advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

বিজয়ের ৫০ বছর
কণ্ঠযোদ্ধাদের চোখে দেশ

তারেক আনন্দ
৪ ডিসেম্বর ২০২১ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৪ ডিসেম্বর ২০২১ ০৯:০৮ এএম
সুজেয় শ্যাম, কল্যাণী ঘোষ, রফিকুল আলম, তিমির নন্দী ও বুলবুল মহলানবীশ। পুরোনো ছবি
advertisement

একটি পতাকার বয়স ৫০ বছর। একটি মানচিত্রের জন্য কত ত্যাগ, তিতিক্ষা, কত রক্ত! ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে সোনার বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ। বিজয়ের ৫০ বছর উপলক্ষে স্বপ্নের বাংলাদেশকে নিয়ে বলেছেন কণ্ঠযোদ্ধারা।

তাদের কথাগুলো তুলে ধরেছেন- তারেক আনন্দ

 

বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার

স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা পূরণ করতে পারিনি

সুজেয় শ্যাম

আমার বাংলাদেশ, সোনার বাংলা দেশ। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা, বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখেছিল সোনার বাংলার, সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। একা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে দেশটাকে সুন্দর করা সম্ভব নয়। আমাদের মধ্যে রেষারেষি, হানাহানি, মারামারি হোক সেটা আমরা কোনো দিন চাইনি। আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকব সে আশায়। প্রায়ই দেখি অরাজকতা।

এতকিছুর মধ্যেও দেশ আজ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সারা পৃথিবীতে আমাদের নাম, প্রধানমন্ত্রীর নাম; কিন্তু আমরা সেটার ফল ভোগ করতে পারছি না নিজেদের জন্য। আশা করি আমরা যে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম সেটা আগামীতে হবে। তখন আমরা হয়তো থাকব না।

আর আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা, বিশেষ করে কণ্ঠযোদ্ধারা- আমাদের ঠিক মূল্যায়ন হয়নি। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রকে আমরা যেভাবে দেখতে চেয়েছিলাম, সেটা হয়নি। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র যদি না থাকত তা হলে আমাদের দেশ এত দ্রুত স্বাধীন হতো না। খবরা-খবর থেকে শুরু করে আমাদের তেজদীপ্ত গান দেশ স্বাধীনে যে ভূমিকা রেখেছে সেই অর্থে আমাদের মূল্যায়ন করা হয়নি- এই একটা দুঃখ রয়ে গেলো। আশা করি সামনে হবে, আমরা হয়তো থাকব না। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অনেক শিল্পী মারা গেছেন। বেশিরভাগই অসুস্থ; কিন্তু আমাদের সেভাবে দেখা হচ্ছে না। সবাই ভালো থাকুক। বিজয়ের ৫০ বছরে আমার প্রত্যাশা- বঙ্গবন্ধু যেমন সোনার বাংলাদেশ চেয়েছে। সেই সোনার বাংলায় পরিণত হোক আমার বাংলাদেশ।

 

বিজয়ের ৫০ বছর পালন করছি, এটাই বিশাল ব্যাপার

কল্যাণী ঘোষ

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। আমার ক্ষতটা সেই জায়গায়- অন্য কোনো গোষ্ঠী যদি দেশ চালাত তা হলে আমার কোনো দুঃখবোধ থাকত না। আজ অনেকে ভালো আছেন। যারা সরকারের চাটুকারিতা করতে পারে তারা একটু বেশিই ভালো আছেন। আমি কল্যাণী ঘোষ, দেশের জন্য কতটা নিবেদিত ছিলাম সেটা এই সময়ের অনেকেই জানেন না। সরকারের তরফ থেকে গত সাত-আট বছর কোনো খোঁজখবর রাখা হয় না। আগে সব অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেতাম। এখন রাষ্ট্রীয় কোনো প্রোগ্রামে ডাকা হয় না। অনেকের হাতেই রাষ্ট্রীয় পদক তুলে দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু আমার কথা হলো- যারা রাষ্ট্রের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি তাদের কথা ভুলে গেলে হবে না। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পীরা আমার কাছে মনে হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই আজ অবহেলিত। যা-ই হোক, নিজের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কথা বলতে চাই না। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা বিজয়ের ৫০ বছর পালন করছি- এটাই অনেক বিশাল ব্যাপার। ভালো থাকুক প্রিয় মাতৃভূমি। ভালো থাকুক দেশের প্রতিটি মানুষ।

 

ছোট্ট একটা দেশ সারা পৃথিবীর কাছে পরিচিত

রফিকুল আলম

আমাদের অর্জন বিশাল বড়। আমরা ভৌগোলিক অবস্থানে ছোট্ট একটা দেশ আজ সারা পৃথিবীর কাছে পরিচিত- এটাই তো একটা বড় অর্জন। অর্জনের পেছনে যিনি আছেন, যিনি ছিলেন এবং তিনি থাকবেন সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য, সেই দীর্ঘদেহী, প্রায় ছয় ফুট লম্বার সুপুরুষ, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা বলি তো আমরা, বিজয়ের ৫০ বছরের এই অর্জনের প্রেক্ষিতে আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধু হচ্ছে সমগ্র বাংলাভাষাভাষী মানুষের রাজা। এর বিশ্লেষণ অনেক বড়। এত বড় পৃথিবীতে ছোট্ট একটা জনপদ পরিচিতি লাভ করেছে- এটাই বিড়াট অর্জন। আমি দেশকে এভাবেই দেখি।

