advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ডলার সংকটের ফায়দা লুটছে ব্যাংকগুলো

জিয়াদুল ইসলাম
১৭ মে ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৭ মে ২০২২ ০৮:৪৭ এএম
ফাইল ছবি
advertisement

আমদানিতে চাহিদা বৃদ্ধি ও সংকটের কারণে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে ডলারের বাজার। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে রেট নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে, সেই রেটে কোথাও মিলছে না ডলার। এই সুযোগে ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আমদানি পেমেন্টে (এলসি নিষ্পত্তি) ইচ্ছামতো রেট আদায় করছে। বর্তমানে আমদানি পেমেন্টের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের প্রতি ডলারের জন্য গুনতে হচ্ছে ৯৪ থেকে ৯৫ টাকা। নতুন এলসি খুলতেও বেশি রেট দাবি করছে ব্যাংকগুলো। এ যেন সংকটকে পুঁজি করে ফায়দা লোটার প্রতিযোগিতা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এলসি খোলার সময় ব্যাংকগুলো ডলারের যে রেট ধরেন, পেমেন্টের দিনে সেই রেট নিচ্ছেন না। এমনকি পেমেন্টের তারিখে যে রেট থাকে, সেই রেটেও ডলার দিচ্ছেন না। নতুন এলসি খুলতেও বেশি রেট দাবি করা হচ্ছে। তাই সংকট কাটাতে রিজার্ভ থেকে ডলারের সরবরাহ বাড়িয়ে জরুরি পণ্যের এলসি খোলার সুযোগ ও দাম নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি চিঠিও পাঠানো হয়েছে। এদিকে, আন্তঃব্যাংকে অস্থিরতা ঠেকাতে ডলারের রেট ফের ৮০ পয়সা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মানে একদিনেই ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমে গেছে ৮০ পয়সা। আর তিন সপ্তাহের ব্যবধানে কমেছে এক টাকা ৩০ পয়সা। গতকাল আন্তঃব্যাংকে ডলারের রেট ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।

advertisement

প্রবাসী আয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা ও আমদানি ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে গত বছরের আগস্ট থেকে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে ডলারের দাম। ফলে প্রতিনিয়ত ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাচ্ছে। এতে রপ্তানিকারক ও রেমিটাররা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। কারণ ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি খরচ বাড়লে পণ্যমূল্যও বাড়ে। এরই মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেশ বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে।

গতকাল আন্তঃব্যাংকে ডলারের দাম ৮০ পয়সা বেড়ে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সায় উঠলেও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এলসি পেমেন্টে ৯৫ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছে ব্যাংকগুলো। অথচ রপ্তানি ও রেমিটারদের কাছ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত রেট সাড়ে ৮৭ টাকার কমে ডলার কিনেছে ব্যাংকগুলো। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ব্যাংকগুলো ঘোষিত রেটেই ডলার পাচ্ছে। কিন্তু আমদানিকারকদের কাছে বিক্রি করছে ঘোষিত রেটের চেয়েও প্রায় ৮ টাকা বেশি। ফলে সংকটকে পুঁঁজি করে ফায়দা লুটছে ব্যাংকগুলো।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, আমরা যখন এলসি করি, তখন যে রেটটা ফিক্সড থাকে, সেটি এলসি নিষ্পত্তির সময় ওলট-পালট হয়ে যায়। যেমন এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের রেট সাড়ে ৮৭ টাকা। কিন্তু এক সপ্তাহ আগে থেকেই ব্যাংকগুলো এলসি নিষ্পত্তিতে রেট আদায় করছে ৯৫ টাকা। এত ব্যবধান কেন হবে। অথচ রপ্তানিকারক ও রেমিটাররা পাচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত রেটেরও কম। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের আমদানি খরচ বাড়লে সেটার প্রভাব কিন্তু ভোক্তা পর্যায়েই পড়বে। কারণ আমদানীকৃত ওই পণ্যের দাম সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাবে। তিনি জানান, ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে কয়েক দফা অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আজও (গতকাল) এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে আমরা অতি প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের রেট ফিক্সড করার অনুরোধ করেছি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, আন্তঃব্যাংকে ডলারের সংকট কি শুধু আমদানি বৃদ্ধির কারণে হচ্ছে, নাকি ব্যাংকগুলো ডলার ধরে রেখেও সংকট তৈরি করছে- সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথ তদারকির মাধ্যমে দেখাতে পারে। এ ছাড়া খোলাবাজার থেকে কারা ডলার কিনছেন, প্রয়োজনে কিনছেন, নাকি অপ্রয়োজনে কিনে ব্যবসার করছেন- সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

করোনা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার পর থেকে দেশে অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ছে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি। মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি তেলসহ সব পণ্যের আমদানিই এখন বেশ ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে পণ্য আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। একই সময়ে বিভিন্ন পণ্যের এলসি বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। ফলে আমদানিতে ডলারের চাহিদা বেশ বেড়েছে। কিন্তু ব্যাংকের কাছে ডলার আসার উৎস রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের ২ আগস্ট আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। গতকাল দাম ওঠে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সায়। ফলে ৯ মাসেরও কম সময়ে আন্তঃব্যাংকেই ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ২ টাকা ৭০ পয়সা। এর মধ্যে ১ টাকা ৩০ পয়সাই বেড়েছে গত ২০ দিনের ব্যবধানে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, বাজারের অস্থিরতা ঠেকাতেই ফের ডলারের রেট বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া যখনই প্রয়োজন হচ্ছে তখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাজারে ডলার সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া জরুরি পণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের আমদানিতে এলসি মার্জিন বৃদ্ধি করা হয়েছে। আশা করছি খুব শিগগিরই বাজার স্থিতিশীল হবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান লেন, চাহিদা বাড়ায় ডলারের দাম বাড়ছে। অনেক বিদেশি ব্যাংক ৯৪-৯৫ টাকায় ডলার কিনছে। এতেই বোঝা যাচ্ছে বাজারের কী অবস্থা।

আন্তঃব্যাংকের তুলনায় খোলাবাজারে ডলারের দাম আরও চড়া। গতকাল এই বাজারে প্রতি ডলার কিনতে ক্রেতাকে খরচ করতে হয়েছে ৯৬ টাকা থেকে ৯৭ টাকা। বর্তমানে আন্তঃব্যাংকের সঙ্গে খোলাবাজারের ডলারের দামের পার্থক্য প্রায় সাড়ে ৯ টাকা। স্বাভাবিক সময়ে এই পার্থক্য আড়াই থেকে ৩ টাকার মধ্যে থাকে। এদিকে আমদানিতে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধির পর থেকে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকালও ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়েছে। সবমিলে চলতি অর্থবছরের ১৬ মে পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করা হয়েছে ৫২১ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

 

 

advertisement