advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আড্ডার রাজকুমার

আনজীর লিটন
২৬ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২১ ১১:১৮ পিএম
advertisement

করোনা ভাইরাসের কারণে তখন লকডাউন। এতে করে একদিকে ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খুলে গিয়েছিল ওয়েব জানালা। অনলাইনে মিটিং, অফিস, ক্লাস। কেনাবেচাও অনলাইনে। ভার্চুয়ালি সেমিনার। পাঠক পড়ছেন ই-বুক। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ! পারস্পরিক যোগাযোগ বা বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড়, স্মৃতিচারণ, গল্প গুজব সবই সম্ভব হয়েছে। সৃজনশীলতায় এসেছে নতুন গল্প, নতুন ছন্দ। এই শতাব্দীর ব্যক্তিরা পেয়েছেন নতুন অভিজ্ঞতা। করোনা আমাদের অনেক স্বজনকে কেড়ে নিয়েছে। কত কত প্রিয়জনকে আমরা হারিয়েছি। আবার নতুন স্বাভাবিক জীবন নিয়ে জেগে ওঠার তীব্র বাসনায় লকডাউনে অনেকে মেতেছেন সৃষ্টিশীল আনন্দে। এই আনন্দে আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন তার বিশুদ্ধ কবিতার ছন্দময় জগৎ। তিনি স্টালিন ভাই, কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। কবিতার ভাষা দিয়ে তিনি বিশ্বটা মুঠোয় ধরতে চেয়েছেন, পেরেছেনও। তথ্যপ্রযুক্তির বর্ণিল আয়োজনে সম্পৃক্ত হয়ে দেশ-মহাদেশ ছাড়িয়ে নির্মাণ করেছেন নিজস্ব কবিতার ভুবন। সাম্প্রতিককালে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের ফেসবুক স্ট্যাটাস আমাদের সামনে দাখিল করে ওই প্রমাণপত্র। প্রায় প্রতিদিন তার কবিতা অনূদিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, উড়িয়া, রুশ, জার্মান, চীনা, জাপানি, তুর্কিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত তার কবিতা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

কবিমাত্রই চিন্তাশীল মানুষ। তাকে নতুন বিষয়, ফর্ম, উপমা, শব্দ বিন্যাস, বাক্য গঠন নিয়ে ভাবতে হয়। আর এসব ভাবতে গেলে তিনি একটু আলাদা হয়ে যান অন্য সবার চেয়ে। অনুভূতিপ্রবণ, আবেগমথিত চিন্তায় আবিষ্ট কবি সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে নিশ্চয়ই ব্যতিক্রমী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাই তো কবিকে প্রতিবেশ, পরিপার্শ্ব, তার স্বপ্ন ও আড্ডায় বেশিমাত্রায় আক্রান্ত করে থাকে। প্রথাগত এই সমাজ, সময় ও মানবভাবনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন জীবন কাঠামো নির্মাণ করতে হবে- যেখানে মানুষের জয় সুনিশ্চিত। কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন সুনিশ্চিত জয়ের পথে হাঁটছেন।

advertisement

শিশুসাহিত্যের প্রতিও তার রয়েছে বিশেষ অনুরাগ। তাই তো তার হাতে দুলে ওঠে ছড়ার ছন্দ। ছড়ার বইও বেরিয়েছে তার। গদ্যশৈলীর নান্দনিক সৌন্দর্য লালন করে লিখেছেন গল্প-উপন্যাস। কিন্তু কবিতা তাকে সাহিত্যের অন্য শাখায় ভ্রমণ করতে দেয় না। বারবার তিনি আশ্রয় খোঁজেন কবিতার কাছে। কবিতা তার কাছে জীবনের আরেকটি সত্তা।

তার হাসিমুখটা প্রথম দেখেছিলাম ইত্তেফাকের দাদাভাইয়ের কক্ষে। চুরাশি-পঁচাশি সালের কথা। ওই মুহূর্তটি থেকে এ মুহূর্তটি পর্যন্ত স্টালিন ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের শক্ত ভিত একইরকম। তিনি তখন পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকতেন সলিমুল্লাহ হলে। আমি পড়তাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। যখনই ঢাকায় আসতাম, প্রায় সব সময় তার সঙ্গে আড্ডা চলত কখনো তার হলের রুমে, কখনো কোনো পত্রিকা অফিসে, কখনো বা রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে। দিন যায়, সময় যায়। সময়ের স্রোতধারায় পরিবর্তন হয় জীবন। এ পর্বে স্টালিন ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেট কিংবা কাঁটাবনের আড্ডায় কী এক আকর্ষণীয় বর্ণিল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে প্রায় প্রতিসন্ধ্যা কাটানো আমাদের নিয়মিত ঘটনা।

