advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আওয়ামী লীগ ও সাক্কু বড় পরীক্ষার মুখে

সাইয়িদ মাহমুদ পারভেজ,কুমিল্লা
১৭ মে ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৭ মে ২০২২ ১২:২৮ পিএম
ফাইল ছবি
advertisement

দুই পক্ষের জন্যই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচন বড় পরীক্ষার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী চান জয়। এই নির্বাচন কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের জন্যও বড় পরীক্ষা। সেই সঙ্গে বড় পরীক্ষা দুবারের মেয়র বিএনপির কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক সাক্কুর জন্যও। বিএনপি এ নির্বাচনে সরাসরি অংশ না নিলেও জনগণ মনিরুল হক সাক্কুকে বিএনপির হিসেবেই চেনেন। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও বিএনপিই নির্বাচনের একটি অংশে পরিণত হয়েছে।

এবারের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা ছিল দীর্ঘ। ১৪ জনের ওই তালিকায় সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমাও মনোয়ন চেয়েছিলেন। তার কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রচারে মেতে ওঠেন। অনেকেই ভেবেছিলেন সীমা মনোনয়ন পাচ্ছেন। পরে ১৩ মে দলীয় বোর্ডে মনোনয়ন পান মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত। রিফাতের মনোনয়নকে বাহার গ্রুপ প্রাথমিক বিজয় বলে মনে করছে।

advertisement

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, ১৯৭৩ সালের পর এ পদটিতে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থীই বিজয়ী হতে পারেননি। স্বতন্ত্র এবং বিএনপির দখলেই ছিল। ১৯৭৩ সালে সর্ব শেষে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন কুমিল্লা পৌরসভায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আবদুল আউয়াল। এর পর আওয়ামী লীগ নেতা হাজি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ১৯৮৪ এবং ১৯৮৯ সালে পরপর দুবার চেয়ারম্যান থাকলেও দুবারই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। এর পর ২০০৩ সাল পর্যন্ত এ পদে বিএনপির কামাল উদ্দিন চৌধুরী চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০০৩ সালে তার মৃত্যুর পর বর্তমান সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু তৎকালীন কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। মাঝখানে মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় তিনি ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেননি। তখন সরকারের উপসচিব আতাউল গণি কুমিল্লা পৌরসভার দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে মনিরুল হক সাক্কু আবারও দায়িত্বে আসেন। ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন ঘোষণার পর ২০১২ সালে প্রথম ও ২০১৭ সালে দ্বিতীয় নির্বাচনে তিনি মেয়র হন এবং এখনো আছেন। তার সঙ্গে সিটি নির্বাচনে প্রথমবার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা অধ্যক্ষ আফজল খান। দ্বিতীয়বার ২০১৭ সালে নির্বাচনে সাক্কুর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত অধ্যক্ষ আফজল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা সীমা। হাজি বাহার ওই নির্বাচনে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা আরফানুল হক রিফাতের মনোনয়নের জন্য জোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই সীমার পক্ষে প্রচারে কুমিল্লা এলেও বাহার ছিলেন অনেকটা নীরব। তিনি তখন মিডিয়াসহ বিভিন্ন ফোরামে বলেছিলেন- ‘খুনের সঙ্গে জড়িত পরিবারের কারও পক্ষে আমি কাজ করতে পারি না।’ তখন তিনি মনোনয়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। বলেছিলেন- ‘আমাদের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলে এ পদে নৌকার পরাজয় হতো না।’ তার এসব মন্তব্য তখন বেশ আলোচনার সৃষ্টি করে। এবার তার প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেওয়ায় আরফানুল হক রিফাতের নির্বাচন এখন সরাসরি হাজি বাহারের নির্বাচনে পরিণত হয়েছে।

