advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সরকার ৫শ কোটি টাকা পাবে ইউনাইটেড পাওয়ারের কাছে

কবির হোসেন
১৭ মে ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৭ মে ২০২২ ১১:৪৬ এএম
ফাইল ছবি
advertisement

ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের কাছে সরকারের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৫০০ কোটি টাকার ওপরে। ২০১৮ সালের জানুয়ারির পর থেকে এই পাওনার পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। গত এক বছরেই পাওনা টাকার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় একশ কোটি টাকা। তিতাস এবং কর্ণফুলী গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এই টাকা পাবে।

বর্তমানে বাণিজ্যিকভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করছে। এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে যে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে তার দাম ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ক্যাপটিভ ক্যাটাগরিতে (বাণিজ্যিক শ্রেণি) দেওয়ার জন্য নির্ধারণ করে সরকার। কিন্তু সরকারি গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য আইপিপি ক্যাটাগরিতে (বিদ্যুৎ শ্রেণি) দাম দিতে চায় ইউনাইটেড পাওয়ার।

advertisement

জানা গেছে, আইপিপি ক্যাটাগরিতে গ্যাসের মূল্য ক্যাপটিভ ক্যাটাগরির তিন ভাগের এক ভাগ। আইপিপি ক্যাটাগরিতে (‘বিদ্যুৎ শ্রেণিতে’) প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৪ টাকা ৪৫ পয়সা। কিন্তু বাণিজ্যিক শ্রেণিতে কেউ উৎপাদন করলে তাকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ১৩ দশমিক ৮৫ টাকা করে পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে ক্যাপটিভ শ্রেণিতে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে নেওয়া সরকারের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে কোম্পানির পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে দুটি পৃথক রিট মামলা করা হয়। ২০১৯ সালে দায়ের করা এই রিট ২০২০ সালের শুরুতে হাইকোর্ট

থেকে খারিজ হয়ে যায়। এখন হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল দায়েরের নামে কালক্ষেপণ চলছে। এই আইনি প্রক্রিয়ার আড়ালে কালক্ষেপণের সুযোগে বেড়ে যাচ্ছে সরকারের পাওনার পরিমাণ। পাশাপাশি সরকারের এই পাওনার বিপরীতে কোনো নিরাপত্তা জামানতও নেই। ফলে বাড়ছে আর্থিক ঝুঁকিও। কিন্তু সরকারের গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোও মামলা বিচারাধীন থাকায় অর্থ আদায়ের কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

জানতে চাওয়া হলে গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশিদ মোল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল পেন্ডিং (বিচারাধীন) রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় কোনো অ্যাকশনে (পদক্ষেপ) যাওয়া হচ্ছে না।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোর্শেদ জানান, ইউনাইটেড পাওয়ারের পক্ষ থেকে করা দুটি রিট হাইকোর্টে খারিজ হয়েছে। ওই রায় স্থগিত চেয়ে তারা আপিল বিভাগে আবেদন করেছে। আবেদন শুনানির জন্য ১২ জুন দিন ধার্য করা হয়েছে। ওই দিন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেব না। আশা করছি কার্যতালিকায় আসার পর ওইদিনই শুনানি শেষ করতে পারব। সেক্ষেত্রে দ্রুতই বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করছি।

সরকারের এই আইন কর্মকর্তা আরও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর যে অংশটুকু সরকারি গ্রিডে দেবে, সেই অংশটুকু উৎপাদনে যে গ্যাস পুড়বে তার দাম দিতে হবে আইপিপি রেট ক্যাটাগরিতে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর যে অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করবে, সেই অংশ উৎপাদনে যে গ্যাস পুড়বে তার দাম দিতে হবে ক্যাপটিভ রেট ক্যাটাগরিতে। এটাই সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত। ইউনাইটেড পাওয়ার প্ল্যান্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিক্রি করছে এজন্য কোম্পানিটিকে ক্যাপটিভ রেটে গ্যাসের দাম দিতে হবে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনে সারাদেশের ৮টি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় (ইপিজেড-এ) মোট ৩৮টি দেশের ৪৬০টি শিল্পকারখানা চালু রয়েছে। এসব শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিত বেপজার বোর্ডসভায় ইপিজেডগুলোয় ব্যক্তিমালিকানায় ‘সার্ভিস ওরিয়েনটেড ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ হয়। বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নীতিমালা-২০০৮ তৈরি করে।

এই নীতিমালার আওতায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছ থেকে লাইন্সে নিয়ে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ঢাকার সাভারে একটি এবং চট্টগ্রামে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে। ‘কমার্শিয়াল পাওয়া প্ল্যান্ট অ্যাজ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) আন্ডার পলিসি গাইডলাইন ফর ইনহ্যান্সমেন্ট অব প্রাইভেট পার্টিসিপেশন ইন পাওয়ার সেক্টর-২০০৮’ হিসেবে তাদের এই লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রতিবছর এই লাইসেন্স বিইআরসি নবায়ন করে। সর্বশেষ সরকার ‘কমার্শিয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট’ হিসেবে ইউনাইটেড পাওয়ারকে লাইসেন্স দেয়। ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) আন্ডার পলিসি গাইডলাইন ফর ইনহ্যান্সমেন্ট অব প্রাইভেট পার্টিসিপেশন ইন পাওয়ার সেক্টর-২০০৮ অংশটুকু তাদের লাইসেন্স থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই লাইসেন্স নবায়নের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা চেয়ে ২০১৮ সালের নভেম্বরে বিইআরসির কাছে আবেদন করে কোম্পানিটি।

