advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

সড়ক দুর্ঘটনা : শোকের শিখা নেভানোর দায়িত্ব কার

জয়শ্রী দাস
১৩ জানুয়ারি ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২২ ১২:৫৭ এএম
advertisement

প্রতিদিন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ঘটনা যেমন চিরন্তন সত্যি, তেমনি প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে এখন যেন চিরন্তন সত্যি হয়ে গেছে। আমাদের চারপাশের মানুষ থেকে শুরু করে অনেকেই আহত ও নিহত হচ্ছে। পরিচিত কেউ রাস্তায় বের হলেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকতে হয় কখন না কখন মোবাইল ফোনে কোন দুঃসংবাদ চলে আসে। কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার ও চালকের সঙ্গে কথা বলে সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো জানতে পারলাম- চালকদের প্রতিযোগিতামূলক আচরণ অথবা ওভারটেকিং প্রবণতা অথবা একজনকে ছাড়িয়ে দ্রুত চলে যাওয়ার আগ্রহ। হাইওয়েতে গাড়ির গতিবেগ বা স্পিড নির্দিষ্ট করা থাকে, সেই নির্দিষ্ট গতিবেগ অতিক্রম করা গাড়ি চালানোর প্রবণতা। চালকদের অসচেতনতামূলক আচরণ। গাড়ির যত্রতত্র পার্কিং। রাস্তার প্রশস্ততা কম থাকা। চালকদের পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রশিক্ষণের অভাব। চালকদের ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু এটির ঘাটতি দেখা যায়। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, কোনো কোনো মালিকপক্ষ চাপ প্রদান করে থাকে, যেমন যাত্রীদের পৌঁছে দিয়ে, আবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যাত্রী নিয়ে আসা। এসব কারণে গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর প্রতিনিয়ত জানতে পারি। গত বরিবার জানতে পারি, রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, সদ্য বিদায়ী ২০২১ সালে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩৭১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৮ জন। নিহতদের মধ্যে ৮০৩ জন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। তাদের হিসাবে, প্রতিদিন সড়কে ১৭ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৮৫ দিন গণপরিবহন বন্ধ থাকার বিষয়টি হিসাবে নেওয়া হলে, গড়ে দৈনিক ২২ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় গত বছর যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ১৩ শতাংশই শিক্ষার্থী। অথচ এই শিক্ষার্থীরা তাদের সহপাঠীদের মৃত্যু নিয়ে নিরাপদ সড়ক চেয়ে বিভিন্ন সময় দাবি করেছে, তাদের আন্দোলনে-সংগ্রামে আমরা আশা করেছিলাম এবার বুঝি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে কিন্তু না তাদের অভূতপূর্ব আন্দোলনগুলোকে কিছু আশ্বাস আর আশার বাণী দিয়ে বা দমনপীড়নের মাধ্যমে থামিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা থামাতে পারিনি। পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি বরং আরও অবনতি হয়েছে। তা হলে কি আমাদের মেধাবীদের এভাবেই অকালে প্রাণ দিতে হবে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর দেখি বাবা-মায়ের আর্তনাদ। আত্মীয়স্বজনের হাহাকার। সহপাঠীদের বুক চাপড়ানো কান্না। আমাদের কি প্রতিনিয়ত এসব দেখতেই হবে। সড়ক দুর্ঘটনার শোকের সাগরে ভাসতে হবে। শোকের শিখা কি কোনোভাবে নেভানো যাবে না? যাদের পরিবারের দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, তাদের পরিবারের সদস্যদের দুঃখ-ব্যথা মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারি। কয়েক বছর আগে আমার ভাই ভোলার চরফ্যাশন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জুনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে যোগদান করেন, তিনি যখন সেখানে যাচ্ছিলেন তখন একজন মোটরসাইকেল চালকের সহযোগে যাচ্ছিলেন। তাদের সামনে ছিল একটি মিনিট্রাক, মোটরসাইকেল চালক সামনের মিনিট্রাককে ওভারটেক করার চেষ্টা করল, কিন্তু উল্টো পাশ থেকে আসছিল একটি বাস, সেকেন্ডের মধ্যে মোটরসাইকেলচালক মিনিট্রাক ওভারটেক করতে পারল না এবং রাস্তায় পড়ে গেল, দ্রুততার সঙ্গে বাসচালক বাস ব্রেক করলেন। সৌভাগ্যবশত আমার ভাই হেলমেট পরার কারণে মাথায় আঘাত পায়নি তবে হাতে ও পায়ে প্রচ- ব্যথা পান এবং রক্তপাত হয়। তবে তাকে সেই ব্যথার আঘাত আজও বহন করতে হচ্ছে। তিনি মানসিকভাবেও প্রচ- ভয় পেয়েছেন। শুধু তিনি নন, আমাদের পরিবারটিও মানসিকভাবে ভয়ঙ্কর আঘাতপ্রাপ্ত হয়। যাদের পরিবারের সদস্য সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে, তারা মানসিকভাবে কত আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আছে। যাদের দ্বারা এই দুঃখ-ব্যথার সৃষ্টি হয় তারা কি বুঝতে পারে? হয়তো বুঝতে পারে না, তাদের লক্ষ্য থাকে অর্থ উপার্জন করা। আর যারা সড়কে বিশৃঙ্খলার সুবিধাভোগী, তারাই নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন কমিটিতে বসে আছেন। তারা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে দায়সারা বক্তব্য দিয়ে থাকেন। আসলে সড়কে বিশৃঙ্খলা এভাবে কতদিন চলবে?

