advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মানুষের মুখ থেকে মুখোশটা খুলে পড়ুক মাটিতে

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
৩ এপ্রিল ২০২২ ০২:৩৪ পিএম | আপডেট: ৩ এপ্রিল ২০২২ ০২:৩৪ পিএম
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
advertisement

এ সময়ে কিছু ব্যতিক্রমী খবর পাচ্ছি। যেখানে মানুষ ক্ষমতা, পদ-পদবির লোভে এমন কোনো হীন কাজ নেই যে করছে না; তখন কিছু মানুষ ক্ষমতা বা পদ-পদবি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেবার মতো উদারতা দেখাচ্ছে। কারণ যাই হোক, লোভ আর স্বার্থের জ্বরে সমাজ যখন আক্রান্ত, তখন ক্ষমতা, পদ-পদবির মতো জৌলুশপূর্ণ জীবন থেকে তারা সাধারণ মানুষের জীবনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। লোভী আর স্বার্থপর মানুষদের দানবিক হবার নগ্ন খেলাটা যখন বাড়ছে তখন এই ঘটনাগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। ত্যাগেই সুখ, ভোগে নয় ভুলে যাওয়া কথাটা আবার নতুন করে কানে এসে ধাক্কা দিচ্ছে।

সংবাদপত্রের খবরটার শিরোনাম এমন, রাবিপ্রবি ভিসি হতে চান না ড. ফারুক। খবরটা দেখে অনেকের হয়তো চোখ কপালে উঠবে। ভোগবাদী অদ্ভুত উটের পিঠে চলা মানুষরা হয়তো বলবে আরে লোকটা কী বলছে, এতো বড় একটা সুযোগ পেয়েও তা হাতছাড়া করছে। হয়তো তারা বোকা তত্ত্বের আঙুল তুলে নিজেদের ভোগের স্বস্তির ঢেকুর তুলবে, যদিও তারা ভেতরে ভেতরে খুব সুখে নেই। বরং এই পদটা পাবার জন্য যতটা নিচে নামার দরকার ততটা নিচে তারা হয়তো নেমেছে। কিংবা এই পদটাকে ধরে রাখার জন্য যা যা করা দরকার তা তারা করে যাচ্ছে। হোক সেটা ভালো কিংবা মন্দ। এখন আর মানুষদের মুখ দেখি না, যাকেই দেখি তাকেই একটা লোভী বস্তু বলে মনে হয়। অনেকগুলো কুকুরের সামনে এক টুকরো মাংস রাখলে মাংসটার যা অবস্থা হয়; তেমনি মুখগুলোর সামনে যা কিছুই রাখা হোক না কেন তার অবস্থাটা সে মাংসের চেয়েও করুণ হয়। মনে পড়ে গেল, বিখ্যাত বাঙালি চিত্রকর জয়নুল আবেদীনের দুর্ভিক্ষের ছবিগুলোর কথা। যেখানে মানুষ, কাকসহ সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ডাস্টবিনে পড়ে থাকা পচা খাবারগুলোর ওপর। তখন সে পচা খাবারগুলো মানুষের প্রয়োজন ছিল আর এখন মানুষ নিজেই পচে গেছে। তাহলে মানুষের প্রয়োজন কি ফুরিয়ে যাচ্ছে? পচাতন্ত্র কি মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।

advertisement 3

যা বলছিলাম, ২৩ মার্চ রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর মেয়াদে ড. আবদুল্লাহ আল ফারুককে উপাচার্য নিয়োগ দেয় সরকার। কিন্তু নিয়োগের মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পারিবারিক সম্পর্কিত কিছু কারণে রাবিপ্রবি উপাচার্য হিসেবে যোগদানে অপরাগতা জানিয়েছেন ড. ফারুক। এ বিষয়ে ড. ফারুক সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রথমে আমি দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু পাবিারিক কিছু কারণে এ কঠিন দায়িত্বটি নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই আমার এ অপারগতার বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।‘ এখান থেকে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার তা হলো মানুষ পদ-পদবির চেয়ে পরিবারকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেছে। যা একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ মানুষের সুসময়ে তার চারপাশে চেনা-অচেনা অনেক লোভী মুখের ভিড় থাকে, অথচ দুঃসময়ে পরিবারের আপনজনরা ছাড়া কেউ থাকে না। যদিও আপনজনেরাও এখন

advertisement 4

মুখোশ পরা মানুষ হয়ে যাচ্ছে। তবে সে যাই হোক, শেষবেলা আসলে বোঝা যায় কে আপন কে পর?

