advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

পুতুল আপা ও কয়েকটি কথা

জাকির হোসেন জুমন
৮ ডিসেম্বর ২০২১ ০৯:৩০ পিএম | আপডেট: ৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১০:২৭ পিএম
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
advertisement

কপ সম্মেলনের প্রথম দিন সকালের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ কয়েকটি মিটিংয়ের জন্য রওয়ানা করলেন। ঠিক সেই সময় আমি বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে আসলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম প্যাভিলিয়নে ভেতরের কক্ষে অনেক লোকের আনাগোনা। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই পাশ থেকে একজন বললেন- পুতুল আপা এখানে ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের কর্মকর্তাদের নিয়ে মিটিং করছেন। কোনো কারণ ছাড়াই পুতুল আপার মিটিং রুমে একটু পরপর লোকজন প্রবেশ করছেন আর বের হচ্ছেন। যদিও আমাদের দেশের কালচারে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যাটফর্মে বিদেশিদের সঙ্গে মিটিংয়ে বিষয়টি দৃষ্টিকটু লাগছিল। পুতুল আপাও স্বভাবগত ভদ্রতার কারণে কাউকে কিছু বলতে পারছিলেন না। এই মিটিং রুমে পুতুল আপার সম্মতিক্রমে আমিও প্রবেশ করলাম। পুতুল আপার সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করে মিটিং শেষ পর্যন্ত অবস্থান করি।

বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে যারা কপ সম্মেলনে এসেছিলেন তাদের প্রায় অনেকেই জেনে গিয়েছেন যে পুতুল আপা এখানে আছেন। তাই লোকজনের সমাগম বেশি ছিল।

এতক্ষণে ঘড়ির কাটা বিকেল ৪টায়, সামনে দাঁড়ানো দুজন বিদেশি ভদ্রলোক, সঙ্গে টিভি ক্যামেরা। সাংবাদিকরা পুতুল আপার সাক্ষাতকার নিলেন। পুতুল আপার সাক্ষাতকার দেওয়ার দক্ষতায় আমি মুগ্ধ হলাম। কোনো প্রশ্নের উত্তর দ্বিতীয়বার চিন্তা করে দিতে হয়নি তাকে। পুরো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্নের উত্তর দিলেন। তার কণ্ঠে ছিল নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদের কথা। আমার মনে হয়েছিল, বিশ্বের প্রতিটি বাস্তুচ্যুত মানুষের এক একটি কষ্টের গল্প যেন তুলে ধরেছেন তিনি। এরপর আমি আরও অবাক হলাম পুতুল আপাকে একটি প্রশ্ন করে। বিকেল পাঁচটা বাজে। আমি জানতে চাইলাম- দুপুরের খাবার খেয়েছেন কিনা? তিনি বললেন সময়ই পাননি। তখন রুমের বাইরে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী অপেক্ষায় আছেন। তিনি চাইলেও দ্রুত বের হয়ে যেতে পারবেন না খাবারের জন্য। সিদ্ধান্ত হলো- শুভাকাঙ্খীদের সবার সঙ্গে দেখা করেই যাবেন তিনি। সবাইকে লাইনে দাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ করলাম। প্রত্যেকের সঙ্গে ধৈর্য সহকারে হাস্যজ্জ্বল ভাবে কথা বললেন পুতুল আপা। তারপর আমি আর পুতুল আপা হাঁটা শুরু করলাম। পুতুল আপা খুব স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এতে নিরাপত্তার মধ্যে এতটা স্বাভাবিক থাকতে চান সেটা না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। পুতুল আপার সঙ্গে খাওয়ার অভিজ্ঞতাও হলো। আমরা কফিসপে গিয়ে কফি নিলাম। এই ফাঁকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বললাম দীর্ঘ সময়।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন সকালে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রোগ্রাম ছিল স্কটল্যান্ড প্যাভিলিয়নে। আমরা সবাই গিয়ে ঐখানে উপস্থিত হলাম। প্রোগ্রাম শুরুর একটু পর গোলাপী রংয়ের জামদানী শাড়ি পরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন পুতুল আপা। সামনের সারিতে বসলেন। মনোযোগ সহকারে পুরো মিটিং জুড়ে সবার বক্তব্য শুনলেন তিনি। এ প্রোগ্রাম শেষ না হতেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অন্য মিটিংয়ে উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। এক এক করে পুতুল আপার সঙ্গে অনেকগুলো প্রোগ্রামে উপস্থিত হলাম। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে উনার যে সম্পর্ক তা আমাকে অনেক বিস্মিত করেছে। সবাই হাসি মুখে প্রতিটি প্রোগ্রামে পুতুল আপার সঙ্গে কুশলাদিক বিনিময় ও স্বাগত জানালেন। প্রিন্স চার্লস, বরিস জনসন, বিল গেটস, জন ক্যারিসহ বিশ্বের প্রায় সকল নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে আপার। এটা নিশ্চয়ই বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদস্বরুপ।