রাস্তার অনেক উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু দুুর্ঘটনা কমছে না কেন? তার অন্যতম কারণ বেপরোয়া গাড়ির গতি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে- গত বছর যত দুর্ঘটনা, তার ৬২ শতাংশের কারণ যানবাহনের বেপরোয়া গতি। এ ছাড়া চালকদের অদক্ষতা, মহাসড়কে স্বল্প গতির যানবাহনের চলাচল, ফুটপাত হকারের দখলে থাকা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সরকারি সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি, গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে।

একটি বিষয় বিশেষভাবে ভালো লক্ষ করছি, দীর্ঘপথে গাড়িতে যেতে দেখা যায় কখনো কখনো বিশ মিনিট বা কখন আধা ঘণ্টা কোনো রেস্টুরেন্টে যাত্রীবিরতি দেয়। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই একজন মানুষের কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা বিশ্রাম দরকার হয়। একজন ড্রাইভার একটানা ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালান। আবার এর আগেও যে কয়েক ঘণ্টা তিনি গাড়ি চালাননি তারও প্রমাণ নেই। বিশেষ করে ঈদের সময় দেখা যায় টানা ৩৬ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে হয় বাসচালকদের। কখনো কখনো সেটা ৫০-৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত ওঠে। সঠিক সময়ে তাদের খাওয়া-দাওয়া নেই, ঘুম নেই ফলে রক্তমাংসে গড়া শরীরের মানসিকতাও ভালো থাকে না। ফলে দেখা দেছে ঈদযাত্রায় অনেক দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। কিন্তু আমরা কখনো কি চালক শারীরিকভাবে গাড়ি চালানোর সমর্থ কিনা, সেটা যাচাই-বাছাই করে দেখেছি?