 

একসঙ্গে দেশ স্বাধীন করতে পারলে একসঙ্গে কেন

থাকতে পারব না

তিমির নন্দী

আমরা একাত্তরে যুদ্ধ করেছি দেশকে স্বাধীন করার জন্য। তখন তো ভাবিনি যে, এভাবে আলবদরের বংশধররা দেশকে ছিন-ভিন্ন করবে, বিএনপি নামের একটা সংগঠনের জন্ম হবে, তার পর তারা বোমা মারবে, জাতীয় সম্পদ নষ্ট করবে- এসব তো ভাবিনি কখনো। নরেন্দ্র মোদির আসা নিয়ে দেশে হট্টগোল করল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেল স্টেশন জ্বালিয়ে দিল- এসব হবে সেটা কি আমরা ’৭১ সালে ভেবেছিলাম?

আমরা যুদ্ধ করেছি দেশকে স্বাধীন করার জন্য। বঙ্গবন্ধুকে ছিনিয়ে আনার জন্য। আমরা জানি যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। আমরা নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলব, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করব, আমাদের একটা মানচিত্র হবে, জাতীয় পতাকা হবে। বঙ্গবন্ধু হচ্ছে আমাদের নেতা। আমাদের মাথায় এ ছাড়া আর কিছু ছিল না। বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের, আমরা তার ডাকে দেশকে স্বাধীন করব- এটাই ছিল আমাদের লক্ষ্য।

বাংলাদেশের বিজয়ের ৫০ বছর পরও পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা আছে। এবং তারা দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা সম্পদ ধংশ করে, মানুষকে জ্বালিয়ে দেয়, প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়ন মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত কাজ করছেন। তারা দেশের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টিতে নানা ধরনের পাঁয়তারা করছে। যারা বাংলাদেশকে চায় না, যারা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান চায় তারা ওই দেশে চলে যাক। আমার স্পষ্ট বক্তব্য- তাদের এই দেশে থাকার কোনো দরকার নেই। বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষ দেশ চেয়েছেন। এই দেশকে স্বাধীন করেছে সব ধর্মের মানুষ। অতএব তারা বলতে পারে না যে, এই দেশটা শুধুই তাদের। একসঙ্গে যদি স্বাধীন করতে পারি, তা হলে দেশে কেন একসঙ্গে থাকতে পারব না? কেন আমাদের কথায় কথায় শুনতে হবে তোমরা ভারতে চলে যাও!

 

এখন আমরা মধ্যম

আয় থেকে উন্নত দেশের

দিকে যাচ্ছি

বুলবুল মহলানবীশ

কোনো প্রাপ্তির আশায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি। দেশকে স্বাধীন করার চিন্তাটাই মাথায় ঘুরছিল। এই ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমরা যে সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে পারছি, এটাই তো আমাদের বিশাল একটা অর্জন। এটাকে আমি এভাবেই বিচার করি। রাষ্ট্রীয় সম্মান পেলাম কি পেলাম না, আমাদের আর্থিক সুবিধা হলো কি হলো না; সেটা অন্য বিষয়। আমরা বিজয় অর্জন করেছি এমন একটা নৃশংস বাহিনীর কাছ থেকে, সেটাতো জনযুদ্ধ ছিল, তাই না? জনযুদ্ধ করে আমরা যে বিজয় অর্জন করতে পেরেছি, বিজয়ের ৫০ বছর উপলক্ষে আমি এটাই বিচার করব- আমাদের প্রাপ্তিটা অনেক। প্রাপ্তি বলতে আর্থিক কথাটা যদি বলি, সেটা অনেক ঘাটতি আছে। এখন আমরা মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশের দিকে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী যে পথে হাঁটছেন সেটা হয়তো কখনো কখনো আমাদের মতের সঙ্গে মেলে না। উনি যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, সেটা তো আমাদের বলতেই হবে। তার যে মাতৃত্বসুলভ একটা মন আছে, দেশের মানুষকে সন্তানের মতো দেখা, সেটা কিন্তু আমি অনেক বড় করে দেখি। আমাদের অর্জনের ক্ষেত্রে, অনেক সময় মনে হয়, আমরা যে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে হাঁটছি, সেই জায়গায় কিছু কিছু ঘাটতি অবশ্যই রয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু সংবিধান রচনার সময় যে চারটি স্তম্ভের ওপর জোর দিয়েছিলেন সেটির দুটি স্তম্ভই এখন কার্যকর করার মতো নয়। তা হলো- সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই জায়গা থেকে আমাকে আহত করে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো এমন একটা গোষ্ঠীদ্বারা পরিবেষ্টিত, যার জন্য অনেক সময় অনেক পদক্ষেপ তিনি নিতে পারেন না বলে আমার বিশ্বাস।

advertisement
advertisement