advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পবিত্র হজে যেতে ডিজিটাল প্রতারণা

রাশেদ রাব্বি
২৯ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৯ জুন ২০২২ ১০:০০ এএম
পুরোনো ছবি
advertisement

হজে যেতে ফ্লাইটে ওঠার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কোভিড-১৯ পরীক্ষা করানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হলেই কেবল পবিত্র মক্কা নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করা যাবে। আর পজিটিভ হলে পবিত্র ইচ্ছা মনেই সুপ্ত রাখতে হবে। কিন্তু চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করে শুধু কোভিড পজিটিভ হওয়ার কারণে পবিত্র হজ পালনে ব্যর্থ হবেন, এমনটি যেন কেউই মেনে নিতে পারছেন না। তাই আশ্রয় নিতে হচ্ছে ডিজিটাল প্রতারণার। ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা দিলেই পাল্টে যাচ্ছে সার্ভারের তথ্য। পজিটিভ রিপোর্ট নেগেটিভ করে মিলছে হজ ফ্লাইটে ওঠার সুযোগ।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, চলতি মাসের ৫ জুন থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হয়েছে। আবার জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দেশে বাড়তে শুরু করেছে করোনার সংক্রমণ। এতে হজযাত্রী ও ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেননা, হজে যেতে কোভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ বাধ্যতামূলক। হজ গমনেচ্ছুরা মনে করছেন, যদি করোনা পজিটিভ হয় তা হলে পুরো টাকাই গচ্ছা। তাই কী করা যায়- জানতে সবাই যোগাযোগ করছেন নিজ নিজ ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর সঙ্গে। আর সেটিকে বাড়তি টাকা আয়ের সুযোগ হিসেবে নিয়েছে এজেন্সিগুলো। সুরক্ষা অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত একটি দুষ্টচক্রের যোগসাজোশে দেদার করোনা পজিটিভ রোগীকে নেগেটিভ দেখিয়ে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে পবিত্র মক্কা নগরীতে। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যবহার করা হচ্ছে কোলন সার্ভার।

advertisement 3

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর কাফরুলের ৬২ বছর বয়সের এক নারী হজযাত্রী গত ২৩ জুন একটি সরকারি ল্যাব থেকে কোভিড-১৯ পরীক্ষা করান। খুদেবার্তায় ফল আসে তিনি করোনা পজিটিভ। অথচ পরদিনই তিনি হজে যেতে বিমানবন্দরে যান। সরকারি ওই ল্যাবটির কর্তৃপক্ষ তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে দেখে, তাদের পক্ষ থেকে ওই যাত্রীর পজিটিভ রিপোর্ট সরবরাহ করা হলেও বিমানবন্দরে দেখানো হচ্ছে নেগেটিভ। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সার্ভারে অনৈতিকভাবে যাত্রীদের তথ্য পরিবর্তন করে দেওয়া হচ্ছে।

advertisement 4

অপর এক ব্যক্তির সরকারি সার্ভারে পজিটিভ রিপোর্ট থাকলেও বোর্ডিংয়ের সময় সঙ্গে থাকা সনদে নেগেটিভ দেখে ছেড়ে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তার করোনা পজিটিভ নিশ্চিত করা হলেও সেই যাত্রীকে আর ফেরানো সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলেন, এ ধরনের ঘটনা এই একটি-দুটিই নয়, সম্প্রতি পজিটিভ রিপোর্ট নেগেটিভ দেখানো একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সরকারি পর্যায়ে কিছু কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তি পরিচয় দিয়ে বিনামূল্যে এটি করিয়ে নিয়েছেন। আর যাদের যোগাযোগ নেই তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে নেগেটিভ রিপোর্ট কিনে নিচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) বিভাগের ১৩ জন সদস্যকে হজ ক্যাম্পে হজযাত্রীদের কোভিড-১৯ সম্পর্কিত তথ্য অন্তর্ভুক্তির দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়েছে। যার মধ্যে থেকে কয়েকজন অতি গোপনে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর চাহিদামতো পজিটিভ রোগীর সনদ নেগেটিভ দিখেয়ে দিচ্ছেন। এ কাজের জন্য হজযাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। সম্প্রতি হজযাত্রীদের ক্ষেত্রে চলমান এ ধরনের অনৈতিক কার্মকাণ্ডের বিষয়টি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আসে। এর পর তারা সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এমআইএস-এর একাধিক কর্মী জানান, এ বিভাগের একজন উপপরিচালক সুরক্ষা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে রয়েছেন। ওই কর্মকর্তার জ্ঞাতসারেও পজিটিভ রিপোর্ট নেগেটিভ করার কাজ হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমআইএসের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য আমার জানা নেই। জুন ক্লোজিং নিয়ে ভিষণ ব্যস্ত সময় পর করছেন। তবে সংশ্লিষ্ট যারা এ কাজে নিয়োজিত তাদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।

জানা গেছে, চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে হজ ফ্লাইটে ওঠার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কোভিড-১৯ পরীক্ষার নেগেটিভ রিপোর্ট সঙ্গে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ছাড়া, করোনা টিকা গ্রহণ করলেই চলবে না, টিকা গ্রহণের সনদ অবশ্যই সঙ্গে নিতে হবে। এমন নির্দেশনা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের। কোভিড টিকা ও টিকার বুস্টার ডোজ নেওয়ার ক্ষেত্রে সনদ হজের পুরো সফরে ব্যবহারের লক্ষ্যে একাধিক কপি/আইডি কার্ড আকারে লেমিনেট কপি প্রস্তুত রাখতেও বলা হয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া কোভিড টিকা নিয়ে থাকলে অথবা ‘সুরক্ষা’ অ্যাপসে টিকা নেওয়ার তথ্য আপডেট না থাকলে, এমন হজযাত্রীকে টিকার তথ্য ‘সুরক্ষা’ অ্যাপসে অন্তর্ভুক্তি করে সনদ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৫৭ হাজার ৫৮৫ জন মুসল্লি পবিত্র হজ পালনের সুযোগ পাচ্ছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৫৬৪ জন ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫৩ হাজার ৫৮৫ জন মুসল্লি পবিত্র হজে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২১ জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ২৮ হাজার ৩০৯ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় গেছেন ৩ হাজার ৩৮৫ জন। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেছেন ২৪ হাজার ৯২৪ জন। এবার সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি হজ প্যাকেজ রয়েছে। প্রথম প্যাকেজে খরচ ৫ লাখ ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা। দ্বিতীয় প্যাকেজে খরচ ৪ লাখ ৬২ হাজার ১৫০ টাকা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ প্যাকেজের খরচ কোরবানি ছাড়া ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭৪৪ টাকা।

advertisement