advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

টর্চার সেলে নির্যাতন করত ‘ফাল্গুনীশপ’-এর সিইও

পণ্য না পেয়ে অর্থ ফেরত চাওয়া গ্রাহকের অভিযোগ

হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
২৬ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২১ ০২:৩৪ এএম
advertisement

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান খুলে অগ্রিম টাকা নিয়ে পণ্য না দিয়ে ভুক্তভোগীদের অস্ত্র দেখানোসহ বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাত একটি প্রতারক চক্র। চক্রটি তাদের নিজস্ব টর্চার সেলে লাঠিপেটা, বৈদ্যুতিক শকসহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে অফিস থেকে ভুক্তভোগীদের তাড়িয়ে দিত। চক্রের মূলহোতা ফাল্গুনীশপ ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পাভেল হোসেন ৫০-৬০ হাজার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এভাবে পণ্য দেওয়ার কথা বলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

বুধবার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সিইও পাভেল হোসেনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৪। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন সাইদুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল হাসান ও ফারজানা আক্তার মিম। অভিযানে ফাল্গুনীশপ ডটকমের অফিস থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড গুলি, ২৪ ক্যান বিয়ার, চার বোতল দেশি মদ, একটি প্রাইভেট কার, প্রতারণায় ব্যবহৃত কম্পিউটার, প্রিন্টার, বিপুল পরিমাণ এন-৯৫ মাস্ক, ১০০টি ইনভয়েস, ৩০টি চেক বই, ৮০টি সিল ও বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপনের স্ক্রিনশট জব্দ করেন র‌্যাব সদস্যরা। বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র‌্যাব ৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মোজ্জাম্মেল হক।

তিনি বলেন, ফাল্গুনীশপ ডটকম, অরিমপো ডটকম ও টেক ফ্যামিলি ডটকম নামে একাধিক ই-কমার্স সাইট খুলে নিত্যপণ্যের বাজার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে তা অনলাইনে বিক্রির জন্য প্রচার করে সাধারণ লোকজনদের আকৃষ্ট করত চক্রটি। পরবর্তী সময়ে সাধারণ লোকজন তাদের দেওয়া বিজ্ঞাপন দেখে স্বল্পমূল্যে পণ্য পাওয়ার আশায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। এভাবে চক্রের মূলহোতা পাভেল তার সহযোগীদের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।

র?্যাব ৪-এর অধিনায়ক আরও বলেন, ফাল্গুনীশপ ডটকম কারসাজির মূলহোতা পাভেল হোসেন প্রতিষ্ঠানটির সিইও। আর গ্রেপ্তার সাইদুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল হাসান ও ফারজানা আক্তার মিম তার অন্যতম সহযোগী। পাভেল ১৯৯১ সালে গোপালগঞ্জ জেলার সদর থানা এলাকায় জন্মগ্রহণ করে। আট ভাইবোনের মধ্যে সে চতুর্থ। পাভেল ২০০৭ সালে গোপালগঞ্জের স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এসএসসি, ২০০৯ সালে ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি ও ২০১৪ সালে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক পাস করেছে। ২০০৯ সালে এইচএসসি অধ্যয়নরত অবস্থায় সে অস্ত্রসহ র‌্যাবের কাছে আটক হয় ও তার বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় একটি অস্ত্র মামলা রয়েছে।

মোজাম্মেল হক বলেন, ২০১৪ সালে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রজেক্টে রাজবাড়ীতে ৩০-৪০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করে পাভেল। পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন ঠিকাদার হিসেবে কাজ করার সময় তার পরিচিত একজন তাকে অনলাইন ব্যবসা করার পরিকল্পনা দেয়। ২০১৯ সালের শুরুতে পাভেল, জনৈক দিদারুল আলম, কানিজ ফাতেমা ও রহমতুল্লাহ শওকত মিলে ফাল্গুনীশপ ডটকম নামে একটি অনলাইন বিজনেস প্ল্যাটফরম তৈরি করে। শুরুতে তারা উত্তরা এলাকায় একটি ভাড়া করা স্পেসে আউটলেট খুলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে। ব্যবসার শুরুতেই পাভেলের অন্য অংশীদাররা তার এই গ্রাহক ঠকানোর বিষয়টি বুঝতে পারেন ও তারা তার বিরুদ্ধে থানায় জিডি করে এফিডেভিট করে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে যৌথ ব্যবসা থেকে সরে যান।