পুতুল আপা আর আমি একসঙ্গে খাব। অনেক ঝক্কি ঝামেলার পর আপাকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে আমি রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনতে লাইনে দাঁড়ালাম। লাইনে প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড়ানোর পর আমি কাউন্টারে এসে খাবার অর্ডার করলাম। পুতুল আপা আমাকে আগেই বলে দিয়েছিলেন আমি যেনো উনার জন্য মাছ বা ভেজিটেবল জাতীয় খাবার নেই। আমি খাবার নিয়ে আসলাম এবং এরপর যা হলো তা অবিশ্বাস্য। পুতুল আপা চেয়ার থেকে উঠে আমাকে বললেন তুমি অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলে; এখন তুমি একটু বসো। আমি হতবাক- আপার এমন আচরণে। পুতুল আপার পরের মিটিংয়ের সময় হয়ে যাওয়ায় খাবার খাওয়া হলো না। আপা বললেন- খাবার নষ্ট করা যাবে না। আমরা একটি ব্যাগে করে খাবারগুলো নিলাম। এরমধ্যে আবার আপার সঙ্গে অনেকে ছবিও তুললেন। একটুও বিরক্তবোধ করেননি তিনি। পুতুল আপার কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগটি ছিল। আমি শত চেষ্টা করেও ব্যাগটি আমার কাছে নিতে পারেনি। আপা বললেন- আমি নিজের কাজ নিজে করতেই পছন্দ করি। তাছাড়া আমার ব্যাকপ্যাক তুমি কেন নেবে- এটা দৃষ্টিকটু দেখায়। পুতুল আপার প্রতিটি আচরণে আমি মুগ্ধ হয়েছি। শুধু তাই নয়, আমার পরিবার, এলাকার খোঁজ-খবর নিলেন। দেশ নিয়ে বিভিন্ন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কিছু কথাও শেয়ার করলেন। বিশেষ করে উনার জীবনের নানা শিক্ষণীয় ব্যাপারগুলো আমাকে বললেন। আমি অভিভূত হয়েছি এবং অনেক শিখেছি।

পুতুল আপার যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আবেগতাড়িত করেছে; সেটি হলো- একজন বাঙালি নারী হয়ে কতটা বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। আজকের এই জায়গায় আসতে সেই যাত্রাপথ কতটা কণ্টকপূর্ণ ছিল- তা আমার সঙ্গে শেয়ার করেছেন পুতুল আপা। যে বিষয়ে তিনি কথা বলতে চাননি- তা হলো রাজনীতিতে আসার আগ্রহ বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে। অনেক চেষ্টা করেও এ বিষয়ে জানতে পারেনি।

কনফারেন্সের তৃতীয় দিন। সকালে কনফারেন্স ভেন্যুতে আসতে আমাদের একটু দেরি হয়। মন্ত্রী মহোদয়রা গিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাতে। এসেই দেখি মিটিংয়ে পুতুল আপা উপস্থিত। মিটিং শেষ করে পুতুল আপা কয়েকটি সাক্ষাতকার দিলেন। আপার বিনম্র কথার মাধ্যমে জ্ঞানগর্ভ শব্দচয়নে সাংবাদিকরা উদ্বেলিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যার সাথে কথা বললে মনে হয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছি। যার ভাবনা বা পরিকল্পনা শুনলে মনে হয় বিশ্ব নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ অংশীদার। যিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে। যার ধমনীপ্রবাহে বাংলাদেশের গল্পগাথা। তার কাছে যদি আসে আমাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তাহলে দেশ হবে বহির্বিশ্বের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সবকিছুর পর একটি বিষয় সত্য আর সেটা হচ্ছে রক্ত কথা বলে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আলাদা কিছু গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন বিধায় উনার যোগ্য নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন, স্বার্বভৌম দেশ।আর তারই রক্তের ধারা বহমান তার বংশের প্রতিটি মানুষের শরীরে। চলনে-বলনে স্বাভাবিক হলেও উনাদের মস্তিস্কের উর্বরতা বা ধারণক্ষমতা কিংবা চিন্তা-ভাবনার পরিধি অনেক অগ্রগামী। দেশ নিয়ে উনাদের পরিকল্পনা আমাদের প্রত্যাশা থেকেও অত্যাধুনিক। তাইতো তরুণ প্রজন্মের অগাধ বিশ্বাস- ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার সবটুকু জুড়েই বঙ্গবন্ধু পরিবার। আজ ৯ই ডিসেম্বর। প্রিয় পুতুল আপার জন্মদিন। আমি দোয়া করি- বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ তাকে জানার সুযোগ যেন পায়। পুতুল আপার দীর্ঘায়ু ও কল্যাণময় জীবন কামনা করি। শুভ জন্মদিন শ্রদ্ধেয় সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আপা।

লেখক : জাকির হোসেন জুমন, তরুণ উদ্যোক্তা ও রাজনৈতিক।

advertisement
advertisement