advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বন্যার্তদের ঘরে ফেরাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
পানি কমেছে, ভয় কমেনি

সাজ্জাদ মাহমুদ খান,সিলেট থেকে
২৪ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৪ জুন ২০২২ ০১:৩২ এএম
advertisement

‘ঘরে ফিরব, ঘর পাব কই। বাড়ি গিয়ে খাব কী! ঘরে তো কিছুই নাই! বানের পানিতে সব ভেসে গেছে। এক ড্রাম চাল ছিল, তাও গেছে। তিল তিল করে জমানো সব শেষ। আশ্রয়কেন্দ্রে তবু একবেলা খাবার পাই। বাড়ি গেলে না খেয়ে মরতে হবে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে এভাবেই আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার কথা বলছিলেন বিধবা ফাতেমা খাতুন। গত ১৬ জুন সিলেটের যতরপুর এলাকায় নিজের বাড়িটি বানের পানিতে তলিয়ে গেলে তিনি সিলেট শহরের শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বিতীয় তলায় আশ্রয় নেন। ফাতেমার মতো এই স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে আরও প্রায় ১২০ পরিবার। তাদের সবার মধ্যে সব হারানোর শোক আর আগামীর অনিশ্চয়তা। একই রকম আতঙ্ক দেখা গেছে অন্যান্য আশ্রয়কেন্দ্রেও।

অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার জোটে একবেলা/আধবেলা। পানি সংকট তীব্র। বড়রা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা রান্না করা খাবারের পাশাপাশি শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে থাকলেও শিশুসন্তানদের নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। তাদের দুধ জোগাড় করতে পারছেন না।

সিলেটের শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের আশ্রয়কেন্দ্রে পানি নেই। আশ্রয়কেন্দ্রের জুলেখা বেগম জানান, এখানে কোনো পানি নেই। কেন্দ্রে এসে কেউ গোসল করতে পারেনি। গোসল করতে না পেরে চুলকানি হয়ে গেছে। এক কাপড়ে আসায় কেউ কাপড়ও বদল করতে পারছে না। অনেকের চামড়ায় ফুসকুড়ি পড়ে গেছে। চুলকানি হয়েছে। খেয়ে না খেয়ে খুব কষ্টে আছেন আশ্রয়কেন্দ্রের

বানভাসিরা।

প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. ফয়জুল্লাহ বলেন, পানির কারণে মোটর নষ্ট হয়ে গেছে। চার দিন ধরে চেষ্টা করেও ঠিক করা যাচ্ছে না।

সিলেট নগরের কিশোরী মোহন বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের আট মাস বয়সী ছেলে কামরান ও ২৩ মাস বয়সী এমরানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন শাম্মী আক্তার। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, বন্যার পানিতে তার সব ভেসে গেছে। দুই সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এখানে একবেলা রান্না করা খাবার দেওয়া হয়। সন্তান অল্প বুকের দুধ পেলেও এখন নিজের খাবার খেতে না পারায় সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। হাতে কোনো টাকাপয়সাও নেই। রান্না করা খাবার নিজে খান এবং শিশুসন্তানদের সেই খাবারই দেন। শুরুতে শিশুরা কান্নাকাটি করত। এখন পেটের ক্ষুধায় খেয়ে নেয়। তবে এক সপ্তাহ পর গত বুধবার একজন দুধ কিনে দিয়েছিল। সেটিই দুই সন্তানকে ভাগ করে দিয়েছেন বলে তিনি জানান।

খাবার সংকটের কথা জানিয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষ। সিলেটের কিশোরী মোহন বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া খাদিজা বেগমের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হচ্ছিল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। দুই থেকে ১২ বছর বয়সী চার সন্তান নিয়ে তিনি এই কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, বুধবার রাতে তাদের রান্না করা খাবার দেওয়া হয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবার দুপুুর হয়ে গেলেও কোনো খাবার আসেনি। চার সন্তানকে আগের দিনের বাঁচিয়ে রাখা খাবার অল্প অল্প করে তিনি দিয়েছিলেন। তবে তার নিজের ভাগ্যে কোনো খাবার জোটেনি।

