advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

সড়ক দুর্ঘটনায় এত প্রাণহানি এর শেষ কোথায়

সুরাইয়া সুবর্ণা
১ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০২১ ১১:০৬ পিএম
advertisement

বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজারো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। বেশিরভাগ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় চালক নিজে দায়ী। দেশের সম্ভাবনাময় প্রাণগুলো ঝরে যায় বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি চালানোর কারণে। এতে ক্ষতি হয় দেশের মানবসম্পদের। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় বেশিরভাগ সময় শাস্তি পায় না ঘাতক চালকরা। হয় না আইনের কঠোর প্রয়োগ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যানে দেশের ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অনিয়ন্ত্রিত গতির গাড়ি চালানোর কারণে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৬ হাজার ৬৮৬ মানুষ। তাদের মধ্যে ৭০৬ শিক্ষার্থী ও ৫৪১ শিশু রয়েছে।

একটু পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই ২০১৮ সালের বিশ্ব আলোড়ন করা সেই সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের সম্ভাবনাময় দুই শিক্ষার্থীর (রাজিব ও দিয়া) প্রাণ। এ ঘটনার পরিপ্রক্ষিতে নৌমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছিলেন নিহত শিক্ষার্থীদের সহপাঠীসহ দেশের সব স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। বিচারের দাবিতে আন্দোলন এবং সমাবেশ করা অবস্থায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ও চলমান গাড়ি-মোটরযান থামিয়ে গাড়িচালকদের জিজ্ঞাসাবাদসহ তাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে তারা দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে ট্রাফিক আইন পালন এবং সুষ্ঠুভাবে ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আন্দোলনের মুখে কোণঠাসা হয়ে অবশেষে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানো গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ প্রশাসন। এসব চিত্র আলজাজিরা, সিএনএনসহ অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং বিশ্ববাসীর কাছে নিন্দিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃতীয় মন্ত্রিসভায় একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করেন। ২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সংসদে আইন পাস হলেও তা প্রয়োগ ও কার্যকর হয়নি। এর পর ২০১৯ সালের নভেম্বরে আইনটির প্রয়োগ শুরু হলে উল্টো আন্দোলন শুরু করেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। ফলে আইন প্রয়োগের সময়সীমা ২০২০ পর্যন্ত বর্ধিত হলেও পরে বাস্তবায়ন হয়নি। লাগাম টেনে ধরা যায়নি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের।

কিছুদিন পরই ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর ওয়ারী স্ট্রিট এলাকায় ওয়ারী উচ্চবিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী আবির হোসেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। ওয়াসার গাড়িচাপায় পড়ে মাথা চ্যাপ্টা হয়ে যায় তার। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে চালক পালিয়ে যায়। এ দুর্ঘটনার প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেন ওয়ারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পর পর ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনায় টনক নড়েনি ওপর মহলের। ফলে দিন দিন বেড়েই চলেছে চালকদের বেপোরোয়া আচরণ। মানুষকে রাস্তায় ফেলে পোকামাকড়ের মতো পিষে মেরে ফেলা তাদের কাছে সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্ধেক ভাড়া ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মধ্যেই গত সোববার রাজধানীর রামপুরায় অনাবিল পরিবহনের বাসের ধাক্কায় স্কুলছাত্র মাঈনুদ্দীন দুর্জয় নিহত হয়। এছাড়া গত ২৪ নভেম্বর রাজধানীর বুকে ঝরে গেল আরেক সম্ভাবনাময় প্রাণ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। ঘটনাস্থল থেকে তাকে হাসপাতালে নিলে মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা কেন্দ্র করে নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক নিরাপত্তা ও সহপাঠী নিহতের বিচার দাবিতে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’; ‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে ব্যানার এবং প্ল্যাকার্ড নিয়ে মতিঝিলে অবস্থান করেন। তার পর কয়েক হাজার শিক্ষার্থী গুলিস্তান নগরভবন ঘেরাও করে জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেন। ফার্মগেট মূল সড়কে হলিক্রস, বিএফ শাহীন কলেজ, আইডিয়াল কমার্স কলেজ, সেন্ট জোসেফ কলেজ, তেজগাঁও কমার্স কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান কলেজের হাজারো শিক্ষার্থী সড়কে নিরাপত্তা ও বিচার দাবিতে শক্ত অবস্থান নিয়ে আন্দোলন কর্মসূচি এবং বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। আন্দোলনটি ছিল ২০১৮ সালের করা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতিরূপ। তাদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মোটরযানের লাইসেন্স ও অন্য কাগজপত্র চেক করতে এবং জরুরি সেবাগুলোকে নিরাপদে যেতে দিতে দেখা যায়। তারা জানান, সুনাগরিকবোধ থেকেই তারা আন্দোলন করছেন। গত ২৭ নভেম্বর রাজধানীর শাহবাগ-মিরপুর সড়ক ও ধানম-ি ২৭ নম্বর সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সম্পর্কে ধানম-ি থানার ওসি মো. ইকরাম আলী জানান, ধানম-ি ২৭ নম্বরে ছাত্রছাত্রীরা বাসে হাফ ভাড়া কার্যকরসহ নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নিহতের বিচার দাবিতে অবস্থান নেন। অবরোধ করে রাখেন যান চলাচল। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ীর গোলচত্বরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোপ করেন প্রায় ১০টি কলেজের শিক্ষার্থী।

