advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ভর্তুকি ছাড়া হাফ ভাড়ায় আপত্তি বাস মালিকদের

শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে রিট

তাওহীদুল ইসলাম
২৫ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২১ ০৮:২৮ এএম
advertisement

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির জেরে গণপরিবহনের ভাড়া নিয়ে অস্থিরতা চলছেই। জ্বালানির মূল্য ২৩ শতাংশ বাড়ানোর পর বেঁকে বসেন পরিবহন মালিকরা। তখন বাসে ২৭ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে দেয় সরকার। যদিও পুনর্নির্ধারিত ভাড়ায় অবাধে যাতায়াত করতে পারছেন না যাত্রীরা। বাস শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রেই ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছেন- এমন বচসার ঘটনা প্রায়ই খবরের পাতায় উঠে আসছে। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীরা শুরু করেছেন বাসে হাফ পাসের (অর্ধেক ভাড়া) আন্দোলন। তবে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে তাতে সমর্থন দিচ্ছেন না পরিবহন মালিকরা। তাদের বক্তব্য, সরকার ভর্তুকি দিলেই কেবল তারা অর্ধেক ভাড়ায় শিক্ষার্থীদের বহন করতে পারবেন।

এ পরিস্থিতিতে কীভাবে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করা যায়- তার উত্তরে সড়ক পরিবহন সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, সরকার শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক। কিন্তু আইনে হাফ পাস বলে কিছু নেই। তাই সরকারের পক্ষে বাস মালিকদের বাধ্য করা সম্ভব নয়। বাস পরিচালনা তাদের ব্যবসা। অর্ধেক ভাড়া নিলে তাদের লোকসান হবে। সরকার কারও লোকসান করাতে পারে না।

সচিব জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছে মন্ত্রণালয়। মালিকরা বলেছেন, হাফ ভাড়াকে বৈধতা দিলে সব যাত্রীই কম ভাড়া দিতে চাইবে। কে ছাত্র আর কে অছাত্র, তা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে? এতে গণপরিবহনে সমস্যা আরও বাড়বে।

সড়ক মন্ত্রণালয় বলছে, ভর্তুকি নয়, শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে বিআরটিসির বাস দিতে পারে সরকার। সে ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে হবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটিকে।

ঢাকা শহরের বিআরটিসির সাড়ে ৬শ বাসের মধ্যে দুই শতাধিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ইজারা দেওয়া। এসব বাসে শিক্ষার্থী ও কর্মীরা যাতায়াত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন সুবিধা থাকায় হাফ ভাড়ার আন্দোলনে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নেই। ২০১২ সালে বিআরটিসি স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য বাস চালু করলেও যাত্রী সংকট ও লোকসানে তা বন্ধ হয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, বাস মালিকরা এমনিতেই লোকসান গুনছেন। প্রতি ট্রিপে চার-পাঁচজন ছাত্র এ সুবিধা অলিখিতভাবে পান। কিন্তু হাফ ভাড়ার স্থায়ী স্বীকৃতি মিললে সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে সবাই ভুয়া আইডি কার্ড তৈরি করে ছাত্র হয়ে যাবে। তখন আর বাস চালানো যাবে না। আর এই ভর্তুকি দেবে কে?

তার মতামত, সরকার চাইলে বিআরটিসির মাধ্যমে হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু বেসরকারি বাস মালিকরা ভর্তুকি দিয়ে বাস চালাতে পারবেন না। ডিজেল ছাড়াও যন্ত্রাংশের দাম বেড়েছে। শ্রমিকদের মজুরিও বাড়াতে হবে। সরকার যে ভাড়া নির্ধারণ করেছে, তাতে মুনাফা করাই মুশকিল। অর্ধেক ভাড়া নিলে লোকসান হবে। তবে সরকার ভর্তুকি দিলে হাফ পাস সম্ভব।

সরেজমিন দেখা গেছে, যেসব এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেশি, সেই রুটের বাসে ভাড়া নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। যেমন ধানমন্ডির সাত মসজিদ সড়ক থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত আটটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, চারটি বড় কলেজ এবং দুটি বিদ্যালয় রয়েছে।

মোহাম্মদপুর থেকে নিউমার্কেট রুটে চলা ৩৬ নম্বর বাসের মালিক হাজি নুর বলেন, সকাল ও বিকালে তার বাসের ৭০ শতাংশ যাত্রী থাকে শিক্ষার্থী। তাদের কাছ থেকে কম ভাড়া নেওয়া হয়। অর্ধেক নিলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।

২০১৫ সালের অক্টোবরে বিআরটিসির কার্যালয়ে বাস ডিপো ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে এক বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘আমি এই মুহূর্ত থেকে নির্দেশ দিচ্ছি, রাজধানীতে চলাচলরত বিআরটিসির পাশাপাশি অন্যান্য পরিবহনেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নেবে। আর না নিলে দায়ী পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এর পর ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের সড়ক আন্দোলনে ‘জেগে ওঠে’ পুরো দেশ। সেই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ৯ দাবির একটি ছিল, ঢাকাসহ সারাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সে সময়ই মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করলেও সেখানে হাফ ভাড়ার বিষয়টি ছিল না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত দেশে শহরে নির্দিষ্ট ‘এডুকেশন জোন’ থাকে। যেখানে সব স্কুল-কলেজ থাকে। ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। ছাত্র থাকে উত্তরা, পড়ে সায়েন্স ল্যাবে। বাসে চড়তে হয়। যানজট হয়। এ পরিস্থিতিতে সরকারকেই ভর্তুকি দিতে হবে। কারণ বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের।

এদিকে গতকাল অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে বিআরটিএ। ৪৩টি বাসকে ১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন সংস্থার ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২০টি ডিজেলচালিত ও ৩৫টি সিএনজিচালিত মিলে মোট ২৫৫টি বাস-মিনিবাস পরিদর্শন করেন সংস্থার ১০টি মোবাইল কোর্ট। তখন ৪৩টি ডিজেলচালিত বাসের বিরুদ্ধে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে রিট : এদিকে সরকারি-বেসরকারি গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মো. ইউনুস আলী আকন্দ জনস্বার্থে এ রিট করেন। আগামী রবিবার এ রিট আবেদনটি শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ইউনুস আলী আকন্দ বলেন, করোনার কারণে অভিভাবকদের আয় কমে গেছে। তারা স্কুল-কলেজের বেতন পরিশোধ করতেই হিমশিম খাচ্ছে। তাই ভাড়া অর্ধৈক নেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন যৌক্তিক।

রিট আবেদনে বলা হয়েছে- শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার খরচ সরকার বহন করে। কিন্তু অর্ধেক ভাড়ার বিষয়ে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা সংবিধানের ১৫ (১), ১৭ ও ২৮ (৪) ও ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। লেখাপড়ার পরিবর্তে সরকার শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে সংবিধানের ১৫, ১৭, ২৮ ও ৩১ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করছে। আবেদনে স্বরাষ্ট্র, নৌ, রেল ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশের মহাপরিদর্শককে বিবাদী করা হয়েছে। এর আগে ২২ নভেম্বর সংশ্লিষ্টদের লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছিলেন এ আইনজীবী। নোটিশের জবাব না পেয়ে রিট করা হয়।

advertisement
advertisement