advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ পুনর্বিবেচনা করা উচিত

অভিজিৎ বড়ুয়া অভি
১৩ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২২ ১২:০৭ এএম
advertisement

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও সরকার ভর্তুকি মূল্যে ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করেছিল। ফলে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এর ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জ্বালানি তেলের দাম পুনর্বিন্যাস করেছে। এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, একটি ফর্মুলা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে, যাতে তেলের দাম বৃদ্ধি পরিবহন খাতসহ গ্রাহকদের জন্য ‘সহনীয়’ স্তরে রাখা যায়। কিন্তু তা হয়নি। শুধু পরিবহন খরচ নয়, দ্রব্যমূল্যও ‘অসহনীয়’ স্তরে পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষ অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগতির কারণে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ে ভুগছেন, তার ওপর জ্বালানির দামের এই বাড়তি বোঝা তাদের জন্য অসহনীয়। কারণ তারা ইতোমধ্যে সরকারের গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে দিশাহারা। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব জনসাধারণের সহনীয় হওয়ার আগে, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে অতিরিক্ত খরচের বোঝা তাদের আর্থিক অবস্থা অসহনীয় করে তুলেছে। জ্বালানির দামের বৃদ্ধি পণ্য ও পরিষেবার খরচ বাড়িয়ে দেয় যা বাজারে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। স্পষ্টতই, এটি সাধারণ মানুষের জন্য দ্বিগুণ শাস্তি। তবে এটি অনস্বীকার্য যে, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বড় চাপের মধ্যে রয়েছে। তার পরও বলাই বাহুল্য, সাধারণ ভোক্তারা যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যস্ফীতিতে ইতোমধ্যেই বিপর্যস্ত, তখন তাদের ওপর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত খরচের চাপ মোকাবিলা করার ব্যবস্থা নেই।

advertisement 3

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে সরকার জ্বালানি তেল- অকটেন, পেট্রল, ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম এর আগে কখনো এত বাড়ানো হয়নি। এটি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, যারা ইতোমধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পণ্যের দাম বৃদ্ধির ক্রমাগত চাপের মধ্যে রয়েছে। এতে বেঁচে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে বহুমাত্রিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করে ঘাটতি সামলানোর কথা বলে জনগণের ওপর যে আঘাত দেওয়া হয়েছে তা পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে। আলোচনার পর দাম বাড়ানো হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য আরও ভালো পদক্ষেপ হতে পারত। ভোক্তাদের অধিকারকে সম্মান করা যেত। জ্বালানি তেলের দামের এই ধরনের তীব্র বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে, অর্থনীতি চলমান সংকটে রয়েছে।

advertisement 4

বাংলদেশে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির আরেকটি কারণ অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ বা মূলধনের অবৈধ স্থানান্তর। অবৈধ আর্থিক প্রবাহের ফলে বিনিয়োগ ও অর্থায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্থানগুলোর ক্ষতি হয়। আমাদের দেশের জন্য শত শত মিলিয়ন ডলার হারানো বা পূর্ববর্তী কর রাজস্বের ওপর প্রভাব ফেলে, যা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত। প্রতিবছর প্রচুর অর্থ অবৈধভাবে দেশ থেকে চলে যাচ্ছে। অবৈধ অর্থপ্রবাহের সাধারণ কারণগুলো হলো কর ফাঁকি, দুর্নীতির মাধ্যমে আয়কৃত অর্থ বিদেশে প্রেরণ, মাদক এবং চোরাচালানে জড়িত আন্তর্জাতিক অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর অবৈধ কার্যকলাপ। আমাদের দেশ থেকে অবৈধ আর্থিক বহির্প্রবাহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি কানাডা, সুইজারল্যান্ড, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ বা সিঙ্গাপুরে যায়। বাংলাদেশিদের টাকার ‘পাহাড়’ জমেছে সুইস ব্যাংকে। সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে মাত্র ১২ মাসে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ জমা করেছেন তারা। সব মিলিয়ে সুইস ব্যাংকগুলোতে এখন বাংলাদেশিদের টাকার পরিমাণ ৮ হাজার ২৭৫ কোটি। যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) বৃহস্পতিবার ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০২১’ বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখান থেকে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার এ তথ্য উঠে এসেছে। নজিরবিহীন গতিতে সুইস ব্যাংকে টাকা জমিয়েছেন বাংলাদেশিরা। সবচেয়ে দুঃখজনক সত্য হলো, আমাদের দেশের বেশিরভাগ নীতিনির্ধারক এবং ক্ষমতাসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বর দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা নেই। বেশিরভাগ নীতিনির্ধারক এবং ক্ষমতাসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বর চিকিৎসার জন্য দেশের কোনো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তাদের ভরসা নেই। বিদেশে তারা সম্পদ জমা করেন, সম্পদ কেনেন, কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বিদেশে আশ্রয় নেন, সন্তানদের বিদেশে মানুষ করেন, লেখাপড়া শেখান। যাদের এ দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন, প্রশাসন, রাজনীতি, সরকার, নিরাপত্তার ওপর কোনো ভরসা নেই, তারাই প্রতিনিয়ত আমাদের দেশের নীতিনির্ধারণ করছেন। এই কারণেই দেশের নীতিনির্ধারণে ভুল হচ্ছে। যদি একজন নীতিনির্ধারকের শেকড় দেশের মাটিতে শক্তপোক্ত না হয়, এ দেশে থাকার দৃঢ়তা না থাকে, দ্বিতীয় কোনো ব্যবস্থা থাকে তা হলে তার দ্বারা দেশের জন্য কোনো ভালো নীতিনির্ধারক হওয়া সম্ভবপর নয়।

অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বন্ধ, দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ বা মূলধনের অবৈধ স্থানান্তর বন্ধ, শুল্ক প্রত্যাহার, চোরাচালান ও কালোবাজারি বন্ধ, সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনা, অপচয় রোধ এবং জ্বালানি তেলের বাজার, সরবরাহ ও ব্যবহারে জর্জরিত দুর্নীতির মূলোৎপাটনের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কথা ভাবতে পারতেন সংশ্লিষ্ট মহল। সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সহজ চাওয়া, তাদের একটাই স্বপ্ন সহজ সরল জীবনযাপন। দরিদ্র এবং নিম্নআয়ের মানুষ, মধ্যবিত্ত শ্রেণি মুদ্রাস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বেঁচে থাকার জন্য তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে কঠিন সংগ্রাম করছে।

অভিজিৎ বড়ুয়া অভি : সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক

advertisement