচেষ্টা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশকে নেতৃত্বের পর্যায় নিয়ে যাওয়া, তা অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আর তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প ২০৪১ উন্নত, সমৃদ্ধ ও উচ্চআয়ের দেশে উপনীত হওয়ার যে স্বপ্নÑ তা অধরাই থেকে যাবে।

মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম : পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

advertisement
advertisement