advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গাজীপুরে ১২ হাজার একর বনভূমি অবৈধ দখলে

১৭৪ শিল্পকারখানার দখলেই ৪১৯.৭০ একর ১০১১০.৪ একরে বসতবাড়ি ২৩৫৭৬ জনের

ফয়সাল আহমেদ,গাজীপুর সদর
১৪ আগস্ট ২০২২ ১২:০০ এএম | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২২ ০১:০০ এএম
গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রায় এক একর বনভূমি দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রেখেছে একটি ক্যাবল কারখানা ষ আমাদের সময়
advertisement

ঢাকা বন বিভাগের আওতায় গাজীপুরে ১১ হাজার ৮৯৯ একর জমি অবৈধ দখলে চলে গেছে। একসময় এসব জমিতে বনের নানা প্রজাতির গাছপালা থাকলেও এখন অবৈধ দখলে শিল্পকারখানা ও বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। এসব জমি উদ্ধারের নামে বন বিভাগের নানা ধরনের নাটকও মঞ্চস্থ হয় নিয়মিত। বন বিভাগের তথ্য বাতায়নে সম্প্রতি বনের জমি দখলকারীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। দখলকারীদের উচ্ছেদের জন্য প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

বন বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় প্রায় ৫৯ হাজার একর বনভূমি রয়েছে। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, কাঁচিঘাটা, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, রাজেন্দ্রপুর ও ভাওয়াল রেঞ্জের আওতায় ২৭টি বিট অফিসের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দখল হয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ মোট বনভূমির প্রায় ২০ ভাগ।

advertisement

তথ্যানুযায়ী, জেলায় ১৭৪টি শিল্পকারখানা দখলে নিয়েছে ৪১৯.৭০ একর বনভূমি। এছাড়াও ৯৩৮.৫৫ একর বনভূমি দখলে নিয়েছে হাটবাজার, দোকানপাট, রিসোর্ট, কৃষিফার্ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে দখলদারের সংখ্যা ১ হাজার ৫২৯ জন। ২৩ হাজার ৫৭৬ জন দখলদার ১০ হাজার ১১০ দশমিক ৪ একর বনের জমিতে গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়িঘর। এছাড়া তারা ৫৮৩ জন ৪৩০ দশমিক ৯৯ একর বনভূমি দখল করে রেখেছেন। দখলকৃত বনভূমির মধ্যে সংরক্ষিত ৬ হাজার ৮৬ দশমিক ৮৪ একর ও অন্যান্য বনভূমির পরিমাণ ৫ হাজার ৮১২ দশমিক ৮০ একর।

advertisement 4

এদিকে ২৪৮ দশমিক শূন্য ২ একর বনভূমি নিয়ে গাজীপুর আদালতে পিওআর মামলা রয়েছে ৮৬৯টি। ৯৭৩ দশমিক ৬৩ একর বনভূমি নিয়ে নিম্নআদালতে দেওয়ানি মামলা রয়েছে ২০৭টি। বেশ কয়েক বছরে জেলা প্রশাসনের কাছে ১০৭টি উচ্ছেদ প্রস্তাব পাঠানো হলেও উচ্ছেদ মামলা রুজু করা হয়েছে মাত্র একটি।

বনের জমি উদ্ধারের নাটক : শ্রীপুরের তেলিহাটি মৌজায় ২ নম্বর খাস খতিয়ানের আরএস ২৯২৩ ও ২৯২৪ দাগের প্রায় দেড় একর ভূমির মালিক বন বিভাগ। বেশ কয়েক বছর পূর্বে এ জমি দখল করে নেয় বিবিএস ক্যাবল নামের দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ। কয়েক বছরে প্রায় তিন বার উক্ত প্রতিষ্ঠানের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেয় বন বিভাগ। ফটোসেশন করে জানায়, তারা বনভূমি উদ্ধার করেছে। যদিও বন বিভাগ চলে যাওয়ার পর ফের কারখানা কর্তৃপক্ষ জমিটি তাদের আয়ত্তে নিয়ে যায়। এভাবে পুরো জেলা জুড়েই বনভূমি উদ্ধারের নামে নাটক মঞ্চস্থ করছে বন বিভাগ।

গেজেটের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি : শ্রীপুরের তেলিহাটি, টেপিরবাড়ী ও কেওয়া মৌজায় শত শত একর জমি সাধারণ মানুষের নামে সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ড থাকলেও গেজেটের নামে প্রান্তিক মানুষকে বন বিভাগ বছরের পর পর হয়রানি করে আসছে। এসব জমিতে ঘরবাড়ি করতে বন বিভাগকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে কাজ করতে হয়। এসব কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। জমির ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে না পেরে নিজ জমিতে অনেকটা পরবাসীর মতো থাকতে হচ্ছে হাজার হাজার লোককে। মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।

লাখ টাকার নিচে ডিমারকেশন হয় না : বন বিভাগের আশপাশের জমিতে কাজ করতে গেলে স্থানীয়দের সীমানানির্ধারণ করার বিধান রয়েছে। অথচ ডিমারকেশন করতে গেলে বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হতে হয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পেছনে খরচ করতে হয় লাখ লাখ টাকা। বন প্রহরীসহ বিট অফিসার, রেঞ্জার, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও সার্ভেয়ারকে টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে ডিমারকেশন হয় না।

সুফল প্রকল্পের নামে শ্রীপুরেই লোপাট কোটি টাকা : বনায়ন সমৃদ্ধ করতে সুফল প্রকল্পের আওতায় সরকার শাল সহযোগী বৃক্ষ রোপণের উদ্যোগ নেয়। যদিও শ্রীপুর রেঞ্জের আওতায় গত দুই বছরে বৃক্ষ না লাগিয়ে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রেঞ্জ কর্মকর্তা বজলুর রশিদের বিরুদ্ধে। শুধু সাইনবোর্ডেই এ প্রকল্প ঝুলছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা বজলুর রহমানের বাড়ি গাজীপুর সদরে। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে প্রকল্প পরিচালক গোবিন্দ রায় বলেন, এ ক্ষেত্রে তদন্ত করা হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রকৃত দখলের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন : বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন গাজীপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক হাসান ইউসুফ খান বলেন, ভাওয়ালের শালবনসহ গাজীপুরের সামগ্রিক বনাঞ্চল এখন আর নেই। গাজীপুরে প্রকৃত দখলের চিত্র মাঠপর্যায়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিল্পকারখানা ও মানুষ বনভূমি দখল করে নিয়েছে। বন রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তারাই বন ধ্বংসে জড়িত। বন রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন ও সরকারের সদিচ্ছার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বর্তমানে ১০ ভাগ বনভূমি বনের দখলে আছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী নুরুল আমীন বলেন, বন বিভাগের সীমিত জনবল দিয়ে বিশাল আয়তনের বন নজরদারি করতে হচ্ছে। এটি অনেক কঠিন কাজ। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা বনরক্ষা ও বনভূমি উদ্ধারে কাজ করছি। ইতোমধ্যেই দখলদারের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বন বিভাগের নিজস্ব কোন ম্যাজিস্ট্রেট নেই। অনেক ক্ষেত্রে তাই আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে উচ্ছেদের প্রস্তাব দেই। এ ছাড়া তো আমাদের আর কিছুই করার নেই।

 

 

advertisement