advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বে চীন-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন
১২ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২২ ০১:০২ এএম
advertisement

বিশ^ এমনিতেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের তাপে হিমশিম খাচ্ছে, বাংলাদেশসহ যখন সমগ্র ইউরোপ ডামাডোলে, জ¦ালানিসহ খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, ঠিক ওই সময়ে চীন সাগর তথা তাইওয়ান সাগরের জলে নাড়া দিয়ে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। প্রায় পঁচিশ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের এত উচ্চ পর্যায়ের কোনো রাজনৈতিক নেতা বিতর্কিত ভূখ- তাইওয়ান সফর করলেন। এর আগে হাউস স্পিকার রিপাবলিকান ‘নিউট গিম্পরিচ’ (ঘবঃি মরহমৎরপয) ১৯৯৭ সালে একইভাবে বিতর্কিত সফর করেন। তখনো চীনের যুদ্ধ প্রতিক্রিয়ায় ওই অঞ্চল উত্তপ্ত হয়েছিল। তবে সেই চীন এবং এখনকার চীনের মধ্যে যে বেজায় তফাত সেটা যুক্তরাষ্ট্র জেনেশুনেই এমন কাজটি করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

advertisement 3

এ সফর নিয়ে চীন তার যুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল কিন্তু তাতে যুক্তরাষ্ট্র কর্ণপাত করেনি। প্রত্যুত্তরে চীন অতীতের যে কোনো সময় থেকে উত্তপ্ত প্রতিক্রিয়ায় অভূতপূর্ব শক্তির মহড়ার জন্য শক্তি সমাবেশ করেছে। ইতোমধ্যেই কয়েকবার মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রথমে জাপান সাগরে, পরে তাইওয়ানের ওপর দিয়ে ছুড়েছে।

advertisement 4

প্রত্যুত্তরে যুক্তরাষ্ট্রও বসে থাকেনি। বিশে^র একমাত্র পরাশক্তি বলে কথিত যুক্তরাষ্ট্র তার প্যাসিফিক কমান্ডকে এ অঞ্চলের নতুন কৌশলগত অংশীদার আইপিএসের তথা মিত্রদের নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা অঞ্চলে বিশাল সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত করেছে। এ মহড়ায় ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও যোগ দিয়েছিল, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া। মোটামুটি চীনের কথিত আগ্রাসী মনোভাবের জবাব।

অপরদিকে হিমালয়ের উচ্চভূমি ভারতের উত্তরখ- রাজ্যের ১০০,০০০ ফুট উচ্চ অউলি নামক অঞ্চলে আগামী অক্টোবরে যৌথ সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অউলি মাত্র ১০০ কিমি. ভারত-চীন সীমান্ত হতে দক্ষিণে। যদিও চীনের তরফ হতে এ পরিকল্পনা নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি তবে এ মহড়া যে চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা বাড়াবে বই কমাবে না? যে ভারত সব সময়ই কৌশলগত স্বাধীনতার পথে ছিল, মনে হচ্ছে বর্তমানে ভারতের চীন নীতিতে সে অবস্থানে নেই। অনেকটাই পরিবর্তন আসছে যদিও ভারত একই সাথে ইউক্রেন যুদ্ধে কোনো পক্ষ নেয়নি। উপরন্তু রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে রাশিয়ার জ¦ালানির অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক ভারত। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বিশ^পরিস্থিতিতে ভারতকে হাতছাড়া করতে চাইবে না।

দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র শুধু পরাশক্তিই নয়, দুই মহাসাগরের সবচাইতে শক্তিধর শক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র এখনো অপ্রতিরোধ্য শক্তি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি যে দুই মহাসাগর ব্যাপ্ত এবং যুক্তরাষ্ট্র যে ইতোমধ্যেই চীনকে ঘিরে ফেলার যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার অন্যতম বৃহৎ অংশীধার ভারত। দেশটি কোয়াডের শুধু বৃহৎতমই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পর সামরিক দিক হতে সবচাইতে শক্তিশালী দেশ। শুধু সামরিক বা কৌশলগত কারণেই নয়, ভূ-রাজনৈতিক কারণেই ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনীতিবিদদের মতে, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর ওপর রাশিয়া তার কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন এবং রাশিয়ার পুনর্জন্মের পর পূর্বশক্তি হারিয়েছে এবং যার কারণে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর বিশ^ দুই বলয়ে বিভক্ত ছিল প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ^ এক বলয়ের মধ্যে চলে আসে। যেহেতু বিশে^ চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ছিল না এবং ক্রমেই ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের জোটকে শক্তিশালী করছিল সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই ইউরোপের ন্যাটোর মাধ্যমে তার শক্তি বহাল রাখার পরিবর্তে ক্রমেই হ্রাস করছিল। এরই মাঝে শুধু রাশিয়া নয় বরং চীন যেভাবে অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তি হয়ে উঠেছে সেদিকে তেমন নজর দেওয়া হয়নি। এমনই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষকদের মত। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ হতে হাত-পা গুটিয়ে ফেলার উপক্রমে ছিল। অপরদিকে আফগানিস্তান হতে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চাদপসরণ করেছে তাতে যে কৌশলগত পরাজয় নিশ্চিত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনতে সুযোগ দিয়েছে।

পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এসব চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইউরোপ ন্যাটোতে আগ্রহ প্রায় হারিয়ে ফেলে। গত এক দশকে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের প্রভাব কমতে দেখা যায়। এই দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করায় গণচীন। বিশেষ করে শির নেতৃত্বের উত্থানের পর। ট্রাম্প প্রশাসন তো ন্যাটোকে সচল করে ইউরোপ হতে গুটাবার রাস্তায় ছিল। তবে চীন নিয়ে উৎকণ্ঠার কমতি ছিল না।

আফগানিস্তান হতে এক ধরনের ভূকৌশলগত পরাজয়ের পর বাইডেন প্রশাসন চীন এবং রাশিয়াকে মোকাবিলার জন্য উল্লেখিত তত্ত্বের আধারে নতুন করে কূটকৌশল গ্রহণ করেছে, যার মূলে হার্টল্যান্ড হিসাবে ইউক্রেনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। অপরদিকে চীনকে মোকাবিলা করতে রিমল্যান্ড-এ যুক্তরাষ্ট্র একই সাথে তৎপর তাইওয়ানকে ঘিরে। আমি মনে করি এমনটা না হলে কেনই বা এ সময়ে এই বিতর্কিত সফরে কট্টর ডেমোক্রেটিক ন্যান্সি পেলোসির সফর। যুক্তরাষ্ট্র এ সফরের মাধ্যমে দুটি কাজ করেছে, চীনকে হুশিয়ার করা অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যে এখনো দুই বৃহৎ অঞ্চলে তার প্রভাব রাখতে সক্ষম তার পরিচয় দেওয়া। একই সঙ্গে দুটি বিস্তৃত যুদ্ধের ক্ষমতা রাখে যার উদাহরণ দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ।

১৯৯৭ সালে প্রকাশিত কার্টারের সময়ের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেবিগন্যু ব্রেজজনিস্কির