সিলেট নগরীর সাহেবের বাজার হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে আশ্রয় নিয়েছেন শতাধিক বানভাসি। গতকাল বিকালে সেখানে আশ্রয়কেন্দ্রের নিচতলায় কথা হয় মিলন্তী রানীর সঙ্গে। তিনি বলেন, সিলেটের মোটরঘাট এলাকায় তাদের বাসা। স্বামী অনন্ত দাস আর তিনি খেয়ে না খেয়ে সংসারের ফার্নিচারসহ আসবাবপত্র বানিয়েছিলেন। বানের পানিতে এখন আর কিছুই নেই। আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন প্রায় সাত দিন। বানের পানি নামতে শুরু করেছে। কিন্তু বাড়ি ফিরবেন কীভাবে, খাবেন কী, আর থাকবেনই বা কোথায়! বন্যা তার সব শেষ করে দিয়েছে।

মিলন্তী রানীর যে এলাকায় বাড়ি, সেই কাজীনগর ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য নেসারুন নেসা। গতকাল বিকালে তিনি আশ্রয় নেওয়া মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। নেসারুন নেসা বলেন, তার নিজের বাড়িও বন্যার পানিতে ডুবেছে। প্রতিদিনই তিনি এসে এলাকার মানুষের খোঁজখবর নেন। তার এলাকার মানুষ নিম্নআয়ের। তাদের কোনো ব্যাংক-ব্যালেন্স নেই। কাজ করে যা আয় করত, খাওয়া-দাওয়া আর আসবাবপত্র কিনেই শেষ। তারা কিছু ধানচাল সঞ্চয় করে রাখে। কিন্তু বন্যার পানিতে সব শেষ। বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু আতঙ্ক কাজ করছে। এই আশ্রয়কেন্দ্রে তো আর দীর্ঘদিন থাকতে পারবে না। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে চলে যেতে হলে তারা থাকবে কোথায়, আর খাবেই বা কী!

আকলিমা খাতুন নামে এক নারী বলেন, তিনি ছয় হাজার টাকায় ভাড়া থাকতেন। টাকা-পয়সা আর জমানো সম্পদ সব পানিতে ভেসে গেছে। কিছুই নেই। এর মধ্যে বুধবার বাড়ির মালিক ভাড়া চেয়েছে। কিন্তু কাছে এক পয়সাও নেই। তিনি বলেন, ‘একযুগ ধরে থাকা বাসায় আর ফেরা হবে না। কোথায় যাব, তাও জানি না। জীবনে যে এমন দুঃসময় আসবে, ভাবতেই পারিনি। এখন শুধু আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

দৈনিক আমাদের সময়ের সিলেট ব্যুরো জানায়, সুরমা অববাহিকায় উন্নতি হচ্ছে বন্যা পরিস্থিতির। তবে কুশিয়ারার পানি বাড়তে থাকায় বেশ কয়েকটি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সিলেটে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এরই মধ্যে এক লাখ ২৫ হাজার মানুষ বাড়ি ফিরেছেন বলে জানিয়েছে সিলেট জেলা প্রশাসন। ফলে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যাও কমেছে ১৫টি।

এদিকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় ছয় দিন পর সচল হয়েছে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে এই বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা শুরু হয়।

কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জে গতকাল ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন পুলিশের আইজি বেনজীর আহমেদ। ত্রাণ দেওয়ার খবর পেয়ে আশপাশের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে শত শত মানুষ ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে ভিড় করেন।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সেখানে বেশিরভাগ বানভাসি পর্যাপ্ত খাবার ও চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। শহরের নবীনগরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে আশ্রয় নেওয়া সাবিয়া বেগম নামের এক নারী বলেন, ‘বন্যায় ঘর ভাইঙা গেছে। খন্দকার হাসপাতালে আট দিন আছিলাম, কেউ কোনো সাহায্য দিছে না। পানি কমছে, কিন্তু ঘর ভাইঙা পইড়া গেছে, কই থাকমু?’

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম দৈনিক আমাদের সময়কে বলেন, ‘গতকাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ১০৩৫ টন চাল, ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ও ১৭ হাজার বস্তা শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।’