এর আগে ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বলানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ‘গ্যাসভিত্তিক বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের যে অংশ গ্রিডে সরবরাহ করা হয় তা উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত গ্যাস আইপিপি (বিদ্যুৎ শ্রেণি) রেটে এবং অবশিষ্ট বিদ্যুৎ যা নিজস্ব উদ্যোগে নির্বাচিত গ্রাহকের কাছে সমঝোতার ভিত্তিতে বিক্রি করা হয়, সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত গ্যাস ‘ক্যাপটিভ পাওয়ার’ শ্রেণির জন্য প্রযোজ্য রেটে সরবরাহ করা হবে।’ সরকারের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্যাপটিভ শ্রেণি অনুযায়ী গ্যাস বিল চেয়ে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে চিঠি পাঠায় তিতাস এবং কর্ণফুলী গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি।

ইউনাইটেড পাওয়ার আইপিপি রেটের সুবিধা হারায়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিক্রি করায় ক্যাপটিভ শ্রেণিতে দাম ধার্য করা হয়। কিন্তু কোম্পানিটি এখনো আইপিপি ক্যাটাগরিতে দাম দিয়ে আসছে। সেই ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকেই ক্যাপটিভ শ্রেণি হিসেবে সরকারকে কোনো টাকা দেয়নি। এতে করে সরকারের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৫০০ কোটি টাকার ওপরে। এর মধ্যে গত মার্চ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩শ ৭০ কোটি টাকার ওপরে। কর্ণফুলী গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পাওনা প্রায় দুইশ কোটি টাকার কাছাকাছি।

অন্যদিকে ইউনাইটেড পাওয়ারকে ‘ক্যাপটিভ রেট’-এ গ্যাসের দাম দেওয়ার সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৯ সালে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট করে ইউনাইটেড পাওয়ার। রিটে বলা হয়, গ্যাসের দাম নির্ধারণ করবে বিইআরসি। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এই দাম নির্ধারণ অবৈধ ও বেআইনি। রিটে আরও বলা হয়, ২০০৮ সালের নীতিমালার আওতায় ইউনাইটেড পাওয়ারকে আইপিপি হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং যেটা পরিবর্তন করা আবেদনকারীর আইনগত প্রত্যাশার লঙ্ঘন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, নীতিমালা অনুযায়ী সরকার তাদের গ্যাস সরবরাহ করতে বাধ্য নয়। তা ছাড়া লাইসেন্স অনুযায়ী তারা বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ব্যবসা করছে। এক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত দাম তাদের পছন্দ না হলে তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জ্বলানির ব্যবস্থা করুক। জ্বালানি মন্ত্রণালয় গ্যাসের দাম নির্ধারণ করেনি, এটা শ্রেণি নির্ধারণ করেছে। রিট আবেদন দুটির শুনানি শেষে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট তা খারিজ করে দেন। এর পর ২০২১ সালে ওই রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আপিল করেছে ইউনাইটেড পাওয়ার। সর্বশেষ গত ২৭ এপ্রিল আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি আপিল দুটির শুনানির জন্য আগামী ১২ জুন দিন নির্ধারণ করেছেন।

জানতে চাওয়া হলে হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইন কর্মকর্তা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার কাজী মাইনুল হাসান আমাদের সময়কে বলেন, ক্যাপটিভ শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করে ইউনাইটেড পাওয়ারকে দেওয়া গ্যাসের দাম নির্ধারণের বিষয়টি পচ্ছন্দ না হলে কোম্পানিটি বিদ্যুৎ উৎপাদানের জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জ্বালানির ব্যবস্থা করতে পারে। সরকারের কাছ থেকে গ্যাস নেওয়ার দরকার নেই। তা ছাড়া ২০০৮ সালের পলিসি অনুযায়ী সরকারের কোনোভাবেই তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস দিতে বাধ্যবাধকতা নেই। ওই পলিসি মোতাবেক ভর্তুকি দিয়ে গ্যাস সরবরাহের কোনো আইনগত সুযোগ নেই। আরও অনেক আগেই তাদের এই সুবিধা বন্ধ হওয়া উচিত ছিল।

বিদ্যুৎ খাতে ব্যক্তিগত অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নীতিমালা-২০০৮ (পলিসি গাইডলাইন ফর ইনহ্যান্সমেন্ট অব প্রাইভেট পার্টিসিপেশন ইন পাওয়ার সেক্টর)-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে, দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস দ্রুত শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন বিদ্যুৎ স্থাপনাসমূহ দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিবর্তে কয়লা, আমদানি করা গ্যাস, তরল জ্বালানি কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলোর জ্বালানি ব্যবহারের ওপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্ভর করবে। বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসমূহের উন্নয়নকারীরা তাদের নিজস্ব জ্বালানি এবং শক্তির উৎসের ব্যবস্থা করবে। জ্বালানি সরবরাহের জন্য সরকার কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করবে না বলেও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়।

জানতে চাওয়া হলে ইউনাইটেড পাওয়ারের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজীব-উল আলম আমাদের সময়কে বলেন, ‘কোম্পানিটির জন্য কোন রেট প্রযোজ্য হবে তা নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে। হাইকোর্টে রিট খারিজ হওয়ায় আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। একটা স্টে পিটিশন মুভ করা হয়েছে। সরকারপক্ষ অঙ্গীকার করেছে আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় পর্যন্ত কোনো অ্যাকশনে যাবে না। তাই আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পাওনা আদায় করা যাবে না।’

 

 

 

advertisement