advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সম্ভাবনাময় গোপালগঞ্জে ঘটবে পর্যটনের বিকাশ

সৈয়দ মুরাদল ইসলাম, গোপালগঞ্জ
২৪ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৩ জুন ২০২২ ১১:৩৬ পিএম
advertisement

উদ্বোধনের পথে জাতির জনকের স্বপ্নের পদ্মা সেতু। দেশের প্রথম দ্বিতল এই সেতুতে চড়তে দেশের অন্যান্য জেলার ন্যায় গোপালগঞ্জেও চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

advertisement

জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে উন্নয়নের ধারায় যুক্ত করা। সে লক্ষ্যে ১৯৭২-৭৩ সালে এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য ঢাকা-খুলনা বিশ্বরোডের জন্য জমি অধিগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু। সে সময় জাপান সফরে গিয়ে বঙ্গবন্ধু উন্নত যোগাযোগের কথা চিন্তা করে পদ্মায় সেতু নির্মাণের জন্য জাপান সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সেই থেকেই জন্ম নেয় পদ্মা সেতুর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিয়েছে। গোপালগঞ্জবাসীও পদ্মা সেতু উদ্বোধনী উৎসবের অংশীদার হতে মুখিয়ে আছেন। পাশাপাশি জেলায় উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার দাবি জোরালো হচ্ছে। জেলাবাসী আশা করছেন, পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য জেলার মতো গোপালগঞ্জেও গড়ে উঠবে ভারী শিল্পকারখানা, বাড়বে কর্মসংস্থান, ঘুচবে বেকারত্ব।

পদ্মা সেতু চালুর পর জেলার অর্থনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কী কী প্রভাব পড়বে, সে নিয়ে কথা বলেছেন প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা এ প্রসঙ্গে বলেন, পদ্মা সেতু

আমাদের অহংকার, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির চাবিকাঠি। গোপালগঞ্জ একটি সম্ভাবনাময় জেলা। পদ্মা সেতু চালু হলে জাতির জনককে যারা জানতে চায়, বাংলাদেশকে যারা জানতে চায়, মুক্তিযুদ্ধকে যারা জানতে চায়, তাদের গোপালগঞ্জে আসা-যাওয়া অনেক সহজ হবে এবং এ সম্পর্কিত যে গবেষণা কার্যক্রম করা হয়, সেগুলো আরও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হবে। একইসঙ্গে গোপালগঞ্জের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে পদ্মা সেতু। যাতায়াতের অসুবিধার জন্য অনেকেই এখানে আসতে চায় না। পদ্মা সেতু চালু হলে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখানে ঘুরতে আসবে। আমি মনে করি পদ্মা সেতু গোপালগঞ্জে পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিশেষ অবদান রাখবে। বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে শিক্ষার ক্ষেত্রেও। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশ ও বিদেশের অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষালাভ করতে পারবে। গোপালগঞ্জে আন্তর্জাতিক মানের শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতালে বিভিন্ন দেশ থেকে চিকিৎসা নিতে লোকজন আসবে। ট্যুরিস্টদের আনাগোনাও বাড়বে। এখানে আন্তর্জাতিক মানের দুটি স্টেডিয়াম রয়েছে। কিন্তু আসা-যাওয়ার অসুবিধার কারণে আমরা বড় ধরনের খেলার আয়োজন করতে পারি না। কোনো আন্তর্জাতিক মানের খেলার ভেন্যু করতে পারি না। পদ্মা সেতু চালু হলে প্রতিটি ন্যাশনাল খেলার ভেন্যু আমরা এখানে দিতে পারব বলে আমি আশা করি। পদ্মা সেতু চালু হলে গোপালগঞ্জ ও এর আশপাশের অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের শিল্প কলকারখানা গড়ে উঠবে। এতে করে শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।

গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলী খান বলেন, পদ্মা সেতু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব হয়েছে। ২৫ জুন উদ্বোধন হতে যাচ্ছে পদ্মা সেতু। এটি উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে জেলার সড়ক যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে। অর্থনৈতিক কর্মকা-ে আমাদের এ অঞ্চল সমৃদ্ধ হবে, গড়ে উঠবে শিল্প কলকারখানা। গড়ে উঠবে বিভিন্ন রিসোর্ট, পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র। এগুলোতে কর্মসংস্থান হবে শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের। এই নেতা আরও বলেন, পদ্মা সেতু শুধু সেতু নয়, এর নিচ দিয়ে চলবে রেলগাড়ি। আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান মোংলা বন্দর। এই মোংলা বন্দর দিয়ে বিভিন্ন পণ্য ওঠানামা আরও বাড়বে, এর মধ্য দিয়ে দেশ আরও এগিয়ে যাবে। নিজস্ব অর্থে স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আবারও মাথা উঁচু করে দেখিয়ে দিলেন, বাঙালি বীরের জাতি। এই সেতুর মধ্য দিয়ে গোপালগঞ্জের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে।