অপরদিকে দলীয় পরিচয়কে পাশ কাটিয়ে মনিরুল হক সাক্কুর জন্য ব্যক্তি ইমেজ বড় হয়ে দেখা দিলেও এবারের নির্বাচন তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। সিটি মেয়র সাক্কু এবং সংসদ সদস্য বাহারের মধ্যে সখ্য আছে বলে কুমিল্লায় প্রচার রয়েছে। সিটি মেয়রও সরাসরি বলেছেন- ‘উন্নয়ন করতে হলে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে সখ্য থাকতেই হবে।’ এবারের নির্বাচনে নানা হিসাব-নিকাশে ওই সখ্যেরও যবনিকা টানা হতে পারে।

জানা যায়, অধ্যক্ষ আফজল খান প্রয়াত হলেও কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই গ্রুপ আফজল গ্রুপ এবং বাহার গ্রুপের দ্বন্দ্ব এখনো বহাল। ২০১৭ সালের সিটি নির্বাচনে অঞ্জুম সুলতানা সীমার বিপক্ষে কাজ করেছেন বলে হাজি বাহারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফোরামে সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন সীমা। এবার হাজি বাহারের প্রার্থী রিফাতের পক্ষে আফজল গ্রুপ কতটুকু কাজ করে তাও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। আফজল গ্রুপের বর্তমান কর্ণধার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমার ভূমিকা কী হবে, সেটিও দেখার বিষয়।

এদিকে বিএনপিও দ্বিধা-বিভক্ত। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজি আমিনুর রশিদ ইয়াছিন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেয়র সাক্কুর মধ্যে দলীয় বিরোধ এখন তুঙ্গে। সিটি নির্বাচনে দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও হাজি ইয়াছিনের শ্যালক নিজাম উদ্দিন কায়সার সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় এ বিরোধ এখন আরও প্রকট হয়েছে। ফলে কায়সার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে এখানে বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হবে। এর ফলে মনিরুল হক সাক্কুর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে দুই দলের দুই নেতার চ্যালেঞ্জের মুখে কুমিল্লা সিটি নির্বাচন এবার অনেক গুরুত্ব বহন করে।

এ ব্যাপারে অধিকার ফাউন্ডেশন কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি আলী আকবর মাসুম বলেন, এখানে দলের চেয়ে গ্রুপের গুরুত্ব বেশি করে দেখা হয়। এর ফলে উপযুক্ত প্রার্থী ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন গুরুত্ব হারাচ্ছে।

সনাকের সাবেক সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, এবার নির্বাচনে ভিন্নতা রয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিপক্ষের গোষ্ঠী বিপরীত শক্তির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করলে তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

আ.লীগ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র সংগ্রহ কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আরফানুল হক রিফাতের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৫ নেতা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে আরফানুল হক রিফাত তার মনোনয়নপত্র জমা দেবেন বলে জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ। গতকাল দুটি গাড়িতে করে নগরীর ছোটরা এলাকায় আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে আসেন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।

এ পর্যন্ত মেয়র পদে মোট ৬ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন, স্বতন্ত্র (বিএনপি নেতা) দুজন, জাতীয় পার্টির একজন, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের একজন, নাগরিক ফোরামের একজন। এর বাইরে মোট ১৪৮ জন কাউন্সিলর প্রার্থী এবং ৩০ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। আজ মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ১৯ মে।

বিএনপি থেকে আজ অব্যাহতি চাইবেন সাক্কু কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের দুবারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু আজ মঙ্গলবার বিএনপিতে তার সব পদ থেকে অব্যাহতি চাইবেন। এরপরই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রিটার্নিং অফিসারের কাছে মেয়র পদে মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গতকাল বিকালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে তার দায়িত্ব হস্তান্তর করেন তিনি। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলামের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যে কোনো মূল্যে সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করবেন তিনি। নগরবাসীর চাপে এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। দল নির্বাচন না করায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচন করবেন তিনি। তাই দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি বেগম রাবেয়া চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করব। রাবেয়া আপার মাধ্যমেই দল থেকে অব্যাহতি চাইব।

 

 

 

 

advertisement