এমন একটা লোভনীয় পদ থেকে নিজেকে বিরত রাখাটাকে সাদা চোখে মহতী একটি সিদ্ধান্ত বলে বিবেচনা করছি। সমাজের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে মেনে নিচ্ছি। লজিক দিয়ে নয়, বিবেক দিয়ে বিষয়টিকে দেখার চেষ্টা

করছি। আয়নার ভেতরে নয়, আয়নার বাইরে। তবে চোখে চশমা পরে এমনটা ভাবছি, খোলা চোখ যেটা দেখতে পাচ্ছে না, সেটা অদেখাই থাকুক। তবে বিশ্বাস করতে চাই চশমা পরা চোখে যা দেখছে খোলা চোখও তা দেখবে। যদিও সত্যের ভেতরে সত্য থাকে, ঘটনার নেপথ্যে ঘটনা থাকে। তবে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা যেন ইতিবাচক দৃষ্টান্তটিকে গৌণ করে না ফেলি। বরং যা দেখছি তা যেন মুখ্য হয়ে উঠে।

আরেকটি ইতিবাচক খবরের শিরোনাম এমন-সন্তানদের সময় দিতে চাকরি ছাড়লেন মৎস্য কর্মকর্তা। এই সময়ে ঘটনাটা খুব বেমানান মনে হতে পারে। কারণ মানুষ শুধু দৌঁড়াচ্ছে আর দৌঁড়াচ্ছে, থেমে থাকার শক্তি যেন মানুষ হারিয়ে ফেলছে। কাইনেটিক এনার্জি মানুষ ক্ষয় করতে করতে পোটেনশিয়াল এনার্জির কথা ভুলেই গেছে। থেমে থাকা যে অনেক সময় চলমান থাকার চেয়ে শক্তিশালী তা হয়তো মানুষের মনস্তত্ত্বে সেভাবে বিবেচিত হচ্ছে না। কারণ সব কিছুই মূল্যায়িত হচ্ছে টাকা, ক্ষমতা আর গোষ্ঠীবদ্ধতায়; সেখানে মানবিক মূল্যবোধ, মেধা আর সৃজনশীলতার কোনো মূল্য নেই। খবরের বিস্তারিত ছিল এমন- কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রহণ করেছেন উচ্চশিক্ষা। এরপর বিসিএস ক্যাডার এবং ১০ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন।

তবে সব কিছু ছেড়ে এখন তিনি পুরোদস্তুর একজন গৃহিণী। সন্তানদের বাড়তি সময় দিতেই এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ময়মনসিংহের গৌরীপুরের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জান্নাত ই হুর সেতু।

৩১ মার্চ কর্মজীবন থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে সহকর্মীদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়েছেন জান্নাত। এদিকে, এত বড় ত্যাগ স্বীকারের দিনটিতে তার বাসা বেলুন দিয়ে সাজিয়ে, ফুলের তোড়া দিয়ে এবং কেক কেটে জান্নাতকে বরণ করে নিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। ব্যক্তি জীবনে তিন কন্যা সন্তানের জননী তিনি।

পেশাগত জীবনে সাফল্যের চূড়ায় থেকেও স্বেচ্ছায় অবসরের বিষয়ে জান্নাত ই হুর সেতু বলেছেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই সরকারি চাকরি করি। পেশাগত কারণে খুব ব্যস্ত সময় পার করতে হয় আমাদের। ফলে সন্তানরা বাবা-মায়ের স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে ওদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়ছে জীবনে। এসব নানা দিক চিন্তা করেই আমি চাকরিটা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ জন্য গত জানুয়ারিতে আমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলাম। আর সে মোতাবেক ৩১ মার্চ ছিল কর্মস্থলে আমার শেষ দিন। এদিন সহকর্মীদের কাছ থেকেও আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়েছি।‘

এ ব্যাপারে জান্নাতের স্বামী সানোয়ার রাসেল বলেন, ‘স্বামী হিসেবে আমি আমার স্ত্রীর চিন্তা ও দর্শনকে সম্মান জানাই। আমি মনে করি সংসারের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করার দায়িত্ব স্বামী হিসেবে আমার। কাজেই আমার স্ত্রী ঘরে ও বাইরে দ্বিগুণ পরিশ্রম না করে যদি শুধু ঘরের দায়িত্ব নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন, তবে আমারও উচিত হবে তার এই সিদ্ধান্তে পাশে থেকে সর্বদা তাকে সহযোগিতা করে যাওয়া।‘

