advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

মানুষই মানুষকে শত্রু করে তুলেছে

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
১৩ জানুয়ারি ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২২ ০৯:৩৯ এএম
advertisement

দেশে নেশাগ্রস্তদের সংখ্যা বাড়ছে। হতাশায় বাড়ে। মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতায় বাড়ে। বাড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার দরুনও। টাকা-পয়সা লেনদেনের কারণে। এমনকি পুলিশের লোকদেরও মাদক ব্যবসার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা ঘটে। মাদকের নেশা নিরাময়ের জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এখন সব দেশেই মাদক আছে, তাই চিকিৎসার কেন্দ্রও রয়েছে। বাংলাদেশেও নিরাময়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে বৈকি। তবে সংখ্যায় তারা অপ্রতুল এবং ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত দুর্বল। মাদক নিরাময়কেন্দ্রের তুলনায় মানসিক রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা আরও সামান্য। মনের চিকিৎসায় যে কেবল ওষুধপত্র দিলেই সম্পন্ন হয় তা তো নয়। যত্ন ও পরামর্শের দরকার পড়ে। কার্যকর পরামর্শ দিতে পারেন শুধু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাই। জানা গেছে, দেশের লোকসংখ্যা যেখানে কমপক্ষে ষোলো কোটি, দুই কোটির মতো লোক যেখানে মানসিক রোগে আক্রান্ত, সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২৭০ জন। অনুপাতটা তা হলে কেমন দাঁড়ায়? জানা যাচ্ছে, আমাদের চিকিৎসা-শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে মানসিক রোগকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয় না। যুগটা বিশেষজ্ঞের, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ খুবই প্রয়োজন। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যে মানসিক রোগ চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ হবে তার প্রস্তুতি সে আগেভাগে নিতে পারে না। ফলে বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়ে না। পাঠ্যসূচির এই ভারসাম্যহীনতা বহুকাল ধরে চলে আসছে; জগৎ বদলেছে, কিন্তু পাঠ্যসূচির প্রসারতা বৃদ্ধি পায়নি।

ভাবখানা এ রকমের যে, যেখানে শরীরই বাঁচে না সেখানে আবার মন নিয়ে টানাটানি! মানসিক রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা কেবল যে অকিঞ্চিৎকরই তা নয়, কোথাও কোথাও রীতিমতো ভয়াবহই বটে। কতটা যে ভয়াবহ হতে পারে তার একটি ছবি ধরা পড়েছে একজন রোগীর মৃত্যুতে। তিনি একজন পুলিশ অফিসার। বিষণœতায় ভুগছিলেন। বিষণœ হওয়ার আরও কারণ হয়তো ছিল, মূল কারণ মনে হয় চাকরিতে উন্নতি না হওয়া। সহকর্মীরা প্রমোশন নিয়ে এবং তাকে ডিঙিয়ে ওপরে উঠে গেছেন, তিনি পারেননি। ফলে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিলেন। চিকিৎসার জন্য তাকে রাজধানীর সরকারি মানসিক চিকিৎসা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকরা বলেছেন, তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। কোন হাসপাতালে? সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করলেই চলত; কিন্তু সেখানে ভর্তি না করে পাঠানো হয়েছে প্রাইভেট ক্লিনিকে। কেন পাঠানো হলো? হাসপাতালের লোকরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে ভিড় বেশি, করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা, এসব ভেবে রোগীর আত্মীয়রাই সরকারি হাসপাতাল পছন্দ করেননি। রোগীর পক্ষের লোকদের অভিযোগ, ভর্তি করতে উৎসাহ দেখানো হয়নি; প্রাইভেট ক্লিনিকের কথা বলা হয়েছে। অন্তরালে নাকি আর্থিক লেনদেনের ব্যাপার আছে।

মানসিকভাবে কেউ অসুস্থ হলে পারতপক্ষে ব্যাপারটাকে পাত্তাই দেওয়া হয় না। কারণ আছে। তিনটি কারণের কথা জানা যায়। প্রথম কারণ মানসিক রোগীকে সামাজিকভাবে হেয়জ্ঞান করা হয়ে থাকে। রোগী তো নয় যেন আত্মগোপনকারী অপরাধী। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসাকেন্দ্রের অভাব। তৃতীয়ত, রোগী ও তার আত্মীয়স্বজনের অসচেতনতা। তবে অসচেতন তারা এমনি এমনি হন না, হতে বাধ্য হন। শরীরের চিকিৎসা নিয়েই তারা কাতর থাকেন, এর পর আবার মনের ভেতর রোগ ঢুকেছে এমনটা মানলে বিপদ বাড়ে। যতক্ষণ পারা যায় উপেক্ষা ও অপেক্ষা করাটাই ভালো, ভাবেন তারা।

মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে কেউ কেউ আত্মহত্যা করেন, যে প্রসঙ্গটা একটু আগে এসেছে আমাদের এ লেখায়। আত্মহত্যা মেয়েরাই অধিক করে ছেলেদের তুলনায়। কারণ সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। পিতৃতান্ত্রিকতা আগের কালেও ছিল। ইতোমধ্যে সমাজে অনেক উন্নতি ঘটেছে, কিন্তু পিতৃতান্ত্রিকতার অবসান ঘটেনি। নারীর স্বাধীনতা বহু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথাও কোথাও মেয়ে-পুরুষে ভেদাভেদ ঘুচেই গেছে। কিন্তু মেয়েদের নিরাপত্তা এতটুকু বাড়েনি। যুদ্ধ হোক কী প্রাকৃতিক বিপর্যয় হোক, মেয়েরাই ভোগে সর্বপ্রথমে ও সর্বাধিক। এই যে করোনার আক্রমণ, এ তো যুদ্ধের মতোই ঘটনা। যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধেও মেয়েদের ওপর অত্যাচারটাই অধিক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এসব বিষয়ে খবর রাখে। তারা বলছে, করোনাকালে নারী নির্যাতন রীতিমতো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তারা একটা হিসাবও দিয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, এ বছর নারী নির্যাতন শতকরা দশ বা বিশ ভাগ নয়, সত্তর ভাগ বেড়েছে। এই বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয়, তবে অবশ্যই উদ্বেগজনক। করোনা সব মানুষেরই ক্ষমতার হ্রাস ঘটিয়েছে, অত্যন্ত ধনী ব্যবসায়ীদের ছাড়া; তাই যার যতটা ক্ষমতা আছে সেটা প্রয়োগ করার আগ্রহটার বৃদ্ধি ঘটেছে। পুরুষ মানুষের সুবিধা বেশি, সুযোগটা তাই তারা বেশিই পেয়েছে। প্রাপ্ত সুযোগ কোথায় আর তেমন কাজে লাগাবে? হাতের কাছে মেয়েদের পায়, প্রয়োগলিপ্সা সেখানেই কার্যকর করে; আর ভোগের কামনা তো রয়েছেই।

চরিতার্থতা না পাওয়াটা বড় কঠিন বেদনা। এটি বহন করতে গিয়ে তারাই বিশেষভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে যারা স্পর্শকাতর। জীবন তাদের জন্য দুঃসহ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। যেটা কবি জীবনানন্দ দাশ দেখিয়েছেন তার একাধিক কবিতায়। ‘আট বছর আগের একদিন’ নামের কবিতাটিতে যে লোকটি ‘এক গাছা দড়ি হাতে গিয়েছিল তবু একা-একা’ এবং ফাঁস দিয়ে শেষ করে দিয়েছিল নিজেকেই, তার জীবনে জাগতিক কোনো অভাব দৃশ্যমান ছিল না। এমনকি মনস্তাত্ত্বিকও নয়। ‘কোনো/নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই; বিবাহিত জীবনের স্বাদ,/কোথাও রাখেনি কোনো খাদ, সময়ের ঊর্ধ্বতনে উঠে এসে বধূ/মধু-আর মননের মধু/দিয়েছে জানিতে; হাড় হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে/এ-জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই।’ তবু ‘লাশকাটা ঘরে/চিত হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের পর।’ কারণ কী? কবি বলছেন, ‘জানি-তবু জানি/নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ নয় সবখানি;/অর্থ নয় প্রীতি নয়, সচ্ছলতা নয়-আরও এক বিপন্ন বিস্ময়/আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে;/ক্লান্ত করে-ক্লান্ত করে, লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই; তাই/ লাশকাটা ঘরে শুয়ে আছে টেবিলের পরে।’

