advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত অধিদপ্তরের কর্তারাও

সাজ্জাদ মাহমুদ খান
১৬ মে ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৬ মে ২০২২ ১০:৩০ এএম
advertisement

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ৫১৩ কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও জড়িত। গত শুক্রবার পরীক্ষার দিন দুপুরে অধিদপ্তর থেকে ফাঁস করা প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে চক্রের সদস্যরা অন্যদের কাছে হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে পাঠায়। এরপর প্রশ্নের উত্তর বের করে পরীক্ষা শুরুর ৪২ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে চাকরিপ্রার্থীদের কাছে পাঠিয়ে দেয় চক্রের সদস্যরা। প্রশ্নপত্র ফাঁস করে চাকরি দিতে প্রতিজনের কাছ থেকে ধাপে ধাপে ৫ লাখ টাকা নেওয়ার চুক্তিও করে চক্রের সদস্যরা। গোয়েন্দা পুলিশ ও ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেওয়া প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

মাউশির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে চুক্তি করেন পটুয়াখালীর কলাপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম। অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি টাঙ্গাইলের খোকনসহ চক্রের আরও কয়েক সদস্য গোয়েন্দা জালে রয়েছে।

advertisement

জানা গেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসচক্রের সদস্য মাউশির এক কর্মচারীর সঙ্গে গণিতের শিক্ষক সাইফুল ইসলামের সখ্য গড়ে ওঠে। শিক্ষক হওয়ায় অনেক চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে শিক্ষক সাইফুলের পরিচয় ছিল। মাউশিতে চাকরি দেওয়ার জন্য প্রতি প্রার্থীর সঙ্গে সাইফুল ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা চুক্তি করেন। অধিদপ্তর থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর সাইফুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা দ্রুত প্রশ্নপত্রের ৭০টি উত্তরের সমাধান করে পরীক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠায়। সাইফুলের পাশাপাশি এই চক্রের সদস্য টাঙ্গাইলের খোকন। সাইফুল ইসলাম ও খোকন গোয়েন্দা জালে রয়েছে। তারা যে কোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।

মাউশির চাকরি পরীক্ষায় উত্তরপত্র লেখাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় পরীক্ষার্থী সুমন জোয়ার্দারকে। গত শুক্রবার বিকালে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ কেন্দ্রের একটি কক্ষ থেকে তিনি গ্রেপ্তার হন। ৫১৩টি পদের বিপরীতে ১ লাখ ৮৩ হাজার চাকরিপ্রার্থী ঢাকার ৬১টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেন শুক্রবার বিকালে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহাদত হোসেন সুমন আমাদের সময়কে বলেন, পরীক্ষা শুরুর আগেই সুমন বাইরে থেকে প্রবেশপত্রের পেছনে ৭০ নম্বরের প্রশ্নের সমাধান লিখে নিয়ে যান। প্রবেশপত্রে উত্তর লেখা ছাড়াও তার কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইলের হোয়াটসঅ্যাপে উত্তরের একটি এসএমএস ছিল। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অধিদপ্তর থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।

জানা গেছে, পটুয়াখালীর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাব সহকারী হিসেবে মাস্টার রোলে কাজ করেন সুমন। সাইফুল ইসলাম তাকে মাউশিতে সরকারি চাকরি দেওয়ার কথা বলে ৫ লাখ টাকায় চুক্তি করেন। সুমনের মতো আরও কয়েকজনের সঙ্গে সাইফুলের চুক্তি হয়। পরীক্ষার দিন প্রশ্নপত্র মিলে গেলে চুক্তির টাকার একটি অংশ সাইফুলকে দেওয়ার কথা। এরপর চাকরি হওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে এই টাকা পরিশোধ করার চুক্তি হয়।

মাউশি মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক নেহাল আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমরা এখনো নিশ্চিত না এটা প্রশ্নপত্র ফাঁস নাকি নকল করেছে চাকরিপ্রার্থীরা। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুক না, সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ পরীক্ষা বাতিল করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিয়োগে মাউশির একটি কমিটি আছে। কমিটির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। পুলিশ রিপোর্টে যদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয় আসে, তা হলে তো বাতিল করে আবার পরীক্ষা নিতেই হবে।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাইফুলকে প্রশ্নপত্র দিয়েছেন মাউশির এক কর্মচারী। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসে তাদের একটি চক্র রয়েছে। আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নাম পাওয়া গেছে। চক্রে আর কারা জড়িত সে ব্যাপারে তদন্ত চলছে। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা কমিটির অবহেলা পাওয়া গেছে।

এর আগে ২১ জানুয়ারি প্রতিরক্ষা মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের অধীন ‘অডিটর’ নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় রাজধানী থেকে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলা পরিষদের বর্তমান মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবা নাসরিনসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গত নভেম্বরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় বুয়েটের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান নিখিল রঞ্জন ধরের নাম আসে পুলিশের তদন্তে। এরপর বুয়েট কর্তৃপক্ষ তাকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এ ছাড়া নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের আরেকটি ঘটনায় বরখাস্ত হওয়া দুই ব্যাংক কর্মকর্তা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক এক কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবে গত বছর ছয় কোটি টাকা পায় সিআইডি। আর ভর্তি পরীক্ষা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ছাত্রলীগের ২১ নেতাকর্মীসহ ১২৫ জনের বিচার গত বছর শুরু হয়েছে। এ ছাড়া নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাবুদ ও আলমাছ আলীকে করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

 

advertisement