advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement

বিনিয়োগে দক্ষতা বাড়ানোয় কৌশল নিচ্ছে সরকার

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ

আবু আলী
২৮ নভেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২১ ১০:৪১ পিএম
advertisement

বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের মধ্য দিয়ে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে এখন চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটল বাংলাদেশের। স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশ থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর প্রস্তুতির সময় পাওয়া যাবে। সাধারণত প্রস্তুতির জন্য তিন বছর সময় দেওয়া হলেও মহামারী করোনার কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এ বাড়তি সময় দেওয়া হয়েছে। ফলে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছলে স্বল্প সুদে ঋণসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্ব সুবিধাও থাকবে না। তাই অভ্যন্তরীণ আয় বাড়িয়ে মানবসম্পদে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড।

বিষয়টি মাথায় রেখেই বিদ্যমান বিনিয়োগের দক্ষতা বাড়াতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিকভাবে দুটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে সহায়তা দিয়ে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। এ লক্ষ্যে চলতি বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রাথমিকভাবে বিদ্যমান বিনিয়োগের দক্ষতা বাড়ানো গেলেও উৎপাদন ও সেবার মান প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো সম্ভব।

জানা গেছে, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর

করা হবে। এ জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস প্রাপ্তিতে বিলম্ব, বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকরণে প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা, জমির সংকট দূর এবং উচ্চ ঋণের সুদ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য ২২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

অবকাঠামো খাত উন্নয়নে পাঁচ দেশের বিনিয়োগ আসা শুরু হয়েছে। প্রতিটি দেশের বিনিয়োগকারীর জন্য হবে পৃথক অর্থনৈতিক অঞ্চল। এই পাঁচ দেশ হচ্ছে চীন, জাপান, ভারত, রাশিয়া ও সৌদি আরব। সৌদি আরব ব্যতীত অন্য চার দেশের সঙ্গে ইতোমধ্যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগিরই সৌদি আরবের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসছে। ওই সফরে বাংলাদেশে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা দেবে সৌদি আরব।

বিনিয়োগ বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়নে ফাস্ট ট্র্যাকখ্যাত দশ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। শিল্পের চাকা সচল রাখতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এ ছাড়া ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারের এসব পদক্ষেপে দেশে বিনিয়োগ বাড়ছে। অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্থ-সামাজিক, প্রকৃত এবং রাজস্ব খাতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

এই পাঁচ দেশের সঙ্গে করা বিনিয়োগ-বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। গত কয়েক বছরে শুধু চীনের সঙ্গে শতাধিক চুক্তি করা হয়েছে। এসব চুক্তির মধ্যে রাজশাহী ওয়াসা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, কর্ণফুলী নদীর ওপর প্রস্তাবিত দ্বিতীয় রেল সেতু, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ভায়া রামু ও রামু থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঘুমধুম পর্যন্ত প্রস্তাবিত ডুয়েল গেজের রেললাইন নির্মাণ এবং তৃতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি নেটওয়ার্কের সহায়তা প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এসব চুক্তির তেমন কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। এ বাস্তবতায় এবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চুক্তি বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশ সফর করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ২৫-২৮ মে জাপান সফরকালে এবং ২০১৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বেশকিছু চুক্তি, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের ৬-১১ জুন গণচীন সফরকালে এবং চীনের প্রেসিডেন্ট ২০১৬ সালের ১৪-১৫ অক্টোবর বাংলাদেশ সফরকালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি, সমঝোতা স্মারক বিষয়ে সভা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের ৩-৬ জুন সৌদি আরবে দ্বিপাক্ষিক সফর করেন। এছাড়া তিনি গত ১৫-১৬ জুলাই আসেম সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য মালয়েশিয়া সফর করেন। ওই সময়ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চুক্তি সম্পন্ন করা হয়। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন- চীন, জাপান, রাশিয়া, সৌদি আরব, ভারত ও কোরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ আনার চেষ্টা চলছে। এ কারণে বিনিয়োগ-বাণিজ্য সংক্রান্ত যেসব চুক্তি করা হয়েছে তা দ্রুত বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণ করছে সরকার।

গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, এলডিসি থেকে আগেই বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে। এখন চূড়ান্তভাবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিল জাতিসংঘ। তবে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। তবে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক রয়েছে। গরিব দেশগুলোকে সহজ শর্ত ও কম সুদে ঋণ দেয় উন্নয়ন সহযোগীরা। এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে সস্তা ঋণ সুবিধা বাতিল হলেও তেমন অসুবিধা হবে না।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার এক মহান মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের যে অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন যাত্রা- এটি তারই একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বাংলাদেশ এমন একটি সময়ে স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে যখন সমগ্র দেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখাসহ মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্বে বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিকৌশল ও পদক্ষেপ প্রণয়ন করছে।