ওয়ারী জোনের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার দ্বীন মোহাম্মদ শিক্ষার্থীদের বলেন, ১ ডিসেম্বর সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছু করা উচিত হবে না। তিনি শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সেদিনের জন্য আন্দোলন স্থগিত করাতে সক্ষম হন। এদিকে ঘটনা তদন্ত করতে ডিএসসিসি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। গাড়িচালক হারুন মিয়াসহ আরও ২ জনকে কর্মচ্যুত করেছে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ।

২০১৮ সালের নজিরবিহীন নিরাপদ সড়ক ও বিচার দাবিতে আন্দোলনের মুখে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি সরকার বাস্তবায়ন করেনি বলে জানান শিক্ষার্থীরা। এবারও তারা সরকারকে এক সপ্তাহ সময় দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এই ৯ দফা দাবি আদায় ও প্রজ্ঞাপন জারি না হলে স্কুল-কলেজ বন্ধ রেখে বিআরটিএ ঘেরাও করেন শিক্ষার্থীরা। গত ২৯ নভেম্বর সোমবার রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি মেনে না নিলে তারা গণজোয়ার তৈরি করবেন বলে দৃঢ়কণ্ঠে জানান। পর পর ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাপ্রবাহ কতদিন চলবে, তা সবার অজানা। জনমনে বাসা বেঁধেছে উদ্বেগ। ছেলেমেয়েদের একা স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন অভিভাবকরা। শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে গিয়ে পড়ালেখা করে মেধাবী মানুষ হয়ে দেশের সম্পদে পরিণত হবেন। জাতির কর্ণধার হওয়ার বদলে যদি রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়, তা হলে দেশের এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। শিক্ষার্থীদের এ বিক্ষোভ ও দাবি কার্যকর হবে বলে সবার আশা।

সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ এবং প্রণয়ন করতে হবে কঠোর আইন- যাতে আর কোনো প্রাণ অকালে ঝরে না যায়। কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। অপ্রাপ্ত-বয়স্করা যাতে গাড়ি চালাতে না পারে এবং প্রশিক্ষণ ছাড়া কেউ যেন লাইসেন্স না পায়, এদিকে নজর রেখে বিআরটিএর জরুরি ও সুষ্ঠু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। হেলপার দিয়ে এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালোনো বন্ধ করতে হবে। এ জন্য প্রশাসানের তদারকি যেমন জরুরি, তেমনি চালক নিয়োগ দিতে গাড়ির মালিকদের সর্তকতাও অতিগুরুত্বপূর্ণ।

দিন দিন অনুন্নত হয়ে পড়া ট্রাফিকব্যবস্থা দুর্ঘটনার জন্য বেশি দায়ী। এ অবস্থায় উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও সময়োপযোগী ট্রাফিকব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত- যাতে যত্রতত্র কেউ রাস্তা পারাপার হতে না পারেন। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ট্রাফিক আইনসহ সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা আরও ভালোভাবে তৈরি করতে হবে।

সুরাইয়া সুবর্ণা : সংবাদকর্মী

advertisement
advertisement