রক্তের ভেতরকার এই যে ‘বিপন্ন বিস্ময়’ এটি হচ্ছে বিচ্ছিন্নতার, খাপ-না-খাওয়ার। এক কথায় অচরিতার্থতার। জীবনানন্দ দাশকে নির্জনতার কবি বলা হয়েছে। না, সেটা তিনি ছিলেন না। তিনি চেয়েছেন সংলগ্ন হতে, থাকতে চেয়েছেন মানুষের সঙ্গে, ইতিহাসের সঙ্গে; আকাক্সক্ষা ছিল প্রকৃতির ও প্রাণিজগতের সঙ্গেও সংলগ্ন হবেন। কিন্তু ইতিহাসের যে পর্যায়ে তিনি বাস করছিলেন সেখানে সংলগ্ন হওয়া ছিল কঠিন, কারও কারও জন্য ছিল অসম্ভবই। যাদের বেলাতে অমনটা ঘটে তাদের চোখে ঘুম থাকে না; পাশে-শুয়ে-থাকা বধূ ও শিশুর দিকে না তাকিয়ে; প্রেম, আলো, জ্যোৎস্না সবকিছু ফেলে একলা বেরিয়ে পড়ে ঘুমের খোঁজে, চলে যায় ঘুম-না-ভাঙার দেশে। জীবনানন্দ দাশ নিজেও খাপ খাওয়াতে পারেননি। তাই বিষণœতা ও বিপন্নতায় আক্রান্ত থাকতেন। তিনি হাঁটতে পছন্দ করতেন, কিন্তু হাঁটবেন যে এমন জায়গা খোলা ছিল না তার জন্য। আপন শহর বরিশালে থাকা হয়নি, উৎপাটিত হয়ে কলকাতায় চলে গিয়েছেন, সে জীবন তার পছন্দের ছিল না। কলকাতা শহরে এক বিকালে হাঁটতে বের হয়েছিলেন, অভ্যাসমতো। হাঁটা শেষে ঘরে ফিরতে পারেননি। চলন্ত ট্রামের ধাক্কায় আহত হয়ে হাসপাতালে চলে যেতে হয়েছে। তার পর লাশ হওয়া, সেই লোকটির মতো যার গল্প তিনি আগেই লিখে রেখেছিলেন তার বিখ্যাত ওই কবিতাটিতে। যেন ভাগ্যের লিখন। কিন্তু এ ভাগ্য দেব-দেবীর হাতে তৈরি নয়, ইডিপাস-নাটকের মায়ের ক্ষেত্রে যেমনটা তৈরি হয়েছিল; তৈরি সে মানুষের, অর্থাৎ মানুষের ইতিহাসের হাতে, আন্না কারেনিনার বেলাতে যেমনটা ঘটেছিল।

খাপ খাননি জীবনানন্দ দাশের সমসাময়িক কবি কাজী নজরুল ইসলামও। ইতিহাসের স্রোতের সঙ্গে তিনিও গা ভাসাতে পারেননি। তবে তার অবস্থানটি ছিল ভিন্ন। তিনি স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চেয়েছেন। সেজন্য স্বভাবে একজন গায়ক হয়েও গান সরিয়ে তাকে উচ্চকণ্ঠে কথা বলতে হয়েছে, বারবার। ভদ্রলোকদের সেটা পছন্দ হওয়ার কথা নয়, হয়ওনি। নজরুল ভেবেছেন ইতিহাসের গতিধারা বদলে দেবেন। চেষ্টাও করেছেন। একাকী নয়, বহুর সঙ্গে মিলে। কিন্তু পারেননি। স্রোতের প্রবল বেগ এবং যাদের ওপর ভরসা করেছিলেন যথোপযুক্তরূপে তাদের সংঘবদ্ধ হতে অপারগতা তাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। তিনি তার কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলেছেন, একেবারে আক্ষরিক অর্থেই। ইতিহাস-সৃষ্ট আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাটা ওই রকমেরই নিষ্ঠুর। যারা খাপ খায় না, স্রোতে ভাসাতে পারে না ভেলা, তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ইতিহাস তাদের কাউকে ঠেলে পাঠায় লাশকাটা ঘরে; কারও চেপে ধরে গলা। ভাসমানরা টিকে থাকে; সুখ-অসুখ না বুঝে, হাস্যরসও করে কেউ কেউ; অপরের মুখে শুনে জানতে পারে যে তারা ভালো আছে।

এই বিচ্ছিন্নতা আগের তুলনায় এখন অনেক বেড়েছে। কারণ হচ্ছে পুঁজিবাদী উন্নতি। পুঁজিবাদী উন্নতির সর্বশেষ প্রতিনিধি হিসেবে হাজির হয়েছে করোনা ভাইরাস, যে মৃত্যুদ- হাতে করে নিয়ে এসেছে সব মানুষের জন্য। এবং মানুষকেই শত্রু করে তুলেছে মানুষের। শাসিয়ে বলছে, বিচ্ছিন্ন হও, নইলে বাঁচবে না। মুনাফালিপ্সা ও ভোগবাদিতার আপাত-সুখকর কশাঘাতে মানুষ তো বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিলই, এখন বিচ্ছিন্ন হতে শিখল প্রাণ বাঁচানোর দায়ে।

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

advertisement
advertisement