advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘অগণিত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি এই ভালোবাসা নিয়েই চলে যেতে চাই’

২৮ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম
আপডেট: ২৮ জুন ২০২২ ১০:২৩ এএম
advertisement

ফেরদৌসী রহমানের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৮ জুন পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে। একাশি বছরে পা রাখলেন প্রিয় এই সংগীতমুখ। জন্ম থেকেই গানের সঙ্গে সখ্য তার। গানে হাতেখড়ি হয় বাবা প্রখ্যাত পল্লীগীতি সম্রাট আব্বাসউদ্দিনের কাছেই। পরে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ইউসুফ খান কোরেইশী, কাদের জামেরী, গুল মোহাম্মদ খান প্রমুখ সংগীতজ্ঞের কাছে তালিম নিয়েছেন। খুব অল্প বয়স থেকে তার স্টেজ পারফরম্যান্স শুরু হয়।

মাত্র ৮ বছর বয়সে ১৯৪৮ সালে রেডিওতে ‘খেলাঘর’ নামের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তখন তিনি রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম বড়দের অনুষ্ঠানে গান করেন। বিয়ের পরই ফেরদৌসী বেগম থেকে তিনি হলেন ফেরদৌসী রহমান। ১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন রেজাউর রহমানকে। তিনি একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। দুই ছেলে রুবাইয়াত ও রাজিন। তারা আজ প্রতিষ্ঠিত। সময় পেলে তিনি বিদেশে ছেলেদের কাছে বেড়াতে যান।

advertisement

১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম প্লেব্যাক করেন। এই ছবি মুক্তির আগে অবশ্য মুক্তি পায় ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিটি। এ ছবিতে তিনি গেয়েছিলেন- ‘চুপিসারে এত করে কামিনী ডাকে’। এর পর একে একে উপহার দেন ‘সাতটি রঙের মাঝে আমি মিল খুঁজে না পাই’, ‘যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে’, ‘আমি কার জন্য পথ চেয়ে রব’, ‘মনে যে লাগে এতো রঙ ও রঙিলা’, ‘নিশি জাগা চাঁদ হাসে কাঁদে আমার মন’, ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের যাদু এনেছি’, ‘এই সুন্দর পৃথিবীতে আমি এসেছিনু নিতে’, ‘এই রাত বলে ওগো তুমি আমার’, ‘বিধি বইসা বুঝি নিরালে’, ‘এই যে নিঝুম রাত ঐ যে মায়াবী চাঁদ’, ‘মনে হলো যেন এই নিশি লগনে’, ‘ঝরা বকুলের সাথী আমি সাথী হারা’, ‘আমার প্রাণের ব্যথা কে বুঝবে সই’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ওকি গাড়িয়াল ভাই’, ‘পদ্মার ঢেউরে’ প্রমুখ জনপ্রিয় গান। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফেরদৌসী রহমান ছাড়া সিনেমার গান ছিল প্রায় অচল।

এ দেশের অনেক গুণী সুরকারের সুরে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। আবদুল আহাদের সুর করা আধুনিক গান সবচেয়ে বেশি তিনিই গেয়েছেন। এ ছাড়া খন্দকার নুরুল আলম, আজাদ রহমান, জালাল আহমদ, আবদুল লতিফ, ওসমান খান, কানাইলাল শীল, আনোয়ারউদ্দিন আহমেদ, সমর দাস, সুবল দাস, অজিত রায় প্রমুখ খ্যাতনামা সুরকারের সুরে গেয়েছেন ফেরদৌসী রহমান।

১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনিই গান করেন। ‘ওই যে আকাশ নীল হলো আজ সে শুধু তোমার প্রেম’- গানটি ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত প্রথম গান।

১৯৬০ সালে ফেরদৌসী রহমান ইউনেস্কো ফেলোশিপ পেয়ে লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিক থেকে ৬ মাসের সংগীতের ওপর স্টাফ নোটেশন কোর্স সম্পন্ন করেন। প্রথম সুরকার হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ১৯৬১ সালে ‘রাজধানীর বুকে’ ছবির মাধ্যমে। ওই ছবিতে ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গে রবীন ঘোষও সুরকার ছিলেন। স্বাধীনতার পর ফেরদৌসী রহমান ‘মেঘের অনেক রং’, ‘গাড়িয়াল ভাই’ ও ‘নোলক’ ছবির সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।

বিটিভির জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’ দিয়ে সবার কাছে ‘খালামণি’ হিসেবে পরিচিতি পান। এ দেশের কয়েকটি প্রজন্মের শৈশবস্মৃতি জড়িয়ে আছে এই শিক্ষামূলক শিশুতোষ অনুষ্ঠানটির সঙ্গে। আবার তিনি এই অনুষ্ঠান করছেন।

সাত দশকের সংগীত ক্যারিয়ারে ফোক, আধুনিক, উচ্চাঙ্গসংগীত, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, ইসলামিক গান-গজল, আধুনিক গান ও প্লেব্যাকসহ সব ধরনের গানই তিনি গেয়েছেন। ৩টি লং প্লেসহ প্রায় ৫০০টি ডিস্ক রেকর্ড এবং প্রায় ২০টি গানের ক্যাসেট বের হয়েছে তার। মাত্র ১টি সিডি প্রকাশ হয়েছে ‘এসো আমার দরদী’। বাংলা ছাড়াও গেয়েছেন উর্দু, ফারসি, আরবিসহ বেশ কিছু ভাষার গান। ফেরদৌসী রহমান অবসরে আত্মজীবনী লিখছেন। বিটিভির ‘এসো গান শিখি’র অনুষ্ঠানটি আবার নিয়মিতভাবে রেকর্ড করছেন। জন্মদিন প্রসঙ্গ তুলতেই একটু আক্ষেপের কথা বললেন তিনি। আমার বাবা আব্বাসউদ্দীন আহমদকে কয়জন মনে রাখছে? আর আমার জন্মদিন মনে রেখেই কি হবে? যতদিন জীবিত আছি ততদিনই মানুষ মনে রাখে। চলে গেলে সেই মানুষকে আর মনে রাখে না। রাষ্ট্র আমার বাবাকে সেই সম্মান দিতে পারেনি। আমিও চলে যাব, ফেরদৌসী রহমানকেও কেউ মনে রাখবে না। তবে অগণিত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, এই ভালোবাসা নিয়েই চলে যেতে চাই।

পারিবারিকভাবে ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন ঘটা করে পালন করা হয় না। তিনি জানালেন, আমার জন্মদিন বাবা একবারই খুব ঘটা করে পালন করেছিলেন ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করার পর। সে জন্মদিনে অনেক কবি সাহিত্যিক লেখকরা এসেছিলেন। এরপর আর উৎসব করে জন্মদিন পালন করিনি। তবু বাইরে অনুষ্ঠান থাকলে ভিন্ন কথা। এছাড়া অন্য দশ দিনের মতোই দিনটি আমার কেটে যায়।

শুভ জন্মদিন

সম্মাননা ও পুরস্কার

লাহোর চলচ্চিত্র সাংবাদিক পুরস্কার (১৯৬৩), সর্বকনিষ্ঠ সংগীতশিল্পী হিসেবে প্রেসিডেন্ট প্রাইড অব পারফরম্যান্স পুরস্কার (১৯৬৫), টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৫), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার (১৯৭৬), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক, ১৯৭৭), একুশে পদক (১৯৭৭ সাল)। আজীবন সম্মাননা পুরস্কারসহ (২০১৫) এক জীবনে দেশ-বিদেশে আরও অনেক পুরস্কার পেয়েছেন ফেরদৌসী রহমান

advertisement