advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বন্যার অবনতি কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়
শাহজাদপুরে যমুনায় বিলীন ৪শ বাড়িঘর

আমাদের সময় ডেস্ক
২৪ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জুন ২০২২ ১১:২৩ পিএম
advertisement

তিস্তা, ধরলা, দুধকুমর ও ব্রহ্মপুত্রসহ উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। এর ফলে বগুড়া, গাইবান্ধায় ও কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে কমেনি দুর্ভোগ। সে সঙ্গে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে নদীভাঙন। পাবনার শাহজাদপুরে এক সপ্তাহে ৪শ বাড়িঘর যমুনায় বিলীন হয়েছে।

advertisement

এদিকে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বন্যার আরও অবনতি হয়েছে। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন হাওরেও পানি বাড়ছে। এ তিন জেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। কয়েকটি আঞ্চলিক সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ভেসে গেছে পুকুর মাছের ঘের। এ ছাড়া হবিগঞ্জ জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার ১০টি উপজেলার ৬৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার এক লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এরই মধ্যে ১৩ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। বানের জলে ভেসে গেছে কয়েকশ মাছের ঘের ও পুকুর। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে গবাদি পশুরও।

জেলা প্রশাসক মো. শামীম আলম জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্রতিদিন ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৫১৫ জনকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। ২৫৯টি

আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১৪ হাজার মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জানান, বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার সরাইল-অরুয়াইল সড়ক। এর ফলে যানবাহন চলাচল করছে ঝুঁকি নিয়ে।

এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ৩টি পয়েন্টে সড়কের ওপর দিয়ে প্রবল স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে বন্যার পানি। কোথাও কোথাও বোঝার উপায় নেই এটি সড়ক নাকি হাওর। তীব্র স্রোতের কারণে উভয় পাশ দিয়ে ভাঙছে সড়ক। ভাঙন অব্যাহত থাকলে সড়কটি হাওরে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

পাকশিমুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাওছার হোসেন বলেন, গত দুদিন ধরে পানি বাড়ছে। এভাবে বাড়তে থাকলে সরাইল উপজেলা সদরের সঙ্গে পাকশিমুল ও অরুয়াইল ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, তিতাস নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে নাসিরনগর, সরাইল ও নবীনগর এলাকার নিম্নাঞ্চল বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া জানান, যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে বগুড়ায়। অন্যদিক বৃদ্ধি পাচ্ছে বাঙালি নদীতে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিপদসীমা অতিক্রম করেছে বাঙালি নদীর পানি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিক থেকে বাঙালির পানি বিপদসীমার ৫ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার প্রায় ৮৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। বন্ধ আছে সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার ৬৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান। যমুনার পানি কমে যাওয়া অব্যাহত থাকলে বানভাসিদের দুর্ভোগ কাটতে সময় লাগবে আরও কিছুদিন। পানিবন্দি মানুষদের মধ্যে সারিয়াকান্দিতে ৫৮ হাজার, সোনাতলায় ২১ হাজার ও ধুনটে ১ হাজার জন রয়েছেন।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, পদ্মা-যমুনার পানি এখনো বিপদসীমার নিচ দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। তবে প্রতিদিনই যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে বাড়তে থাকলে যে কোনো সময় পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। ইতোমধ্যে যমুনার পানি বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করছে।

পাউবো উত্তরাঞ্চলীয় পরিমাপ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদ হোসেন বলেন, ‘পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে বৃহস্পতিবার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৭৪ সেন্টিমিটার। যা বিপদসীমার ৪ দশমিক ৫১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা নদীর নগরবাড়ি পয়েন্টে ৯ দশমিক ৬৩ সেন্টিমিটার অতিক্রম করছে। যা বিপদসীমার ০ দশমিক ৪৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে আত্রাই বাঘিবাড়ি পয়েন্টে ১০ দশমিক ৫২ সেন্টিমিটার অতিক্রম করেছে। যা বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, গত এক সপ্তাহে এই ইউনিয়নের ভেকা, ঘাটাবাড়ি, জালালপুর ও পাকুরতলা গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩০টি ঘরসহ এই চার গ্রামে অন্তত সাড়ে ৪শ বাড়িঘর যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে পাকুরতলা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এ পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো সরকারি-বেসরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পৌঁছায়নি বলে জানান ভাঙনকবলিত এসব মানুষ।

