advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ফেঞ্চুগঞ্জে বন্যার প্রভাব
আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ফিরলেও রাত কাটে নিদ্রাহীন

মো. দেলওয়ার হোসেন পাপ্পু,ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট)
৫ আগস্ট ২০২২ ০৮:৪৪ পিএম | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২২ ১২:৩৯ এএম
দেয়ালহীন ঘরে সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন সিতাই বেগম। ছবি: আমাদের সময়
advertisement

ঘরের চালা আছে, নেই মাটির দেয়াল। ভয়াবহ বন্যায় ধসে গেছে সেটি। বর্তমানে দেয়ালহীন ঘরেই সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ছত্রিশ গ্রামের সিতাই বেগম। খোলা ঘরে সন্তানদের নিয়ে নিদ্রাহীন রাত কাটছে তার। পানি কমলেও রাতে সাপ-বিচ্চুর ভয়ে ঘুম আসে না। ছেলেদের আয়ে সংসার চলে না যথারীতি, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সেখানে ঘর মেরামত যেন কল্পনাপ্রসূত কিছু।

শুধু সিতাই বেগম নন, ফেঞ্চুগঞ্জে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত আরও অনেক পরিবার। বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ফিরেছেন তারা। তবে বিভিন্ন গ্রামের এসব মানুষের জীবন কাটছে দুঃসহ কষ্টে।

advertisement

ছত্রিশ গ্রামের ইন্তাজ আলী বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় নিজের ঘর এখন বসবাসের অযোগ্য। মেরামতে প্রয়োজন অনেক টাকা। তাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত হয়ে আছি।’

মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন উপজেলার বাঘমারা গ্রামের মিন্টু মিয়া। বন্যায় বাড়িঘরে পানি উঠলে স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেন। মা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানসহ একই ঘরে বসবাস করেন।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পানি থাকায় ঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও ঘর মেরামত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

পার্শ্ববর্তী পিঠাইটিকর গ্রামের তইরা বেগম ও আসারা বেগম জানান, তাদের ভাঙা ঘরে খুব কষ্টে রাত কাটাতে হয়। চাল ও বেড়ার বেহাল অবস্থা তাদের।

সম্প্রতি বন্যা কবলিত এলাকাগুলো নৌকাযোগে ঘুরে এসব চিত্রই দেখা গেছে। দুর্গত মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার কাহিনী।

দুর্ভোগের কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে চুপ হয়ে যান সিতাই বেগম। ছবি: আমাদের সময়

 

বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো ঘরে ফিরলেও রয়েছেন চরম উৎকণ্ঠায়। তাদের দুর্ভোগ যেন দেখার কেউ নেই। আশ্রয় কেন্দ্রে খাবার পেলেও ঘরে ফিরে খাবার জোগাড় করার দুশ্চিন্তা তাদের। ভাঙা ঘরে যখন উনুন জ্বলে না, তখন রাতে ভয় ধরায় বৃষ্টি।

জানা গেছে, ভয়াবহ বন্যায় ফেঞ্চুগঞ্জের অনেক এলাকা প্লাবিত হয়। দীর্ঘ একমাস ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে ছিল। কুশিয়ারা নদীর পানি কমলেও রেখে গেছে দুর্ভোগ। আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা মানুষজন ঘরে ফিরলেও বাড়িঘর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভাঙা ঘরেই তাদের নিদ্রাহীন রাত কাটছে।

সরেজমিনে দেখা যায়- উপজেলার ছত্রিশ, পিঠাইটিকর, বাঘমারা, ঘিলাছড়ার পূর্ব যুধিষ্টিপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। মানুষজন বাড়িঘরে ফিরে ফের জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন।

ঘিলাছড়া ইউনিয়নের পূর্ব যুধিষ্ঠির গ্রামের আকামুল বলেন, ‘বন্যায় ঘর ভেঙে পড়ে গেছে। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে ফিরে এখন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।’

একই অবস্থা সাহেলা বেগমের। বন্যায় ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন ভাইয়ের বাড়িতে। অর্থাভাবে জীর্ণ কুটির মেরামত করতে পারছেন না তিনি। মাটির ঘরের চাল নেই, বেড়া নেই। তাদের দেখতে আসা লোকজন কেবল সান্তনা দিয়েই চলে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারের বন্যায় উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের অন্তত পাঁচ সহস্রাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সান্তনা বলতে কেবল ত্রাণসামগ্রী পেয়েছেন তারা। তবে সরকার থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর মেরামতে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হলেও সেই টাকা অনেকের ভাগ্যে জোটেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইউপি সদস্যদের কাছের কিংবা তার অধীনস্থ মানুষদের নাম উঠেছে তালিকায়। অভিযোগ উঠেছে- প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বঞ্চিত হয়েছেন ওই টাকা থেকে।

ফেঞ্চুগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি রিয়াজ উদ্দীন ইসকা বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে এগিয়ে আসা জরুরি। খাদ্যসামগ্রীর চেয়ে বেশি প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামত করে দেওয়া।’

ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বাধন কান্তি সরকার বলেন, ‘এবারের বন্যায় ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৫ হাজার ৪৫৩টি। এর মধ্যে ৫টি ইউনিয়নের ২২৫টি পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা প্রতিটি ইউনিয়নের ৪৫টি পরিবারকে দেওয়া হয়েছে। প্রতি পরিবার পেয়েছে ১০ হাজার টাকা করে। এছাড়া বরাদ্দ পাওয়া ৫০টি পরিবারের জন্য ৫০ বান ঢেউটিনের সঙ্গে প্রত্যেককে তিন হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।’

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী সুদর্শন সরকার বলেন, ‘এবারের বন্যায় ফেঞ্চুগঞ্জে কাঁচা-পাকা প্রায় ৮২ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মেরামত করতে প্রায় ৫৭ কোটি টাকা প্রয়োজন।’

advertisement