advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সংবাদ পরিবেশের ধরনেও বাড়ে আত্মহত্যার ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ জুলাই ২০২২ ০৮:৩২ পিএম | আপডেট: ৩ জুলাই ২০২২ ০৮:৩৪ পিএম
আত্মহত্যার খবর পরিবেশনের ধরন বিষয়ক কর্মশালা । ছবি : সংগৃহীত
advertisement

দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রতিনিয়তই আত্মহত্যা ঘটনা খবরের শিরোনাম হয়ে থাকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে বছরে গড়ে ১০ হাজার মানুষ ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষপান করে আত্মহত্যা করে। এর বাইরেও ঘুমের ওষুধ সেবন, ছাদ কিংবা উঁচু স্থান থেকে লাফিয়ে পড়া কিংবা রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যাও যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার এসব খবর যদি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিবেশন করা না হয় তাহলে ওই খবরের কারণেও আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে থাকে। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত 'রেসপন্সিবল রিপোর্টিং অন সুইসাইড' শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

advertisement

অনুষ্ঠানে 'আত্মহত্যার সংবাদ: কেমন হওয়া উচিত' -এ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

এ সময় তিনি বলেন, প্রায় সময়েই সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয় ‘পরীক্ষায় ফেল করে আত্মহত্যা', আর এই ধরণের শিরোনাম পরের বছরে পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্রটিকেই মূলত আত্মহত্যার উপায় বাতলে দেয়। কারণ, এই সংবাদের শিরোনামেই পরীক্ষায় ফেল করলে কী করতে হবে, সেটির একটি বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদটিতে আত্মহত্যার ঘটনায় সহমর্মিতা দেখাতে গিয়ে আত্মহত্যাকারীকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় 'নায়কোচিত' ভূমিকায় রূপান্তর করা হয়। এমনকি এর ফল হয় ভয়াবহ।

তিনি আরও বলেন, আত্মহত্যা করলে 'মৃত আমি' অনেক সহমর্মীতা পাবো যা অনেকটা সামাজিক ন্যায়বিচারের বিকল্প হবে, এই বোধে ঘটতে পারে আরো নতুন আত্মহত্যা। সুতরাং আত্মহত্যা রোধে মিডিয়ার অনেক ভূমিকা রাখতে হবে।

এই চিকিৎসক বলেন, ২০০৮ সালে হংকংয়ের মিডিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফু কে ডাব্লিও তার এক গবেষনাপত্রে উপস্থাপন করেন যে, হংকংয়ের চাইনিজ ও ইংরেজী ভাষায় প্রচারিত সংবাদপত্রগুলোতে আত্মহত্যার সংবাদগুলো প্রকাশ না করা বা প্রকাশ করলেও অত্যন্ত কম গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করায় সেদেশে আত্মহত্যার হার ও প্রবণতা কার্যকরীভাবে কমে গেছে।

কেমন হবে আত্মহত্যার সংবাদ?

ডা. হেলাল বলেন, আত্মহত্যার সংবাদটি প্রথম পৃষ্ঠায় বা অন্যত্র খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রকাশ করা যাবে না। শিরোনামে এমন কোনো শব্দ বা বাক্যরীতি ব্যবহার করা উচিৎ নয় যা পাঠক বা দর্শককে উদ্দীপনার খোরাক দেয় আবার এমনভাবেও প্রকাশ করা যাবেনা যে আত্মহত্যা একটি স্বাভাবিক মৃত্যুমাত্র। যেমন- 'অপমান সইতে না পেরে রেল লাইনে মাথা পেতে দিলো অমুক' বা 'অভিমান করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন অমুক' ইত্যাদি আলংকারিক বাক্যরীতির চাইতে কেবল সংক্ষিপ্ত শিরোনাম দেয়া উচিৎ ‘অমুকের আত্মহত্যা'।

বিশিষ্ট এই মানসিক বিশেষজ্ঞ বলেন, পত্রিকার শিরোনামে যেন এমন কোনো বার্তা না থাকে যাতে মনে হয় আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান। যেমন- “ঋণ থেকে চির মুক্তি পেল অমুক' বা ‘প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তরুণের বিষপান' ইত্যাদি শিরোনাম যেন না হয়। কীভাবে একজন আত্মহত্যা করেছে বা করার চেষ্টা করে কেন ব্যর্থ হয়েছে, সে বিষয়গুলো যেন বিস্তারিত বিবরণ আত্মহত্যার সংবাদে না থাকে। এ ধরণের বিবরণ ভবিষ্যতে আরো একজনকে একটি ‘সফল' আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