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন নিরাপদ সড়ক চাইর (নিসচা) চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেছেন, করোনার বিধিনিষেধের কারণে ২০২১ সালে অফিস-আদালত, দোকানপাট ও গণপরিবহন বন্ধ ছিল। ফলে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা কম হওয়ার কথা। এর পরও আগের বছরের তুলনায় ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেশি হওয়াটা উদ্বেগজনক। তাই বলব, এভাবে সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া আর প্রাণহানির হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়াটা খুবই দুঃখজনক। এখন যত দ্রুত সম্ভব সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জরুরি ভিত্তিতে জনবান্ধব পরিবহন কৌশল প্রণয়ন করা, দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করা। এবং কিছু সচেতনমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন ১. চালকরা সেফটিবেল্ট ব্যবহার করছে কিনা, সেটা লক্ষ করা। ২. কঠোর এবং কঠিনভাবে গাড়ির মেইনটেন্যান্স করা। প্রয়োজনে রেজিস্টার খাতা ব্যবহার এবং কখন কোথায় গাড়ির মেইনটেন্যান্স করা হয়েছে, মাসে কবার করা হয়েছে, বছরে কবার করা হবে সেই হিসাব রাখা। ৩. হাইওয়েতে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টিম থাকতে হবে। এই টিমের সদস্যরা দ্রুত দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িকে সরিয়ে, রাস্তা পরিষ্কার করে দেবে। ৪. দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী স্পিডব্রেকার, মিরর, পারাপার হওয়ার জন্য ওভারব্রিজ বাড়াতে হবে। যেসব এলাকায় রাস্তার বাঁকের সংখ্যা বেশি থাকে, সেখানে অন্যদিক থেকে গাড়ি আসা দেখার জন্য মিরর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ৫. নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর পরিবহনের গতি মাপার যন্ত্র, রাস্তায় কিছুদূরে অন্তর অন্তর এটি বসিয়ে দিলে কোন গাড়ি কত গতিবেগে যাচ্ছে সেটি পরিমাপ করা যায়। এতে করে খুব সহজেই যে গাড়ির গতি বেগ বেশি তাকে নির্দিষ্ট করা যায় এবং তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ৬. ট্রাফিক সাইন হাইওয়েসহ সব জায়গায় বাড়াতে হবে। যেটি দেখে চালকসহ জনগণ সচেতন হবে। ৭. রেললাইনের জন্য আলাদা পথের ব্যবস্থা করা, যদি না করা যায় তা হলে ওভারপাসের ব্যবস্থা করা। রাস্তার সঙ্গে রেলক্রসিং কম রাখার চেষ্টা করা। ৮. হাইয়েওসহ সব রাস্তায় সিসি ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো। ৯. চালকদের সঙ্গে আমাদের ব্যবহার ভালো করা, তাদের দ্রুত গাড়ি চালনার পরিবর্তে ধৈর্যসহকারে গাড়ি চালাতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। ১০. রাস্তা তৈরির আগে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার্ভে করা। ১১. অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী যে কোনো রাস্তার ডিজাইন করা। ১২. পর্যাপ্ত পরিমাণে মনিটরিং ব্যবস্থা করা এবং সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন বিভিন্ন জায়গায় প্রচার করা, যেমন- টিভি, ইউটিউব, ফেসবুক। ১৩. ম্যানুয়াল ট্রাফিক কমিয়ে আনতে হবে। ট্রাফিক সিগন্যালের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা। ১৪. অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল দুটোই পরিবহন করা বন্ধ করতে হবে। এসব করলে মোটামুটি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। এবং পুরো সড়ক ব্যবস্থাপনা বদলাতে উদ্যোগ না নেওয়া হলে এই বিশৃঙ্খলা থেকে বের হওয়া যাবে না। শৃঙ্খলা আনতে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। দুর্ঘটনা রোধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা ও আইন প্রয়োগ। বিশেষ করে চালক, সহকারী, যাত্রী ও পথচারী- সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে এবং সবার আগে মালিক ও চালকের মানসিক পরিবর্তন ঘটানোর উদ্যোগটা নিতে হবে। এদের মাঝে যদি একটুখানি সচেতনতা বোধ আর সাবধানতা কাজ করে তা হলেই আমরা গুরুতর পরিণতি থেকে রক্ষা পাব। সেজন্য তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আর এই প্রশিক্ষণের উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। এটা বাস্তবায়ন করতে পারলেই সড়কে শোকের শিখা নিভে যাবে।

জয়শ্রী দাস : গবেষক ও কথাসাহিত্যিক

advertisement
advertisement