advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

টেক্সাসে পরিত্যক্ত লরিতে ৫০ অভিবাসীর মরদেহ

জাহাঙ্গীর সুর
২৯ জুন ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ২৮ জুন ২০২২ ১১:২০ পিএম
advertisement

১৮ চাকার লরি। রেলপথের পাশে পরিত্যক্ত পড়ে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের সান অ্যান্টোনিওতে। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক পৌরকর্মী। হঠাৎ তার কানে ভেসে এলো করুণ এক সুর : কে আছ, বাঁচাও দয়া করে। আওয়াজ আন্দাজ করে এগোতে গিয়ে তিনি পৌঁছলেন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটার কাছে, যার চালক আসনে নেই। ঝাঁপগুলো লাগানো। ভেতর থেকেই ভেসে আসছে আর্তনাদের ভারী কণ্ঠস্বর।

advertisement 3

জানার পর পুলিশ উদ্ধারে গিয়ে যখন

advertisement 4

ঝাঁপ খুলল, তখন যা দেখা গেল, তা এক কথায়- জীবন-মৃত বাস্তবতা। শখানেক মানুষে ঠাসা ভেতর, এদের অর্ধেক জীবিত, আর বাকি অর্ধেক মৃত। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী শ্রোয়েডিঙ্গারের চিন্তা-নিরীক্ষাকেও যেন হার মানিয়ে দিল এই বেদনাদায়ক বাস্ততবতা। শ্রোয়েডিঙ্গারের বাক্সবন্দি কাল্পনিক বিড়াল ঝাঁপ খুলে না দেখা পর্যন্ত জীবন-মৃত (একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত) থাকে, ঝাঁপ খুললে হয় বিড়ালটি জীবিত নয়তো মৃত দেখা যায়। কিন্তু বাক্সবন্দি এই শরণার্থীর দল বাস্তবে ঝাঁপ খোলার পর একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত। ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

ধারণা করা হচ্ছে, প্রচ- তাপে মূর্ছা গিয়ে এদের মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম দি ইনডিপেডেন্টের সাংবাদিক রিচার্ড হল টুইটারে বলেছেন, ‘তীব্র তাপে তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।’

এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়েছে। রাজ্যের রিপাবলিকান দলীয় গভর্নর এই করুণ মৃত্যুর জন্য ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উন্মুক্ত সীমান্তনীতিকে দায়ী করছেন। এ জন্য অবশ্য রাজ্যের প্রভাবশালী ও স্বনামধন্য আইনজীবী সারা স্পেক্টর টুইটারে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবোটকে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আপনি আসলে টেক্সাসের পুতিন।’ ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসন চালানোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে ডেমোক্র্যাট মার্কিনরা ‘সন্ত্রাসের সম্রাট’ হিসেবে বিবেচনা করছে। সেই দিক থেকেই অ্যাবোটকে পুতিনের সঙ্গে তুলনা করছেন অনেক বাইডেন সমর্থক।

স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোয় বলা হচ্ছে, লরির ভেতর যাত্রী ছিল ১০০ জন। প্রথমে এদের মধ্যে ৪২ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়। এক অগ্নিনির্বাপণ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লরি থেকে উদ্ধার করা আরও অন্তত ১৬ জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে চারটি শিশুও ছিল। পরে মৃতের সংখ্যা বেড়েছে এবং আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মেক্সিকোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্সেলো এবরার্দের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ২২ জন মেক্সিকোর নাগরিক, সাতজন গুয়াতেমালার ও দুজন হন্ডুরাসের নাগরিক।

সান অ্যান্টোনিওর যে স্থানে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে। এই পথটি মানবপাচারের পথ হয়ে উঠেছে বলে বিবিসি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। এর আগে ২০১৭ সালে এই টেক্সাসের দক্ষিণাঞ্চলেই এ রকম পরিত্যক্ত লরি থেকে ১০ অভিবাসীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় চালককে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়েছিল।

এবারের অভিবাসী মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে সান অ্যান্টোনিওর মেয়র রন নিরেনবার্গ বলেছেন, ‘ওদের পরিবার আছে। তারা উন্নত জীবনের আশায় বেরিয়ে পড়েছিলেন পথে। এ এক হৃদয়বিদারক, মানবিক বিপর্যয়।’

সান অ্যান্টোনিওর দমকল বাহিনীর প্রধান চার্লস হুড সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা যে লরির ঝাঁপ খুলে লাশের স্তূপ দেখব, এটা কল্পনাতেও ছিল না।’ তিনি জানিয়েছেন, চালক পালিয়ে গেছেন আগেই, লরির ভেতর শীতাতপ ব্যবস্থা অকেজো ছিল। খাবার পানি পর্যন্ত ছিল না। সোমবার ওই এলাকায় তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বিবিসি জানিয়েছে, পুলিশ চালকের সন্ধানে নেমেছে। তবে এরই মধ্যে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর মেক্সিকো সীমান্ত পাড়ি দেওয়া সাড়ে ৬শ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সীমান্তে ১৭ লাখের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগই হন্ডুরাস, গুয়াতেমালা ও এল সালভাদরের মতো মধ্য আমেরিকা দেশগুলোর নাগরিক।

advertisement