গোপালগঞ্জ বাস মালিক সমিতির সভাপতি মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসিকতায় নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে স্বপ্নের পদ্মাসেতুর। এ সেতু গোপালগঞ্জসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা হওয়ায় দেশি-বিদেশি শিল্প উদ্যোক্তারা এখানে বিনিয়োগে ভরসা পাবেন, গড়ে তুলবেন শিল্প-কারখানা। পরিবহন খাতেও আসবে ব্যাপক পরিবর্তন। আধুনিক উন্নত সড়ক যোগাযোগের কারণে সড়ক পথে দেখা যাবে উন্নত মানের যানবাহন। সব মিলে আমাদের অঞ্চলটি হবে ব্যবসাবান্ধব। সেতুটি চালু হওয়ার কারণে একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে, তেমনি বাড়বে জমিজমার দামও। আমাদের জন্য এমন সুযোগ তৈরি করে দেওয়াতে আমি ব্যক্তিগতভাবে ও গোপালগঞ্জ বাস মালিকদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

গোপালগঞ্জ প্রেসক্লাবের মহাসচিবব সৈয়দ মিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি প্রথমেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই যে, তিনি আমাদের এমন একটি স্বপ্নের সেতু উপহার দিয়েছেন। পদ্মা সেতু বাঙালি জাতির স্বপ্নের সেতু, যা এখন বাস্তব। সেতুটি চালু হওয়ায় শুধু গোপালগঞ্জ নয়, এর সুবিধা ভোগ করতে পারবে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশবাসী। সেতুটি রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকা যেতে সময় লাগবে মাত্র দুই থেকে আাড়াই ঘণ্টা। আগে যেখানে সময় লাগত ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা। অল্প সময়ে ঢাকা যাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার কারণে অনেকে কাজ সেরে ফিরে আসতে পারবে বাড়িতে। যাতায়াত উন্নত হওয়ায় এ অঞ্চলে নতুন নতুন শিল্প উদ্যোক্তা আসবেন। গড়ে উঠবে বিভিন্ন শিল্পকারখানা। আর এই কথাটি মাথায় রেখেই ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের দুপাশের অধিকাংশ জমি কিনে শিল্পকারখানা গড়তে প্রস্তুত রয়েছেন অনেকে। শুধু শিল্পকারখানাই নয়, সেতুটি চালু হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসাবাণিজ্য ও পর্যটন ক্ষেত্রে আসবে অকল্পনীয় পরিবর্তন।

গোপালগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি কাজি জিন্নাত আলী বলেন, আমরা জাতি হিসাবে গর্বিত, গোপালগঞ্জের মানুষ হিসাবে সৌভাগ্যবান। যে জেলায় জাতির পিতার জন্ম, আমরা সেই জেলার মানুষ। স্বাধীনতা পরবর্তী গোপালগঞ্জসহ পদ্মার এ পাড়ে কোনো উন্নয়ন হয়নি বললেই চলে। অবহেলিত গোপালগঞ্জে ছিল না ভালো কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর উন্নয়নের ছোঁয়া লাগতে থাকে গোপালগঞ্জে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে দরকার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেই কাজটিই করে যাচ্ছেন। পদ্মা সেতু আগামী ২৫ জুন উদ্বোধন করবেন তিনি। এর মাধ্যমে গোপালগঞ্জকে দেশের অন্যান্য জেলার যোগাযোগ নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হবে। আমরা গোপালগঞ্জে যারা ব্যবসাবাণিজ্য করি বা নেতৃত্ব দিয়ে আসছি, আমরা জানি গোপালগঞ্জে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো শিল্পকারখানাও গড়ে উঠেনি। আশা করি, দেশ-বিদেশের বিত্তবান ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিরা আমাদের এলাকায় নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনে এগিয়ে আসবেন এবং গোপালগঞ্জ আধুনিক উন্নত জেলায় পরিণত হবে।

গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি শেখ মোশারফ হোসেন বলেন, আমরা সারাজীবনই অবহেলিত। জাতির পিতাকে হত্যার পর আর আমাদের গোপালগঞ্জে কোনো উন্নয়ন করেনি কোনো সরকার। সবাই এ জেলাকে দেখেছে খারাপ চোখে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে আমাদের এলাকায় লাগে উন্নয়নের ছোঁয়া। পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলে নতুন নতুন উদ্যোক্তা আসবে, গড়ে উঠবে বড় বড় শিল্পকারখানা, বাড়বে কর্মসংস্থান। এছাড়া পদ্মা সেতুর কারণে বেকারত্ব ঘুচাতে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে আমাদের এলাকা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. হাসিবুর রহমান বলেন, পদ্মা বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প। এটি হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সাহায্য করবে। সেতুটির নির্মাণ শুরু হয় ২০১৪ সালে এবং ২০২২ সালের জুনের ২৫ জুন যাতায়াতের জন্য উদ্বোধন করা হবে। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে ২.৫ শতাংশ এবং দেশের সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি বার্ষিক ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। পদ্মা বহুমুখী সেতু হলো একটি দ্বি-স্তরের স্টিল ব্রিজ, যার উপরের স্তরে একটি চার লেনের মহাসড়ক এবং নিম্ন স্তরে একটি একক-ট্র্যাক রেলপথ রয়েছে, যা পদ্মা রেল লিঙ্ক প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশকে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের একটি সাব রুট এবং দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ শতাংশ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ব্রিজ চালু হলে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর চালু থাকবে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, ষাট গম্বুজ মসজিদ, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজার, মাওয়া ও জাজিরায় নতুন রিসোর্টসহ পর্যটন কেন্দ্রগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে।

advertisement