কোন স্থান যেন 'সুইসাইড স্পট' হয়ে না উঠে-

মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, আত্মহত্যার স্থান নিয়ে যেন কোনো সংবাদ না থাকে। এক্ষেত্রে স্থানটিকে নিরাপদ রাখতে প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষকে আলাদা করে জানানো যেতে পারে। যেমন- কোনো বিশেষ উঁচু স্থান, বিশেষ পুকুর ইত্যাদিতে প্রায়ই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে বলে প্রচার মাধ্যমে সাধারণের জন্য সংবাদ পরিবেশন করা যাবে না।

ডা. হেলাল উল্লেখ করেন, বিখ্যাত নায়াগ্রা জলপ্রপাতে আত্মহত্যার বিভিন্ন খবর প্রকাশের পর স্থানটি যেন সুইসাইড স্পটে পরিণত হয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ১৮৫৬ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত নায়াগ্রা জলপ্রপাতে দুই হাজার৭৮০ জন আত্মহত্যা করে।

তিনি বলেন, আত্মহত্যার পরে মৃতদেহের ছবি বা ভিডিও ফুটেজ কোনোভাবেই প্রকাশ করা উচিৎ নয়। সেলিব্রেটি বা বিখ্যাত বা জনপ্রিয় কেউ আত্মহত্যা করে ফেললে বিষয়টিকে দ্বিগুন সতর্কতার সাথে নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে হবে।

আত্মহত্যাকারীর স্বজনদের সাক্ষাৎকারে সতর্ক হতে হবে-

একটি পরিবারের একজন ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে সে পরিবারের বাকি সদস্যরা মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত থাকে। এই অবস্থায় তার স্বজনদের সাথে কথা বলা বা সাক্ষাৎকার নেয়া খুবই খুবই সংবেদনশীল।

সেলিব্রেটিদের আত্মহত্যার খবরে প্রয়োজন অধিকতর সতর্কতা:

এ বিষয়ে করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আত্মহত্যার ঝুঁকি রয়েছে এমন মানুষেরা কীভাবে জীবনের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন, এমন ফিচার ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। একইসঙ্গে সেলিব্রেটি/আলোচিত ব্যক্তিদের আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনের সময় অধিকতর সতর্ক হতে হবে। কারণ, অধিকাংশ সময়ে মানুষ সেলিব্রেটিদের অনুসরণ করে থাকে।

তথ্য সরবরাহকারীদের উদ্দেশ্যে এ সময় বলা হয়, তথ্য উপাত্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক উৎস থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য প্রদান করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, আত্মহত্যার সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবশেনকারী সংবাদকর্মী নিজেও আত্মহত্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

এসময় আরও বলেন, বিকল্পধারার ইন্টারনেটভিত্তিক প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোর ব্যবহারকারীদেরও সতর্কতার সাথে আত্মহত্যার বিষয় নিয়ে মন্তব্য ও ছবি পোস্ট করতে হবে। এখানেও কোনো আত্মহত্যার ঘটনাকে খুব মহৎ করে দেখানোর চেষ্টা করা যাবে না।

শিরোনামে 'আত্মহত্যা' শব্দ পরিহার করা উচিত:

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এনসিডি শাখার প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শহীদুল ইসলাম বলেন, আত্মহত্যার খবর প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পলিসি হলো শিরোনামে 'আত্মহত্যা' শব্দটি পরিহার করা। এটি হয়তো আমাদের গণমাধ্যমে হঠাৎ করেই সম্ভব না। তবে, ধীরে ধীরে সেটি কমিয়ে আনতে হবে। সেক্ষেত্রে সাংবাদিকদেরই বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের মূল কাজ ছিলো আমরা কোন ট্র্যাকে ছিলাম আর এখন কোন ট্র্যাকে আছি বা যেতে হবে, এমনকি সেক্ষেত্রে করণীয়গুলো ধরিয়ে দেওয়া। আশা করি আমরা সেটি পেরেছি।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশে আত্মহত্যাকারীদের বেশিরভাগের বয়স ২১-৩০ বছরের মধ্যে। অধিকাংশ আত্মহত্যার শিকার নারীরা।

advertisement