পাভেলের অংশীদাররা এ বিষয়টি জয়েন্ট স্টক অথরিটিকেও অবহিত করেন। পাভেল তাদের নামে জাল সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে গ্রাহকদের প্রতারিত করত, এমনকি তাদের নাম ব্যবহার করে যৌথ নামে চেক পর্যন্ত ইস্যু করত। ২০২১ সালের মে মাসে প্রতারণার অভিযোগে কয়েকজন গ্রাহক পাভেলের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করলে পাভেল সিআইডির কাছে গ্রেপ্তার হয়ে ২১ দিন জেলে থেকে জামিনে এসেই আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কিছু গ্রাহক ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে অভিযোগ করলে অধিদপ্তর একাধিকবার ফাল্গুনীশপ ডটকমের আউটলেট বন্ধ দেয়। পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের জুলাইয়ে পাভেল খিলগাঁও থানার বনশ্রী এলাকায় অরিমপো ডটকম ও টেক ফ্যামিলি ডটকম নামে নতুন অফিসের আড়ালেই ফাল্গুনীশপ ডটকমের কার্যক্রম পরিচালনা করে। অরিমপো ডটকম ও টেক ফ্যামিলি ডটকমে নিজে এমডি ও তার স্ত্রী রিতা আক্তার চেয়ারম্যান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে।

র‌্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, প্রতারক চক্রের সদস্যরা করোনা মহামারীতে লকডাউন চলাকালে অনলাইনে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী স্বল্পমূল্যে বিক্রির চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। এই বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে ক্রেতারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিপুল পরিমাণ অর্ডার দিতে থাকে। পরবর্তী সময়ে প্রতারক প্রতিষ্ঠানটি কিছু ক্রেতাকে আংশিক, কিছু ক্রেতাকে নিম্নমানের পণ্য আবার কিছু ক্রেতার কোনো পণ্য সরবরাহ না করেই সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করে। যেসব ক্রেতা তার এই অনলাইন শপ ফাল্গুনীশপ ডটকমে পণ্যের অর্ডার করত তাদের সে পণ্যের মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করতে বলত। তখন সাধারণ লোকজন তার কথা সরল মনে বিশ্বাস করে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন গেটওয়ের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করত। সে পরবর্তী সময়ে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও অনলাইন গেটওয়ে থেকে টাকা অন্যত্র স্থানান্তর বা জমি ও প্লট কিনে টাকা লেয়ারিং করত। তিনি আরও বলেন, প্রতারণার কৌশল হিসেবে সে শুরু থেকেই তার অনলাইন শপ ফাল্গুনীশপ ডটকম ও ফেসবুক পেজ ফাল্গুনীবিডির মাধ্যমে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দাম নির্ধারণ করে তা অনলাইনে প্রচার করে সাধারণ লোকজনদের আকৃষ্ট করত। পরবর্তী সময়ে সাধারণ লোকজন তার দেওয়া বিজ্ঞাপন দেখে স্বল্পমূলে পণ্য পাওয়ার আশায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করত। চক্রের মূলহোতা পাভেল তার সহযোগীদের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ লোকজনের কাছ থেকে প্রতারণা করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ হাতিয়েছে।

ফাল্গুনীশপ ডটকমের ব্যবসায়িক অবকাঠামো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ২০১৯ সাল থেকে পাভেল হোসেনের নিজস্ব ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ৪ কোটির বেশি টাকা লেনদেন হয়েছে। তার নামে ফাল্গুনীশপ ডটকম, ফাল্গুনী শপ, ফাল্গুনী শপ বিডিসহ মোট ২৮টি নামসর্বস্ব কোম্পানির সন্ধান পাওয়া যায়। তবে ফাল্গুনীশপ ডটকম কোম্পানি ছাড়া বাকি ২৭টি কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পাভেল অনলাইন শপের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব না খুলে তার নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করে অন্যত্র স্থানান্তর বা জমি ও প্লট কিনে টাকা লেয়ারিং করত। পভেলের স্ত্রী পলাতক রিতা আক্তার (২৬) তার অন্যতম ব্যবসায়িক পার্টনার। বর্তমানে রিতা টেক ফ্যামিলি ডটকমসহ আরও সাত-আটটি কোম্পানি খোলার পাঁয়তারা করছে বলে জানা যায়।

পাভেলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও প্রতারণা মামলা রয়েছে। তার কাছে কোনো ভুক্তভোগী পণ্য অথবা তাদের পরিশোধ করা টাকা চাইতে তার অফিসে গেলে সে তাদের পণ্য ও টাকা ফেরত দিত না। উল্টো ভুক্তভোগীদের অস্ত্রসহ বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার নিজস্ব টর্চার সেলে লাঠিপেটা, বৈদ্যুতিক শকসহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে অফিস থেকে তাড়িয়ে দিত। অভিযানে ওয়্যার হাউস থেকে ৪২৩ কেজি চা পাতা, ৭১৫ কেজি চাল, ৪১২ কেজি মসুর ডাল, ২৬০ কেজি ফুলক্রিম মিল্ক, আটটি বাইসাইকেল, ৪৫০ লিটার সয়াবিন তেল, ২১৪ লিটার সরিষার তেল, ৫০ কেজি লবণ, ১১০ কেজি হুইল পাউডার, গ্লাস ক্লিনার, হারপিকসহ অন্য সরঞ্জামা জব্দ করা হয় বলেও জানান এই র‌্যাব কর্মকর্তা।

advertisement
advertisement