এ বিষয়ে জালালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ বলেন, স্থানীয় ইউপি সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। গত ৭-৮ দিনে আমাদের ভেকা, ঘাটাবাড়ি, জালালপুর ও পাকুরতলা গ্রামের প্রায় ৪-৫শ বাড়িঘর যমুনা নদীতে ভেঙে গেছে। এর মধ্যে পাকুরতলা গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩টি শেডের ৩০টি ঘর ভিটেসহ নদী চলে গেছে।

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারের ত্রাণ তহবিল থেকে তাদের সাহায্য-সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে পানি ২১ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহর পয়েন্টে ১৭ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ ছাড়া তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি বিপদসীমার নিচে রয়েছে।

এদিকে পানি কমতে শুরু করায় বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও তাদের দুর্ভোগ কমেনি। তবে বন্যার পানি সম্পূর্ণ নেমে না যাওয়া পর্যন্ত মানুষের কষ্ট লাঘব হবে না। বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক কুড়িগ্রাম জানান, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমর ও ব্রহ্মপুত্রসহ সবকটি নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী পয়েন্টে ২৫ ওপরে। নুনখাওয়া পয়েন্টে মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার ও তিস্তা কাউনিয়া পয়েন্টে ৪২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। কিন্তু গত ১০ দিন ধরে পানিতে থাকা দুই লক্ষাধিক বানভাসির দুর্ভোগ কমেনি। বন্যা যত স্থায়ী হচ্ছে ততই দুর্ভোগ বাড়ছে বানভাসি মানুষের।

এদিকে চারণভূমিসহ মাঠ-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় গোখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্গত এলাকায় বানভাসিদের খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির অভাব চলছে। নদীর পাশে বাঁধে ও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বন্যার্তরা রয়েছেন কষ্টে।

এ ছাড়া নৌকার ওপর বাস করা মানুষজনের শৌচাগারের অভাবে স্যানিটেশন সমস্যায় রয়েছে। অন্যদিকে দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে ডায়রিয়া, জ্বর ও হাতে-পায়ে ঘা। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ৮৫টি মেডিক্যাল টিম খাবার স্যালাইন ও ওষুধ বিতরণ করলেও পাচ্ছেন না অনেকেই সেই সেবা। তা ছাড়া কষ্টে থাকা এসব মানুষের ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপদসীমার ওপর থাকলেও এখন দ্রুত কমে যাবে। দ্রুত বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ শহরের হার্ডপয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার কমে পেয়ে বৃহস্পতিবার সকালে বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে পানিবন্দি ও ভাঙনকবলিত মানুষের মাঝে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে নগদ অর্থ ও শুকনো খাবার। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, যমুনায় পানি কমতে শুরু করছে। আশা করা হচ্ছে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পানি কমবে।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জ জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। নিম্নাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সরকারি হিসাবে জেলার ৭ উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নের ২৩ হাজার ৪৩৫ জন পানিবন্দি রয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮০ হাজার ৩২৯ জন। এ পর্যন্ত ২২৫ টন চাল, ১০ লাখ টাকা নগদ ও ২ হাজার শুকনো খাবার প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। ২৫৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২০ হাজার ৪৬৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

আজমিরিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুলতানা সালেহা সুমি বলেন, ত্রাণের যে বরাদ্দ পাওয়া গেছে তা আশ্রয়কেন্দ্রে বিতরণ হয়েছে। বৃহস্পতিবার আরও বরাদ্দ পাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে কামালপুর, রাহেলা গ্রামে কিছু পানিবন্দি মানুষকে শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে।

advertisement