মনে পড়ছে, স্টালিন ভাই বিটিভিতে ‘তারুণ্য’ নামে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন। ছড়াকার বন্ধু ওবায়দুল গণি চন্দনকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের প্রায় প্রতিদিন দেখা হতো নজরুল ইনস্টিটিউটের অফিস কক্ষে। পকেটে পয়সা না থাকলে স্টালিন ভাইকে বলতামÑ আমাদের আজ মন খারাপ, পকেটে পয়সা নেই। মৃদু এক হাসি ছড়িয়ে চন্দন ও আমাকে এই বলে আশ্বস্ত করতেন যে, ‘আগামী অনুষ্ঠানে দুজনে ছড়া পড়বি।’ ওই সময় বিটিভিতে অনুষ্ঠান ধারণের দিন পাওয়া যেত সম্মানীর চেক। এর মানে, পাঁচশ টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল।

আমার পরিকল্পনা ও গ্রন্থনায় বিটিভির ‘আনন্দমেলা’য় একবার আয়োজন করা হয়েছিল কবিদের অভিনয় পর্ব। পরিবেশ সচেতনতাবিষয়ক ওই পর্বে অভিনয় করেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। তার সঙ্গে ছিলেন রবীন্দ্র গোপ, রেজাউদ্দিন স্টালিন, আসলাম সানী, ইলোরা গওহর ও ফারহা রুমা। বক্তব্যধর্মী ওই পর্বটি দারুণ প্রশংসা পেয়েছিল দর্শকের কাছ থেকে।

এ রকম কতশত স্মৃতির কথা জমে আছে স্টালিন ভাইকে নিয়ে। ভীষণ বিশ্বস্ত বন্ধু তিনি। বয়সে বড় হলেও কোনো বিভেদরেখা না টেনে অনায়াসে মিশে যান ছোটদের সঙ্গে। আবার এর উল্টোটাও আছে। বয়সে প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞজন প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তিনিও বন্ধুর মতো মিশতে জানেন। পোশাক-আশাকে পরিচ্ছন্ন, চিন্তাচেতনায় স্বচ্ছ। চিন্তাচেতনায় ইতিবাচক সত্তা নিয়ে স্টালিন ভাই প্রমাণ রেখেছেন, তিনি ভীষণ মানবিক কবি। কবিতার মতোই ভালোবাসেন নিজের জন্মদিন উদযাপন। জন্মদিনের আনন্দ অনুভূতি ছড়িয়ে দিতে চান কবি-বন্ধুদের কাছে, গানের শিল্পীদের কাছে, চিত্রশিল্পীদের কাছে, অভিনয়শিল্পীদের কাছে। তিনি বুকের গভীরে লালন করেন সৃজনশীল সত্তা, ভালোবাসেন সৃজনশীল মানুষকে।

বাংলা একাডেমির পুরস্কার পেয়েছেন কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। পুরস্কার পাওয়ার পর তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারভিত্তিক আড্ডায় মেতেছিলাম একদিন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন- কবিতার মধ্য দিয়ে বলতে চাই দেশের অসহায়, নির্যাতিত, ক্ষুধাতুর, ভূমিহীন, শ্রমজীবী মানুষের কথা। পৃথিবীর সব নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের কাছে দায়বদ্ধ আমি। আমার স্বজাতি, স্বদেশ ও পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছে দায়বদ্ধ। যারা সৎ, সাহসী ও সুন্দরের স্বপ্ন দেখেন- তাদের নিয়ে লিখতে চাই। তিনি কবিতার মতো করে বললেন- এখনো যেসব জলাভূমির ঠোঁটে চুম্বন পড়েনি, যে গাছের শাখায় চাঁদ বসেনি, যে মায়ের কোলে শিশু হাসেনি কিংবা যে কবিতা এখনো লেখা হয়নি; আমি সেই কবিতাই লিখতে চাই।

কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙেন আবার গড়েন। কবিতার মধ্য দিয়ে তৈরি করেন ‘আশ্চর্য আয়নাগুলো’। তিনি বিকশিত হয়েছেন মৌলিক সত্তা দিয়ে। কবিতার শব্দ, উপমা, ছন্দ, চিত্ররূপ, গভীরভাবে আত্মস্থ করেছেন। তাই তো তার একটি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। সততার সঙ্গে কবিতা চর্চা করে যাচ্ছেন। কবিতার মধ্য দিয়ে গল্প বলতে জানেন কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। ইতিহাস, মিথ, মানবিক সম্পর্ক, জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিত বিশ্বাস সভ্যতা, সংস্কৃতি- কোনো কিছুই কবির চোখ এড়ায়নি। তার বন্ধুভাগ্য দারুণ। তাই তো বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের স্টালিন ভাই সব সময় হয়ে ওঠেন আড্ডার রাজকুমার।

advertisement