advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি

অজয় দাশগুপ্ত
৯ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ৯ আগস্ট ২০২২ ০১:২৬ এএম
advertisement

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখন ভালো। দ্রব্যমূল্য বাড়ছে বলে যারা হা-হুতাশ করছেন, তাদের বলি- পুরো দুনিয়ায় এখন বেহালে চলছে। সিডনিতে বাজারে আগুন। ডলারে দাম হাঁকার পরিমাণ শুনলে চোখ কপালে উঠবে। ফুলকপি, বেগুন, টমেটো থেকে পালংশাক বা সবজির দাম এমন পর্যায়ে যে, কেউ হাত দিতে পারছেন না। খাবার টেবিলে কেবল মাংস দিয়ে কি চলে? তেলের বাজারও চড়া। সম্প্রতি জ্বালানির দাম বাড়লেও এখন কমছে। সব মিলিয়ে অবস্থা বেগতিক। ফাস্টফুডের এই সমাজেও জ্বলছে আগুন। এই হাল বাংলাদেশে আছড়ে পড়বে- এটিই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে রাজনীতি মিশিয়ে অবস্থা শোচনীয় করে তোলা অন্যায়। ধান ভানতে শীবের গীত থাক, বলছি বঙ্গবন্ধুর ইমেজের কথা।

advertisement 3

দুনিয়ার বহু দেশের চেয়ে ভালো অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন, বাংলাদেশ একটি অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশ। এই দেশের জনক আর ইতিহাস এক গৌরবের অধ্যায়। পঁচাত্তরের আগস্ট মাসের যে কলঙ্ক আমাদের গৌরবকে কালিমালিপ্ত করেছিল, তা থেকে পরিত্রাণের উপায় বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে তোলা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারি দলের নেতারা মুখে বললেও ওই কাজ এখনো বাইরের দুনিয়ায় দানা বাঁধেনি। হয়তো অনেকেই জানেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও কীর্তির কথা এখনো সেভাবে প্রচার পায়নি। প্রচার লাভ করেনি তার ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা। এ কারণে শোকের মাসে আমাদের মনোযোগ এখন ওইদিকে ধাবিত হওয়ার দরকার দেখি।

advertisement 4

এই যে অজ¯্র কবিতা ও গল্প লেখায় তাকে স্মরণ করা, বই বের করা- এর নিশ্চয়ই গুরুত্ব আছে। এর ভেতর দায়বোধ ও আবেগ আছে। কিন্তু ওই পরিমাণ গবেষণা কিংবা নানা ভাষায় তার উদ্ভাস হয়নি এবং হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশ শাসনে। এখনো যদি সেটি না হয়, তা হলে কখন হবে? দেশের দিকে তাকালে কী দেখি?

এ মাস শুরু হতেই মিডিয়াসহ সমাজে শোকাবহ একটি আবেগময় পরিবেশ তৈরি হতে থাকে। তা স্বাভাবিক। কিন্তু শোকের এই মাস এতদিনে যে শক্তি আর সাহসে জেগে ওঠার কথা, তা কি হয়েছে? সবার কথা বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কথাই বলি। তিনি যে দুঃখ করে বললেন, সেদিন কোথায় ছিলেন এত নেতা? এ কথাটি কি মিথ্যা?

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট আমার মনে পড়ে। আমি তখন এসএসসির ছাত্র। ওইদিনের সকালবেলটা একদিকে যেমন বেদনা ও দুঃখের, আরেকদিকে ছিল তেমনি বিস্ময় এবং ঘৃণার। সাধারণ শঙ্কিত মানুষজন ত্রস্ত পায়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল কেউ বাজার সেরে, কেউ বা নামাজ শেষ করে। আর কৌতূহলী সব মানুষ দেখছিল কী ঘটছে! আমাদের ধারণা ছিল, কোনো একটা সময় মানুষের উত্তাল প্লাবন আর শোকের মাতমে সবকিছু চলে আসবে আয়ত্তে। কিন্তু তা হয়নি। একটি মিছিলও বের হয়নি সেদিন। ওই সন্ধ্যাটি ছিল আঁধারের ঘন বিষাদময় এক শোকাবহ সন্ধ্যা। সত্যি বলতে কী- আপনজন হারানোর পর বাড়ির যে অবস্থা হয়, সারাদেশের পরিবেশও ছিল তেমনি। তবুও প্রতিবাদে জ্বলে উঠতে পারেনি সময়। এর পরের ইতিহাস আমাদের সবার জানা।

বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ছায়ারাষ্ট্র আর বাংলাস্তান বানানোর ধান্দায় হাইজ্যাক করা হয়েছিল মূল্যবোধ। দেশ শাসকরা একের পর এক মারপ্যাঁচ লাগিয়ে বিচার বন্ধ আর দেশে হুকুমত কায়েমের ভেতর দিয়ে গড়ে তুলেছিল ভয়ের জগৎ। বহু সংগ্রাম আর ত্যাগের পর ২১ বছর বাদে আওয়ামী লীগ দেশ শাসনে এলেও পাঁচ বছরের মাথায় আবার তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। এর পরের শাসন আমল কেমন ছিল ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাই এর বড় প্রমাণ।

যখন থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশ সংহত একটি অবস্থানে চলে গেল, তখন আমরা ভেবেছিলাম বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আর অসাম্প্রদায়িক দেশ এবার আপন গতিপথে ফিরবে; গণতন্ত্র ও সাম্যের একটি বাতাবরণ তৈরি হবে সমাজে। আজকের বাংলাদেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অনেক এগিয়ে। ডিজিটাল বাংলাদেশের যে রূপ আমরা বাইরের দেশ থেকে দেখি, তা চোখ ধাঁধানো। এত সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন আগে কখনো দেখা যায়নি। শেখ হাসিনার চরম দুশমনও নত মস্তকে স্বীকার করতে বাধ্য যে, বাংলাদেশের পালে নতুন হাওয়া লেগেছে। পদ্মা সেতুসহ নানা অর্জন- খাদ্য, কৃষি, পোশাকসহ রেমিট্যান্সে বাংলাদেশ এক বিস্ময়। কিন্তু একই সঙ্গে ভয় আছে। জীবনের ভয়, জীবনযাপনের ভয়, বলার ভয়, লেখার ভয়। আছে দৌরাত্ম্য আর লুটপাট। এই এক জায়গায় বঙ্গবন্ধু এখন সবচেয়ে বেশি দরকারি। এই ব্যক্তি জীবনের শেষ দিনও এক কথা বলে গিয়েছিলেন, চোররা যেন সাবধান হয়। দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা লোকদের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করা বঙ্গবন্ধুর দল কেন তা বন্ধ করতে পারল না?

আদর্শের জায়গাটাও গোলমেলে হয়ে আছে। মনে করা হয়, মুক্তিযুদ্ধ আর একাত্তরের চেতনার নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের হাতে থাকলেই সমাজ নিরাপদ। বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা আজকের আগস্ট কি দেশ ও সমাজের সব মানুষকে ওই নিরাপত্তা দিতে পারছে? সবচেয়ে বড় কথা, আগস্টের শোক যেন উদযাপনের ভেতর শক্তি না হারায়। যে শোক আর বেদনা আমাদের শক্তি হওয়ার কথা, সেটিকে যেন আচরণ আর আড়ম্বরে নিঃশেষ করা না হয়। সামনে বৈশ্বিক সময়ও কঠিন। দেশে দেশে দ্রব্যমূল্য আর অশান্তি বলে দিচ্ছে, সাবধান থাকতে হবে। এই দৃষ্টিকোণে আমাদের দেশের সেরা নেতা জনক বঙ্গবন্ধুকে আমরা যেন সবার ওপরে স্থান দিয়ে পথ চলতে পারি। দেশ-বিদেশে বাঙালির শেষ ভরসা বঙ্গবন্ধু। শোকের মাসে নিজের লেখা দুটি পঙ্ক্তি মনে পড়ছে-

‘চোখে তখন ঠুলি ছিল

কানের ভেতর তুলা

পিতার লাশ সাথে নিয়ে

ভাসছিল বেহুলা।’

বঙ্গবন্ধু একা হন আর সবার ভেতরে থাকেন- যখন যে অবস্থানে-যেখানেই থাকুন না কেন, তিনিই আমাদের ঐক্য আর সম্মানের প্রতীক। তার দেশজ ও আন্তর্জাতিক সম্মানেই আছে বাংলাদেশ ও জনগণের চরম আনন্দ, পরম প্রাপ্তি।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক, সিডনি

advertisement