(তনরমহরবি ইৎুবুরহংশর) বহুল আলোচিত ভূকৌশলতাত্ত্বিক বই ‘দ্য গ্রেট চেসবোর্ড’ (ঞযব এৎধহফ ঈযবংংনড়ধৎফ).এই তত্ত্বে¡র বিষয়টি ব্যাপকভাবে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, যে কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরেশিয়ায় তার প্রভাব কম করা উচিত নয়। বিশ্বে এখন চীন-রাশিয়া যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে সেক্ষেত্রে ইউরোপে এবং এশিয়ার প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, কর্তৃত্ব এবং শক্তিমত্তা বজায় রাখতে হবে। তার এই পুস্তকে পূর্ব-ইউরোপ বিশেষ করে ইউক্রেনের কর্তৃত্ব কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী শক্তির বলয়ে যাতে পতিত না হয় সে বিষয়ে সাবধান করেছেন। স্মরণযোগ্য যে, এই ব্রেজজনিস্কির হাত ধরেই ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সবচাইতে বড় ছায়াযুদ্ধ (চৎড়ীু ধিৎ) শুরু হয়েছিল। যাই হোক প্রশ্ন হচ্ছে যখন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সমগ্র ইউরোপ উত্তপ্ত এবং যেখানে বাইডেন প্রশাসন ন্যাটো সম্প্রসারণে অধিক সামরিক শক্তির সমাবেশ ঘটিয়ে এক ছায়াযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে সে সময়ে এ অঞ্চলকে কেন উত্তপ্ত করছে? কেনই বা হঠাৎ চীনকে এ উত্তেজনায় টেনেছে? এর উত্তর হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ ভৌগোলিক ও ভূকৌশল চিন্তাবিদ স্যার হ্যালফোর্ড জন ম্যাকিন্ডারের তার ভূকৌশলের বিখ্যাত অন্যতম তত্ত্ব হার্টল্যান্ড এন্ড রিমল্যান্ড তত্ত্ব ‘দি জিওগ্রাফিক্যাল পিডট অব হিস্টরি’ নামক প্রবন্ধে প্রকাশ করেন। এ তত্ত্বের মূল হলো পূর্ব ইউরোপসহ তৎকালীন রাজকিম রাশিয়ার ইউরোপের অংশকে নিজের শক্তি বলয়ের মধ্যে রাখতে হলে রিমল্যান্ড, হিমালয়ের দক্ষিণ হতে ইন্দোনেশিয়া পর্যাপ্ত প্রভাব বলয় বিস্তার করতে হবে। যদিও ওই সময়ে এ তত্ত্ব নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছিল কিন্তু প্রথম বিশ^যুদ্ধে যা মূলত ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ছিল এ তত্ত্ব ধারণ করা হয়েছিল। অবশ্য দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মূলে ছিল এই তত্ত্ব। এই তত্বের আবর্তেই যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোসহ অন্যান্য সামরিক চুক্তির মাধ্যমে ইউরেশিয়া প্রভাব জোরদার করেছিল। একই সঙ্গে দুটি বিস্তৃত যুদ্ধের ক্ষমতা রাখে যার উদাহরণ দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ।

যাই হোক আমি মনে করি চীন এ সময়ে তাইওয়ান নিয়ে কোনো ধরনের যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না তবে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে তাইওয়ানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে। একই সাথে চীন তার মিত্র দেশগুলোকে তার পক্ষে রাখতে সব ধরনের প্রয়াস নিচ্ছে। এরই প্রেক্ষাপটে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং-ই দুদিনে বাংলাদেশ সফর শেষ করেছেন। এ সফরের কারণ যতই থাকুক এ বিষয় পরিষ্কার যে চীন বাংলাদেশকে এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে পাশে চাইবে। অপরদিকে বাংলাদেশ দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়েছে যে, ‘এক চীন নীতিতে বাংলাদেশ অটল। একই সাথে তাইওয়ান ঘিরে যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা প্রশমিত করতেও আহ্বান জানিয়েছে।

এ অবস্থা বাংলাদেশকে যে উভয় সংকটে ফেলেছে তাতে সন্দেহ নেই। আমি মনে করি বাংলাদেশ যে মধ্যপথ অবলম্বন করেছে সেখান হতে বিচ্যুত হবার কোনো উপায় নেই। বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হবে। তাইওয়ান তথা চীন সাগরে উত্তেজনা বাড়লে বাংলাদেশসহ বিশে^র উন্নয়নশীল দেশগুলো দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন : নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)

advertisement