পরিবারে জন্য মায়ের ত্যাগ, খুব মহতী একটা দৃষ্টান্ত। বাবারা যা পারেন না মায়েরা তা পারেন, সেটা আবার প্রমাণিত হলো। তবে অনেকেই ভাবতে পারেন, সব ত্যাগ তো নারীদেরই করতে হয়, পুরুষদের ত্যাগের মনোভাব তো দেখছি না। এতে নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হলো কিনা এ নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। একটা আধুনিক যুক্তিবাদী সমাজে এই বিষয়গুলো আছে, থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামতও থাকবে, সে মতামতগুলো মানুষকে আগামী দিনের পথ দেখানোর শক্তি যেন হয়ে ওঠে এটাই কাম্য। যদিও অস্থির মানুষ বিষয়গুলোর গভীরে না ঢুকে অনেক সময় ব্যক্তি আক্রমণ করে বসে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ব্যক্তির নিজের সিদ্ধান্ত তার অধিকার। সবাই সবকিছু একইভাবে ভাবে না। ভাবনার মধ্যেও বৈচিত্র্য থাকে, ব্যতিক্রম থাকে। সমাজ তা থেকে শিক্ষা নিলেই সেটা সবার জন্য শুভকর হয়। মা তার সর্বোচ্চ ত্যাগ করেছেন, কারণ তিনি জানেন শেষ সময়ে তার আপনজনরাই তার সঙ্গে থাকবেন, অন্যরা অনেক গভীর তত্ত্ব দিতে পারেন, মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দেখাতে পারেন; তবে দুঃসময়ে তাদের মুখগুলো মুখোশ হয়ে যাবে। তারপরও বাস্তব পৃথিবীটা অনেক কঠিন। সারাজীবন মায়েরা সন্তানদের জন্য ত্যাগ করেই যান অথচ সন্তানরা কেমন করে একসময় তা যেন ভুলে যায়। যখন সন্তানদের কাছে পাবার আকুতি মায়ের বাড়তে থাকে তখন সবচেয়ে মূল্যহীন মায়ের জায়গা হয় বৃদ্ধাশ্রমে।

তবে সাম্প্রতিক এই নির্লোভ ঘটনাগুলোকে সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। কারণ নেতিবাচক চিন্তা মানুষের মাথা খেয়ে ফেলছে প্রতিনিয়ত। মানুষ এখন অনেক ভালো কিছু ঘটলেও তা দেখতে পায় না, বরং খারাপটা যত ছোটই হোক মানুষ সেটা বড় করে দেখতে ভালোবাসে। তিলকে তাল বানায়। তেমন মানুষ আমরা চাই না, ইতিবাচক মানুষ চাই। যারা অতসী কাচ দিয়ে হলেও একটা ছোট ও নগন্য ইতিবাচকতাকেও অনেক বড় করে দেখবে।

বিনা পারিশ্রমিকে এক হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করে নীরবে নিভৃতে মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। মানুষের পৃথিবীর কোনো সম্মান বা মর্যাদার জন্য নয়। বরং মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার আকাঙ্ক্ষায়| তার এই ত্যাগের দৃষ্টান্তকে বিবেচনায় এনে তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

স্বাধীনতা পুরস্কার পাবার পর অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমি কখনোই এমন পুরস্কার চাইনি। কাজ করে যাচ্ছি মানুষের সেবায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এসব স্বীকৃতি, পদক আর সুনামের কথা শুনলে ভয় লাগে। দুনিয়াতে আল্লাহ আমাকে সব দিয়ে দিচ্ছেন কেন! দুনিয়াতেই যদি সব পেয়ে যাই, তাহলে তো আখিরাতে খালি হয়ে যাব। এই ভয়টাই আমরা কাজ করে। কিন্তু মানুষের জন্য কিছু করতে পেরে এমনিতে ভালো লাগে। সেই সঙ্গে যদি কাজের স্বীকৃতি মেলে, সেটা আরও আনন্দের ব্যাপার। আর স্বীকৃতিটা যদি সরকার থেকে আসে, সেটি তো আরও বড় ব্যাপার।’

এটাই একজন বড় মানুষের বিনয়, এটাই একজন ত্যাগী মানুষের শক্তি। যা ভোগবাদী মানুষ দুর্বলতা হিসেবে ভাবতে ভালোবাসে। ত্যাগী মানুষটা তাদের কাছে হয়ে যায় বোকা আর তারা সমাজের সামনে শোডাউন করে হয়ে ওঠে চালাক। তারা নিজেদের নায়ক ভাবলেও তারা জানে তারা নায়ক নয়, তারাই ভিলেন। বোকা আর ত্যাগী মানুষগুলোই আসল নায়ক। সেটা সামনে স্বীকার করতে তারা ভয় পায়, তবে ভেতরে ভেতরে সত্যের মর্মটা বুঝতে পারে। তবে সেটা কখনো প্রকাশ করতে পারে না, কারণ তারা ভিতু হয়। সব সময় হারাবার ভয়ে জরাগ্রস্ত হয়ে থাকেন। তবে যে যাই বলুক, যে যাই ভাবুক, এই ইতিবাচক ঘটনাগুলোই আমাদের অর্জন। সবকিছু হারিয়ে গেলেও এগুলোই বেঁচে থাকে অনন্তকাল। এই ইতিবাচকতার অদৃশ্য শক্তি ছড়িয়ে পড়ুক সবক্ষেত্রে, সব মানুষের সুপ্ত চিন্তায়। ত্যাগের মহামন্ত্রে উজ্জীবিত হোক মানুষ। যেখানে মানুষের মুখ থাকবে, মুখোশ থাকবে না।

(লেখক : অধ্যাপক ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর)

 

advertisement