advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা
দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি

নড়াইল ও চবি প্রতিনিধি
২৮ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৭ জুন ২০২২ ১১:৫৮ পিএম
advertisement

নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের ছাত্র রাহুল দেব রায় ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়ার একটি ছবি গতকাল ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে দেখা গেছে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে জুতার মালা দিয়ে কলেজ থেকে বের করার সময় তার দুপাশে কয়েকজন পুলিশ পাহারায় ছিলেন। এ ঘটনায় শহরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসার ইমাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে এক মতবিনিময়সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়, নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর রবিউল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস, নড়াইল পৌরসভার মেয়র আঞ্জুমান আরা, মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের সভাপতি অ্যাডভোকেট অঢ়ীন কুমার চক্রবর্ত্তী, নড়াইল শাহাবাদ কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মওলানা মো. আনোয়ার হোসেন,

advertisement 3

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জেলা কমিটির সভাপতি মলয় কান্তি নন্দী প্রমুখ।

advertisement 4

মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাহুল দেব রায় নিজের ফেসবুক আইডিতে মহানবীকে (সা.) নিয়ে কটূক্তিকারী ভারতের বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার ছবি দিয়ে মন্তব্য পোস্ট করেন। এতে উল্লেখ ছিল- ‘‘প্রণাম নিও বস ‘নূপুর শর্মা’ জয় শ্রী রাম।’’ গত ১৮ জুন রাহুল কলেজে আসার পর সহপাঠীরা বিষয়টি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ^াসকে জানান। তিনি উপস্থিত শিক্ষকদের পরামর্শক্রমে রাহুলকে স্থানীয় বিছালী ফাঁড়ির পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে কলেজের শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা ক্যাম্পাসে ঢুকে শিক্ষকদের ৩টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়। এক পর্যায়ে পুলিশের লাঠিচার্জ ও এলাকাবাসীর ইটপাটকেল নিক্ষেপে কলেজ শিক্ষক ও পুলিশসহসহ ১০ জন আহত হন। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়সহ অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং এ সময় অভিযুক্ত রাহুলকে পুলিশ আটক করে পরদিন তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন। রাহুল এখন কারাগারে আছে।

গতকাল সভায় জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার দিন তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সহিংসতা এড়াতে সবাইকে নিরাপদে বাঁচিয়ে আনা। তারা অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর বিষয়টি দেখেননি। তারা গেটের কাছে ছিলেন। ঘটনা তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুবায়ের হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রিয়াজুল ইসলামের নেতৃত্বে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের পর সার্বিক বিষয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সভায় অধিকাংশ বক্তা অভিযুক্ত ছাত্রের বিচার দাবি করেন। তবে আইন হাতে তুলে নিয়ে শিক্ষকদের মোটরসাইকেল পোড়ানো এবং নিরাপরাধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় দোষীদের শাস্তির আওতায় আনারও দাবি তোলেন বক্তরা।

গত ২৬ জুন বিকালে সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত বড়কুলা গ্রামে ওই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ^াসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি বাড়িতে নেই। বাড়িতে তার মা বনলতা বিশ^াস এবং তার অনার্স পড়–য়া বড় মেয়ে শ্যামা বিশ^াস রয়েছেন। শ্যামা বলেন, বাবা নড়াইল শহরে কোনো এক আত্মীয়ের বাসায় আছেন। তার বাবা সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে শ্যামা দাবি করেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত ছাত্রের বাড়ি পাশর্^বর্তী বিছালী ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামে। এ ঘটনার পর ছাত্রের বাবা বাড়িতে নেই, তার মাও অপর এক ছেলের বাড়িতে রয়েছেন।

কলেজের কয়েক শিক্ষক বলেন, অধ্যক্ষ কোনো অন্যায় না করলেও তাকে এভাবে অপমান করায় তিনি মুষড়ে পড়েছেন। কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে গ্রুপিং এবং অধ্যক্ষের পদ দখলের অভিপ্রায়ের কারণে তাকে আজ এই অপমান সইতে হয়েছে।

মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও শিক্ষক নেতা রওশন আলী বলেন, যা ঘটেছে তা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও হতাশাজনক। এ ঘটনা শিক্ষক সমাজকে হেয় করা হয়েছে। ঘটনার আরও ভালো সমাধান হতে পারত।

মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজ পরিচালনা পরিষদে ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অচিন কুমার চক্রবর্ত্তী বলেন, ঘটনার দিন আমি ঢাকায় ছিলাম। শুনেছি কলেজের অধ্যক্ষকে জুতোর মালা পরানো হয়েছিল, যা অতীব দুঃজনক। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনার পর কলেজ বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশে পরিস্থিতি বিবেচনায় ঈদের পর কলেজ খুলবে।

চবির শিক্ষকের প্রতিবাদ

সম্প্রতি নড়াইলে পুলিশের সামনে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে তাকে হেনস্তা করার ঘটনায় ‘আমিও স্বপন কুমার বিশ্বাস’ প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জিএইচ হাবীব। তার সঙ্গে প্রতিবাদ জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হক। তারা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। গতকাল সকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তারা প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানান।

জি এইচ হাবীব বলেন, শিক্ষক হিসেবে মনে হয়েছে এটা আমার দায়িত্ব। একটু দেরি হয়েছে, আরও আগেই দাঁড়ানো দরকার ছিল। বর্তমানে শিক্ষকরা বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাদের কাক্সিক্ষত মর্যাদা পাচ্ছেন না। তাই আমার মনে হলো এভাবে আর নয়। আজ আমরা দুজন স্বপন স্যারের হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছি। তবে অনেকেই আমাদের পাশে আছেন।

advertisement